প্রশান্ত মহাসাগরে প্লাস্টিকের দ্বীপ যেভাবে বদলাচ্ছে বাস্তুতন্ত্র

স্টার অনলাইন ডেস্ক

আপনি কি জানেন, প্রশান্ত মহাসাগরে একটি বিশাল দ্বীপ রয়েছে যেটি কোনো মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না? সেখানে কোনো মানুষ বাসও করে না।

প্রশান্ত মহাসাগর, শব্দটি শুনলেই কল্পনায় অন্তহীন নীল জলরাশি ছাড়া আর তেমন কিছু ভাসে না। কিন্তু সামুদ্রিক গবেষকেরা এখন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র দেখছেন। স্থলভাগ থেকে অনেক দূরে দেখা যাচ্ছে এক ধরনের কৃত্রিম উপকূলরেখা।

মূলত প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে তৈরি এই এলাকাটি গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ (জিপিজিপি) নামে পরিচিত। এটি ক্যালিফোর্নিয়া ও হাওয়াইয়ের মাঝখানে অবস্থিত।

এর বিস্তৃতি ৬ লাখ বর্গমাইলের বেশি। অর্থাৎ, ফ্রান্স, জার্মানি বা স্পেনের মতো দেশের চেয়েও আয়তনে বড়। আরও ভালো করে বুঝতে গেলে বাংলাদেশের চেয়ে ১০ গুণ বড়।

সাগরে প্লাস্টিক
সাগর থেকে প্লাস্টিক অপসারণ করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্বের মহাসাগরগুলোতে এ ধরনের আরও অন্তত পাঁচটি অঞ্চল রয়েছে। তবে গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ সবচেয়ে বড়। গবেষকরা বলছেন, প্রতিদিনই এর আয়তন বাড়ছে।

অনুমান করা হচ্ছে, ভাসমান এই প্লাস্টিকের ওজন প্রায় ১ লাখ টন। মোট ভরের ৪৬ শতাংশ ‘ঘোস্ট নেট’ নামে পরিচিত পরিত্যক্ত জালের কারণে।

বিশ্বের মহাসাগরগুলো থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য দূর করতে ২০১৩ সাল থেকে কাজ করছে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক আন্তর্জাতিক অলাভজনক পরিবেশ প্রকৌশল সংস্থা দ্য ওশান ক্লিনআপ। তাদের হিসাবে, নমুনা সংগ্রহের সময় ওই স্তূপে ১ লাখ ৮০ হাজার কোটির বেশি প্লাস্টিক টুকরা ছিল।

গারবেজ প্যাচ কীভাবে তৈরি হয়

নদী, জাহাজ ও উপকূলীয় শহরগুলো থেকে লাখ লাখ টন প্লাস্টিকের বোতল, মাছ ধরার জাল, কনটেইনার ও অন্যান্য বর্জ্য দিয়ে তৈরি হয় গারবেজ প্যাচ।

নাসার মতে, প্রতি বছর প্রায় ৮০ লাখ টন প্লাস্টিক সাগরে যাচ্ছে। সূর্যের আলো ও ঢেউয়ের ধাক্কায় এসব বর্জ্য ভেঙে মাইক্রোপ্লাস্টিকে পরিণত হয়। অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারের কারণে মাইক্রোপ্লাস্টিক স্যাটেলাইট থেকে দেখা যায় না এবং এগুলোর উপস্থিতি অনেকটা প্লাস্টিকের স্যুপের মতো।

সাগরে স্রোতের কারণে যে ঘূর্ণাবর্ত সৃষ্টি হয়, এর বৃত্তাকার শান্ত কেন্দ্রস্থলে এই আবর্জনাগুলো আটকে থাকে। সাগরের এই অংশ গাইর নামে পরিচিত।

গারবেজ প্যাচ
সাগরে প্লাস্টিকের দ্বীপ। ছবি: সংগৃহীত

তবে সব বর্জ্য এখানে জমছে বিষয়টি তেমন নয়। সমুদ্রে থাকা মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের মাত্র একটি ক্ষুদ্র অংশ এটি। এর একটি বড় অংশ সমুদ্রের তলদেশে চলে যায় অথবা ঢেউয়ের সঙ্গে উপকূলে ফিরে আসে।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের প্রতিটি মহাসাগরীয় অববাহিকায় গারবেজ প্যাচ গড়ে উঠেছে।

ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের গবেষকরা স্যাটেলাইট তথ্য সংগ্রহ করে দেখেছেন, গ্রীষ্মকালে গারবেজ প্যাচে মাইক্রোপ্লাস্টিকের ঘনত্ব বেশি এবং শীতকালে কম থাকে। তুলনামূলক শীতল তাপমাত্রায় পানির উল্লম্ব মিশ্রণ বৃদ্ধি পাওয়ায় অন্য গাইরগুলোতেও একই ধরনের মৌসুমি পরিবর্তন দেখা গেছে।

গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচ আসলে আরও অনেক বড় একটি সংকটের লক্ষণ বলে মনে করছে আন্তর্জাতিক পরিবেশগত অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ওশান কনজারভেন্সি।

১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক এই সংস্থার প্লাস্টিক গবেষণা বিভাগের পরিচালক ড. ব্রিটা বেখলার ইমেইলে অ্যাকুওয়েদারকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন।

তিনি বলেন, ‘প্রতি মিনিটে একটি বর্জ্যবাহী ট্রাকের চেয়েও বেশি পরিমাণে প্লাস্টিক সমুদ্রে প্রবেশ করছে। এর ছোট একটি অংশ গারবেজ প্যাচে জমা হয়। বাস্তবতা হলো, এই দূষণ সর্বত্র ছড়িয়ে রয়েছে।’

মাইক্রোপ্লাস্টীক
জাহাজ থেকে সাগরে যায় প্লাস্টিক। ছবি: এপি

গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচকে রাতের আকাশের সঙ্গে তুলনা করেছেন দ্য ওশান ক্লিনআপের পরিবেশ ও সামাজিক বিষয়ক প্রধান ম্যাথিয়াস এগার। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি সেখানে যান, তাহলে আপনার চোখে পড়বে শুধু নির্মল নীল সাগর। রাতে আকাশের দিকে তাকালে যেমন অসংখ্য সাদা বিন্দু দেখা যায়, গারবেজ প্যাচেও দৃশ্যটা অনেকটা তেমন। এটি খুব ঘন নয়, তবে এর সংখ্যা অনেক...আপনি যত বেশি সময় তাকিয়ে থাকবেন, তত বেশি প্লাস্টিক দেখতে পাবেন।’

সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রে প্রভাব

নেচার ইকোলজি অ্যান্ড ইভোলিউশন সাময়িকীতে ২০২৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, বিভিন্ন ধরনের প্রাণী—যাদের অধিকাংশই অমেরুদণ্ডী, এসব প্লাস্টিকের ওপর বসবাস করছে। এর মধ্যে ৮০ শতাংশ প্রাণীর উপকূলে থাকার কথা। এই প্রাণীগুলো কেবল প্লাস্টিকের ওপর বসবাসই করছে না, গবেষকরা সেখানে তাদের প্রজননের প্রমাণও পেয়েছেন।

ধারণা করা হচ্ছে, এই প্রাণীগুলো স্থায়ী সম্প্রদায় গড়ে তুলছে, যা সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রকে প্রভাবিত করতে পারে।

দীর্ঘদিন ধরে জীববিজ্ঞানীরা উপকূলীয় জলসীমা ও উন্মুক্ত সমুদ্র—দুটি সম্পূর্ণ পৃথক আবাসস্থল হিসেবে বিবেচনা করে আসছিলেন। ধারণা করা হতো, উপকূলীয় প্রজাতিগুলো পাথর, জেটি ও উপকূলরেখার আশপাশেই থাকবে। আর পেলাজিক প্রজাতিগুলোই উন্মুক্ত সমুদ্রে বসবাস করবে।

ঝড়ের কারণে গাছের গুঁড়ি বা ভাসমান সামুদ্রিক শৈবালের স্তূপ বিচ্ছিন্ন হয়ে উপকূলীয় প্রাণীদের স্থলভাগ থেকে দূরে নিয়ে যেতে পারে। এমন ঘটনা ঘটলে উন্মুক্ত সাগরের কঠোর পরিবেশে এসব প্রাণী শেষ পর্যন্ত মারা যাবে। তবে গ্রেট ইস্ট জাপান সুনামির পর নতুন চিত্র সামনে আসে।

