২০২৬ বিশ্বকাপে বিদেশি কোচদের যুগ: ব্রাজিলের ‘হেক্সা মিশন’ কি ইতিহাস বদলাবে?
বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী তাকিয়ে আছে ব্রাজিলের দিকে। দীর্ঘ ২৪ বছর পর তারা আবারও বিশ্বকাপ জয়ের জন্য ‘হেক্সা মিশন’ নিয়ে মাঠে নেমেছে। কিন্তু তাদের সামনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি পরিসংখ্যান— এখন পর্যন্ত কোনো দলই বিদেশি কোচের অধীনে ফিফা বিশ্বকাপ জিততে পারেনি। অর্থাৎ ১৯৩০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২২টি বিশ্বকাপের প্রতিটি চ্যাম্পিয়ন দলই স্বদেশি কোচের অধীনে শিরোপা অর্জন করেছে। সেলেসাওদের রেকর্ড পাঁচটি বিশ্বকাপ জয়ের ইতিহাসও এর ব্যতিক্রম নয়।
তবে এবারের বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ব্রাজিল খেলছে কোনো বিদেশি কোচের অধীনে। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে— অভিজ্ঞ ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তির অধীনে তারা কি পারবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে?
আনচেলত্তির অধীনে চলতি বিশ্বকাপে শুরুটা মনমতো হয়নি ব্রাজিলের। 'সি' গ্রুপে নিজেদের প্রথম ম্যাচে পিছিয়ে পড়ার পর গত বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্ট মরক্কোর সঙ্গে ১-১ গোল ড্র করেছে তারা। আগামীকাল শনিবার ঘুরে দাঁড়ানোর অভিযানে তাদের প্রতিপক্ষ হাইতি। আর গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে তারা মোকাবিলা করবে স্কটল্যান্ডকে।
বৃহৎ পরিসরের ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ৪৮টি দলের মধ্যে রেকর্ড ২৬টিই এবার বিদেশি কোচের অধীনে লড়ছে। তাদের মধ্যে ১০ জন এমন সব পরাশক্তির দায়িত্বে আছেন, যারা ফিফা বিশ্ব র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ ২৫-এর মধ্যে রয়েছে।
এবারের আসরে বিদেশি কোচদের মধ্যে আর্জেন্টিনারই প্রতিনিধিত্ব সবচেয়ে বেশি (পাঁচজন)। তারা হলেন— মরিসিও পচেত্তিনো (যুক্তরাষ্ট্র), মার্সেলো বিয়েলসা (উরুগুয়ে), নেস্তর লরেঞ্জো (কলম্বিয়া), সেবাস্তিয়ান বেকাচেচে (ইকুয়েডর) ও গুস্তাভো আলফারো (প্যারাগুয়ে)। এরপর ফ্রান্স থেকে আছেন চারজন— রুদি গার্সিয়া (বেলজিয়াম), সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে (ডিআর কঙ্গো), হার্ভে রেনার (তিউনিসিয়া) ও সেবাস্তিয়ান মিনিয়ে (হাইতি)। ইতালি থেকে তিনজন— আনচেলত্তি (ব্রাজিল), ভিনসেঞ্জো মন্তেলা (তুরস্ক) ও ফাবিও কানাভারো (উজবেকিস্তান)। অর্থাৎ ২৬ জন বিদেশি কোচের মধ্যে এই তিনটি দেশ থেকেই আছেন ১২ জন।
অতীতের দিকে তাকালে অবশ্য দেখা যায়, বিদেশি কোচরা দুবার শিরোপার খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষরক্ষা হয়নি। ১৯৫৮ সালে ইংল্যান্ডের জর্জ রেইনর সুইডেনকে এবং ১৯৭৮ সালে অস্ট্রিয়ান আর্নস্ট হ্যাপেল নেদারল্যান্ডসকে ফাইনালে তুলেছিলেন, কিন্তু তারা যথাক্রমে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার কাছে হেরে যান।
এছাড়া, ২০০২ সালে নেদারল্যান্ডসের গুস হিডিঙ্ক দক্ষিণ কোরিয়াকে, ২০০৬ সালে ব্রাজিলের লুইজ ফেলিপে স্কোলারি পর্তুগালকে এবং ২০১৮ সালে স্পেনের রবার্তো মার্তিনেজ বেলজিয়ামকে সেমিফাইনালে পৌঁছে দিয়েছিলেন।
এই কারণেই ২০২৬ বিশ্বকাপ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এবার একাধিক শক্তিশালী দল হাই-প্রোফাইল বিদেশি কোচের অধীনে খেলছে— ব্রাজিলে আছেন আনচেলত্তি, উরুগুয়েতে বিয়েলসা, পর্তুগালে রবার্তো মার্তিনেজ ও ইংল্যান্ডে টমাস টুখেল।
৬৭ বছর বয়সী আনচেলত্তি ক্লাব ফুটবলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল কোচদের একজন। তিনি রিয়াল মাদ্রিদ (তিনটি) ও এসি মিলানের (দুটি) হয়ে রেকর্ড পাঁচটি উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন। ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ লিগের (স্প্যানিশ লা লিগা, ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ, ইতালিয়ান সিরি আ, জার্মান বুন্দেসলিগা ও ফরাসি লিগ ওয়ান) প্রতিটিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়া একমাত্র কোচও তিনি। তবে জাতীয় দলে কোচিং করানো তার জন্য একদমই নতুন অভিজ্ঞতা। ব্রাজিলের দায়িত্ব নেওয়ার আগে কখনও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করেননি তিনি।
এখন পর্যন্ত বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে ব্রাজিল সবচেয়ে সফল দল। তারা তাদের পাঁচটি বিশ্বকাপ জিতেছিল যথাক্রমে ভিসেন্তে ফিওলা (১৯৫৮), আইমোরে মোরেইরা (১৯৬২), মারিও জাগালো (১৯৭০), কার্লোস আলবার্তো পারেইরা (১৯৯৪) ও স্কোলারির (২০০২) হাত ধরে।
তাই ফুটবল দুনিয়ায় এখন বড় প্রশ্ন— আনচেলত্তি, বিয়েলসা, টুখেল বা পচেত্তিনোদের মতো চাণক্যরা কি পারবেন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে? প্রায় শতবর্ষের এই ধারা ভেঙে প্রথমবারের মতো কোনো ভিনদেশি দলকে বিশ্বকাপ জেতাতে? সময়ই বলে দেবে পুরনো ইতিহাস বজায় থাকবে না কি এবার নতুন কোনো রূপকথা লেখা হবে।