এমবাপের জোড়া গোলে ফ্রান্সের মধুর প্রতিশোধ

স্পোর্টস ডেস্ক

বিশ্বকাপের মঞ্চে সেনেগালের কাছে ২০০২ সালের সেই হার এখনও ফরাসি ফুটবলের অন্যতম তিক্ত স্মৃতি। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে অনুষ্ঠিত সেই আসরে আফ্রিকার নবাগত দলটির কাছে হেরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছিল তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে। দুই যুগ পর আবারও বিশ্বকাপে মুখোমুখি হয়ে সেই দুঃস্বপ্নের জবাব দিলেন কিলিয়ান এমবাপে ও তার সতীর্থরা।

বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার রাতে নিউজার্সি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের ‘আই’ গ্রুপের ম্যাচে সেনেগালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে জয় দিয়ে অভিযান শুরু করেছে শেষ দুই বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ফ্রান্স। ম্যাচে জোড়া গোল করেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে। ফরাসিদের অন্য গোলটি আসে ব্র্যাডলি বারকোলার পা থেকে। সেনেগালের হয়ে একমাত্র গোলটি করেন ইব্রাহিম এমবায়ে।

এই ম্যাচে ব্যক্তিগতভাবেও নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন এমবাপে। ফ্রান্সের জার্সিতে এতদিন ৫৬ গোল নিয়ে অলিভিয়ের জিরুর সঙ্গে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে ছিলেন তিনি। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে সেই রেকর্ড নিজের একক দখলে নিয়ে নেন ফরাসি অধিনায়ক।

শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের ইতিহাসেও আরেকটি বড় অর্জন যুক্ত হয়েছে তার নামের পাশে। এই দুই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে এমবাপের মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪-তে, যা তাকে এগিয়ে দিয়েছে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ গোলসংখ্যার চেয়েও।

ফ্রান্সের জন্য সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক এমবাপের ফিরে আসা। শুধু গোল করে নয়, মাঠে নিজের উপস্থিতি, আত্মবিশ্বাস এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ক্ষমতা দিয়ে আবারও মনে করিয়ে দিয়েছেন কেন তাকে বর্তমান ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর অস্ত্রগুলোর একটি বলা হয়। তার নৈপুণ্যে বিশ্বকাপের শিরোপা দৌড়ে নিজেদের অবস্থানও স্পষ্ট করেছে দিদিয়ের দেশমের দল।

স্কোরলাইন শেষ পর্যন্ত ফ্রান্সের পক্ষে হলেও ম্যাচটি মোটেও সহজ ছিল না। দীর্ঘ সময় ধরে সেনেগাল তাদের শারীরিক শক্তি, গতি এবং তীব্র চাপ দিয়ে ফরাসিদের ভোগান্তিতে রেখেছিল। কিন্তু বড় দল আর বড় খেলোয়াড়ের পার্থক্য তৈরি হয় ঠিক এমন মুহূর্তেই। যখন খেলার নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে থাকে না, তখনও তারা ম্যাচ জিতে নিতে পারে।

ম্যাচের শুরুতে বরং সেনেগালই ছিল বেশি প্রাণবন্ত দল। ইসমাইলা সারের নেতৃত্বে আফ্রিকান দলটি বারবার ফ্রান্সের রক্ষণে আঘাত হানছিল। গতি, শক্তি এবং আগ্রাসনে তারা এক পর্যায়ে ফ্রান্সকে চাপে ফেলে দেয়। মাঝমাঠে ফরাসিদের সৃজনশীলতার অভাবও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমবাপে, উসমান দেম্বেলে, দেশিরে দুয়ে কিংবা মাইকেল ওলিসের মতো প্রতিভাবান আক্রমণভাগ থাকা সত্ত্বেও মাঝমাঠ থেকে ধারাবাহিকভাবে আক্রমণ গড়ে তুলতে পারছিল না তারা।

২৪তম মিনিটে সেনেগাল প্রায় এগিয়েই গিয়েছিল। এমবাপের বল হারানোর পর দ্রুত পাল্টা আক্রমণে ওঠে তারা। নিকোলাস জ্যাকসনের নিচু ভলি পোস্টে লেগে ফিরে আসে। ভাগ্য সহায় না হলে সেখানেই পিছিয়ে পড়তে পারত ফ্রান্স।

প্রথমার্ধজুড়ে সেনেগাল বল দখলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে, আক্রমণেও ছিল সাহসী। যোগ করা সময়ে তো নিশ্চিত গোল মিস করেন ইসমাইলা সারে। তবে তার একাধিক দৌড় এবং থিও হার্নান্দেজকে কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দর্শকদেরও উজ্জীবিত করে।

ফ্রান্সের প্রথম উল্লেখযোগ্য সুযোগ আসে দ্বিতীয়ার্ধে। ৫২তম মিনিটে মাইকেল ওলিসের দুর্দান্ত একক প্রচেষ্টা থেকে গোলের সুযোগ তৈরি হলেও দুর্দান্ত সেভ করেন এদুয়ার মেন্ডি। এরপর ধীরে ধীরে ম্যাচে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিতে শুরু করে ফ্রান্স।

এমবাপেও জেগে ওঠেন। একবার মেন্ডিকে পরীক্ষা করেন, পরে সাদিও মানের চ্যালেঞ্জে পেনাল্টির আবেদনও করেন। তবে ভিএআর পর্যালোচনার পর রেফারি সেটি নাকচ করে দেন।

অবশেষে আসে সেই মুহূর্ত, যার অপেক্ষায় ছিল ফরাসি সমর্থকেরা। মাইকেল ওলিসের নিখুঁত পাসে ডায়াগোনাল রান দিয়ে ডিফেন্স ভেঙে বেরিয়ে আসেন এমবাপে। ঠান্ডা মাথায় বল জালে পাঠিয়ে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল উদযাপন করেন রিয়াল মাদ্রিদ তারকা। অনেকদিন পর সেই উদযাপনে দেখা গেছে স্বস্তি, আনন্দ এবং আত্মবিশ্বাস।

ম্যাচের মোড় ঘুরে যায় এরপরই। নিষ্প্রভ পারফরম্যান্সের পর উসমান দেম্বেলের পরিবর্তে মাঠে নামেন ব্র্যাডলি বারকোলা। আর সেই বদলেই আরও প্রাণ পায় ফ্রান্সের আক্রমণ। ম্যাচের ৮২তম মিনিটে আদ্রিয়াঁ রাবিওর অসাধারণ পাস থেকে বারকোলা গোলরক্ষককে চিপ করে বল জালে পাঠিয়ে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন।

তবু সেনেগাল হাল ছাড়েনি। যোগ করা সময়ে ইব্রাহিম এমবায়ে একটি গোল শোধ করে ম্যাচে উত্তেজনা ফিরিয়ে আনেন। মনে হচ্ছিল শেষ মুহূর্তে নাটকীয় কিছু ঘটতেও পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনা টিকেছিল মাত্র এক মিনিট।

সেনেগালের গোলের ঠিক পরের আক্রমণেই আবারও জ্বলে ওঠেন এমবাপে। বক্সের বাইরে থেকে তার দুর্দান্ত শট জালের ঠিকানায় পৌঁছে গেলে ম্যাচের সব অনিশ্চয়তার ইতি ঘটে। নিজের দ্বিতীয় গোলের মাধ্যমে ফ্রান্সের জয় নিশ্চিত করেন তিনি।