সুনামির বিশাল ঢেউ জেটি, নৌকা ও অসংখ্য প্লাস্টিক সামগ্রী সমুদ্রে ভাসিয়ে দেয়, যা পরবর্তীতে প্রশান্ত মহাসাগরে ছড়িয়ে পড়ে। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে ওই ধ্বংসাবশেষের বিভিন্ন অংশ উত্তর আমেরিকা ও হাওয়াই উপকূলে পৌঁছায়।

মাইক্রোপ্লাস্টিক
মাইক্রোপ্লাস্টিক। ছবি: সংগৃহীত

বিজ্ঞানীরা যখন এসব বস্তু পরীক্ষা করেন, তারা দেখতে পান যে বহু জাপানি উপকূলীয় প্রজাতি সাগরে অন্তত ছয় বছর জীবিত ছিল। এখান থেকেই প্রশ্নের জন্ম নেয়: এসব উপকূলীয় প্রজাতি কি স্থায়ী বসতি বা জীবসমাজ গড়ে তুলতে শুরু করেছিল?

তবে মানুষ ও অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণীর জন্য গারবেজ প্যাচ এখনো হুমকি। ওশানিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (এনওএএ) মতে, অনেক সামুদ্রিক প্রাণী আবর্জনাকে খাবার ভেবে খেয়ে ফেলে। এটি তাদের মৃত্যুর কারণ হতে পারে। এছাড়া, ঘোস্ট নেটে আটকে যেতে পারে অনেক সামুদ্রিক প্রাণী।

বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ

সায়েন্টিফিক রিপোর্টস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুসারে, ২০১৮ সালে গারবেজ প্যাচের আয়তন ছিল ৬ লাখ বর্গমাইলের বেশি, যা টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের দ্বিগুণ এবং ফ্রান্সের প্রায় তিনগুণ।

এনওএএ'র মতে, আবর্জনার বড় একটি অংশ মাইক্রোপ্লাস্টিক দিয়ে তৈরি হওয়ায় খালি চোখে সহজে দেখা যায় না। তাই এর সঠিক আয়তন নির্ধারণ করা কঠিন। বিশেষ করে বাতাস ও সমুদ্রস্রোতের কারণে এসব বর্জ্য সবসময় স্থান পরিবর্তন করে। এই অবিরাম গতিশীলতার কারণে মাইক্রোপ্লাস্টিক অপসারণও কঠিন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, গারবেজ প্যাচ পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব নাও হতে পারে।

ওশ্যান ক্লিনআপ
গারবেজ প্যাচ পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। ছবি: সংগৃহীত

ড. বেখলার বলেন, ‘গ্রেট প্যাসিফিক গারবেজ প্যাচের মতো প্লাস্টিক দূষণ সংকট মোকাবিলা করতে হলে আমাদের প্লাস্টিক উৎপাদন কমাতে হবে, প্লাস্টিক বর্জ্য আরও ভালোভাবে ব্যবস্থাপনা করতে হবে এবং পরিবেশে ইতোমধ্যে ছড়িয়ে থাকা প্লাস্টিক অপসারণ করতে হবে।’

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচির (ইউএনইপি) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৪৬ কোটি টন প্লাস্টিক উৎপাদিত হয়। জরুরি পদক্ষেপ না নিলে ২০৬০ সালের মধ্যে এ পরিমাণ তিনগুণ হয়ে যাবে।

ইউএনইপির মতে, বিশ্বজুড়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের মাত্র ৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রায় ২২ শতাংশ যথাযথভাবে ব্যবস্থাপিত হয় না এবং শেষ পর্যন্ত আবর্জনায় পরিণত হয়, যার বড় একটি অংশ সাগরে গিয়ে পড়ে।

বিজ্ঞানীদের মতে, ২০০৫ সালের পর থেকে সাগরে প্লাস্টিক দূষণ ‘দ্রুত ও নজিরবিহীনভাবে’ বেড়ে যায়।

ম্যাথিয়াস এগার বলেন, ‘প্রতি মুহূর্তে সমস্যাটি আরও বড় হচ্ছে। আমরা দেখি পরিত্যক্ত ‘ঘোস্ট’ মাছ ধরার জালে জড়িয়ে পড়ছে কচ্ছপ। কখনো কখনো শুধু কচ্ছপের মৃতদেহই দেখতে পাই। প্রাণীরা প্লাস্টিকের টুকরা গিলে ফেলছে, তাও দেখি আমরা। এর সঙ্গে দূষণকারী রাসায়নিক পদার্থের প্রভাবও রয়েছে।’