ফ্রান্সকে ফের বিশ্বকাপ শিরোপা উপহার দিতে চান দেশম

স্পোর্টস ডেস্ক

বেশ কয়েক বছর আগেও ভাঙা আত্মবিশ্বাস, বিতর্ক আর হতাশার মধ্যে ডুবে ছিল ফরাসি ফুটবল। সেই দলকে আবার বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তিতে রূপান্তর করার কারিগর দিদিয়ের দেশম। চৌদ্দ বছরের দীর্ঘ যাত্রা শেষে এবার বিদায়ের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। কিন্তু বিদায়ের আগে আরও একবার বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরার স্বপ্ন দেখছেন ফ্রান্সের কিংবদন্তি এই কোচ।

উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপের পর দায়িত্ব ছাড়বেন দেশম। তাই এটি হতে যাচ্ছে তার শেষ বিশ্বকাপ। বিশ্ব র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা ফ্রান্সও টুর্নামেন্টের অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে যাচ্ছে। ২০১৮ সালে শিরোপা জয়ের পর ২০২২ সালে ফাইনালে উঠেছিল তারা। এবার লক্ষ্য টানা তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে জায়গা করে নেওয়া।

২০১২ সালে ফ্রান্সের দায়িত্ব নিয়েছিলেন দেশম। তখনও ২০১০ বিশ্বকাপের দুঃস্বপ্ন ভুলতে পারেনি দলটি। সেই আসরে কোচ রেমন্ড দোমেনেকের বিরুদ্ধে খেলোয়াড় বিদ্রোহ পর্যন্ত হয়েছিল। এমন এক অস্থির সময়েই দায়িত্ব নিয়ে ফ্রান্সকে আবারও আন্তর্জাতিক ফুটবলের সবচেয়ে ভয়ংকর শক্তিগুলোর একটিতে পরিণত করেন তিনি।

সম্প্রতি শেষবারের মতো বিশ্বকাপের স্কোয়াড ঘোষণা করতে গিয়ে আবেগঘন অনুভূতির কথা স্বীকার করেছেন ৫৭ বছর বয়সী দেশম। তিনি বলেন, 'এটি এক অদ্ভুত অনুভূতি। সাধারণত আমি আমার আবেগ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু আমি সবকিছু নিয়েই স্বাভাবিক আছি। যা ঘটেছে, তা এখন অতীত। আর সেটা যথেষ্ট ভালোভাবেই হয়েছে। না হলে ১৪ বছর পরও আমি এখানে থাকতাম না।'

দেশম আরও বলেন, 'এখন আমার সমস্ত শক্তি ও মনোযোগ এই বিশ্বকাপের দিকেই নিবদ্ধ।'

বিশ্বকাপের পর দেশমের উত্তরসূরি হিসেবে সাবেক সতীর্থ ও ফরাসি কিংবদন্তি  জিনেদিন জিদানের নামই সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে। তবে দায়িত্ব হস্তান্তরের আগে ফ্রান্সকে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলতে এবং তৃতীয় শিরোপা এনে দিতে চান বর্তমান কোচ।

দেশমের জীবনবৃত্তান্ত নিজেই এক ফুটবল ইতিহাস। খেলোয়াড় হিসেবে ১৯৯৮ বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতানো অধিনায়ক ছিলেন তিনি। এরপর ২০০০ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপও জিতেছিলেন। ১৯৯৩ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে মার্সেইকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জেতানো অধিনায়কও ছিলেন তিনি। পরে জুভেন্টাসের হয়েও ইউরোপসেরা হওয়ার স্বাদ পেয়েছেন।

মাত্র ৩২ বছর বয়সে অবসর নিয়ে কোচিংয়ে নামেন দেশম। ২০০৪ সালে মোনাকোকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে তুলেছিলেন। পরে মার্সেইকে ফরাসি লিগ শিরোপাও জেতান।

ফ্রান্সের দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৪ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ভবিষ্যৎ চ্যাম্পিয়ন জার্মানির কাছে হেরেছিল তার দল। এরপর ২০১৬ ইউরোতে স্বাগতিক হিসেবে ফাইনালে উঠলেও অতিরিক্ত সময়ে পর্তুগালের কাছে হারতে হয়। তবে তখনই গড়ে উঠছিল নতুন এক প্রজন্ম, যেখানে ছিলেন পল পগবা ও আঁতোয়ান গ্রিজমানের মতো তারকারা।

এরপর আবির্ভাব ঘটে কিলিয়ান এমবাপের। ২০১৭ সালে জাতীয় দলে অভিষেকের পরই বদলে যায় অনেক কিছু। ২০১৮ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন তিনি। ২০২২ সালের ফাইনালে হ্যাটট্রিকও করেছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিওনেল মেসির স্বপ্নপূরণ ঠেকাতে পারেনি ফ্রান্স।

এটি হবে দেশমের কোচ হিসেবে সপ্তম বড় টুর্নামেন্ট। এখন পর্যন্ত তার ঝুলিতে আছে একটি বিশ্বকাপ, একটি নেশনস লিগ শিরোপা এবং আরও দুটি ফাইনাল খেলার অভিজ্ঞতা। ২০২১ সালে উয়েফা নেশনস লিগ জিতেছিল ফ্রান্স। ফলে তার উত্তরসূরির জন্য মানদণ্ডও অনেক উঁচুতে স্থাপন করে যাচ্ছেন তিনি।

দেশম বরাবরই ফলাফলকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। মাঠে অসাধারণ প্রতিভাবান ফুটবলার থাকলেও তিনি নান্দনিকতার চেয়ে কার্যকারিতাকে প্রাধান্য দেন। ২০২৪ ইউরোতে ফ্রান্স সেমিফাইনালে উঠলেও ছয় ম্যাচে মাত্র চার গোল করেছিল। যার দুটি ছিল আত্মঘাতী গোল এবং একটি পেনাল্টি। তখন ফ্রান্সের খেলা একঘেয়ে বলে সমালোচনা হলে দেশমের বিখ্যাত জবাব ছিল, 'বিরক্ত লাগলে অন্য কিছু দেখতে পারেন।'

তবে গত এক বছরে ফ্রান্সের ফুটবল অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। ৪-২-৩-১ ছকে একসঙ্গে খেলছেন এমবাপে, বর্তমান ব্যালন ডি’অর জয়ী উসমান দেম্বেলে  এবং মাইকেল অলিস। ফলে এবার ফ্রান্সকে আগের চেয়ে আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও ভয়ংকর মনে করা হচ্ছে।

যদি ১৯ জুলাই নিউ জার্সির ফাইনালে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে পারেন, তাহলে দেশম ইতিহাসের মাত্র দ্বিতীয় কোচ হিসেবে দুইবার বিশ্বকাপ জয়ের কীর্তি গড়বেন। এর আগে এই কৃতিত্ব ছিল শুধু ভিত্তোরিও পজ্জোর, যিনি ১৯৩০-এর দশকে ইতালিকে টানা দুই বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন।

তারপর কী করবেন, সেটিও পুরোপুরি পরিষ্কার করেননি দেশম। তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি বলেছেন, 'আমি কোনো সম্ভাবনাই উড়িয়ে দিচ্ছি না। সবাই জানে আমি প্রস্তুত আছি। সামনে কী হবে, সেটা সময়ই বলে দেবে।'