মহারাজার বিদায়ের সুর শুরুর আগে...
একদিন লিওনেল মেসি আর বিশ্বকাপ মঞ্চে নামবেন না— কথাটা খুব ছোট হলেও ভীষণ সত্য। আর এর ভেতরে কত রাত, কত দিন, কত তর্ক, কত কান্না, কত চিৎকার আটকে আছে, তা শুধু তারাই বোঝেন, যারা মেসিকে ভালোবেসে বড় হয়েছেন।
সেদিনও আর্জেন্টিনার ম্যাচ থাকবে, নীল-সাদা জার্সি থাকবে, মাঠভর্তি আলো থাকবে, জাতীয় সংগীত থাকবে, গ্যালারিতে দর্শক থাকবে। কিন্তু সেই ছোট গড়নের জাদুময় পায়ের কারুকাজের মানুষটি থাকবেন না, যার পায়ে বল গেলেই আমরা নিজেদের বয়স ভুলে যেতাম। থাকবে না সেই মাথা নিচু করে হাঁটা, সেই বাঁ পায়ের হঠাৎ চোখজুড়ানো ছোঁয়া, যা এক মুহূর্তে পুরো মাঠের ভাগ্য বদলে দিত।
এই ভয়টাই এখন সবচেয়ে বড়।
মেসির আর কিছু হারানোর নেই। তিনি বিশ্বকাপ জিতেছেন, অপূর্ণতার দীর্ঘ ছায়া মুছে ফেলেছেন, ফুটবলের ইতিহাসে নিজের জায়গা পাকা করে অনেক আগেই লিখে রেখেছেন। কিন্তু সব জিতে ফেলা মানুষের জন্যও আমাদের বুক কাঁপে। কারণ মেসি শুধু নিজের জন্য খেলেন না— তিনি খেলেন আমাদের বহু বছরের রাত জাগা চোখের জন্য, পাড়ার মোড়ে উড়তে থাকা আর্জেন্টিনার পতাকার জন্য, বন্ধুদের তর্কের জন্য, আর আমাদের ভেতরে জমে থাকা এক অসম্ভব ভালোবাসার জন্য।
তাই বলি— মেসির হয়তো হারানোর নেই কিছু, কিন্তু আমাদের আছে।
আমরা হারাতে পারি দুই দশকের অভ্যাস— একটি-দুটি দিন নয়, গুণে গুণে ২০ বছর! টিভির সামনে বসে থাকা সেই উত্তেজনা, ম্যাচের আগে বুকের ভেতর অকারণ কাঁপুনি। বলটা তার পায়ে গেলেই মনে হওয়া— এইবার কিছু হবে। এই বিশ্বাসটা খুব সাধারণ কিছু নয়। জীবনে কত কিছু বদলে গেছে, মানুষ বদলেছে, শহর বদলেছে, সম্পর্ক বদলেছে, বয়স বেড়েছে। তবু মেসি বল পায়ে নিলে আমাদের ভেতরের সেই ছোট্ট ছেলেটা, সেই রাতজাগা তরুণটা, সেই নীল-সাদা পতাকা আঁকড়ে থাকা মানুষটা আবার জেগে ওঠে।
এই কারণে মেসির শেষ বিশ্বকাপের কথা ভাবা যায় না। বিদায় শব্দটা তার নামের পাশে বসাতে কষ্ট হয়। মনে হয়, কেউ যেন শৈশবের দরজায় তালা লাগাতে এসেছে।
মেসির গল্পটা তো শুধুই জয়ের? না। এ গল্পে অপমান আছে, অপেক্ষা আছে, আছে কান্না। আছে সেই রাতগুলো, যখন তিনি সব করেও পারেননি। আছে সেই ফাইনালগুলো, যেখানে আর্জেন্টিনা হারলে পৃথিবীর সব দায় এসে পড়ত তার কাঁধে। তিনি মাথা নিচু করে হাঁটতেন, আর আমরা দূর দেশ থেকে টিভিস্ক্রিনে তাকিয়ে তার পাশে থাকতাম। মনে হতো, একজন মানুষ কতটা একা হতে পারে, যখন তার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার পুরো একটা জাতির স্বপ্ন, বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ভক্তের স্বপ্ন।
তবু খাদের কিনারা থেকে তিনি ফিরেছেন।
একবার নয়, বারবার ফিরেছেন। ভাঙা মন নিয়ে, ক্লান্ত শরীর নিয়ে, অবিশ্বাসের পাহাড় নিয়ে। যেন নদীকে বলা হয়েছে, সামনে পাথর আছে। আর নদী জবাব দিয়েছে, তবু আমি পথ তৈরি করব। মেসি সেই নদী। তাকে আটকানো যায়, থামানো যায় না। তিনি চিৎকার করে রাজত্ব নেননি, সিংহাসন দখল করেননি। তিনি শুধু বল পায়ে নিয়েছেন, ছুটে গেছেন অপ্রতিরোধ্য গতিতে, আর পৃথিবীকে বুঝিয়েছেন— নীরব মানুষও ইতিহাস লিখতে পারে।
তারপর কাতার এলো।
২০২২ সালের লুসাইল স্টেডিয়ামের সেই রাত শুধু একটা ট্রফি দুহাতে ধরার রাত ছিল না। সেটা ছিল বহু বছরের কান্নার উত্তর। মেসি যখন বিশ্বকাপ উঁচিয়ে তুললেন, মনে হয়েছিল ফুটবল অবশেষে কাঙ্ক্ষিত রাজা পেল। এত দিন যার বুকের ওপর অসম্পূর্ণতার পাথর চাপা ছিল, সে মানুষটা অবশেষে প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারল। আমরা যারা হাজার মাইল দূরে প্রার্থনায় বসেছিলাম, তারাও যেন মুক্তি পেলাম। মনে হলো, জীবনে দেরি হলেও আনন্দ আসে। অপেক্ষা বৃথা যায় না। ভালোবাসা কখনো কখনো সত্যিই জয়ী হয়।
কিন্তু সমস্যা হলো, মানুষ যাকে এত ভালোবাসে, তাকে সহজে ছাড়তে পারে না।
তাই কাতারের পরও মন ভরেনি। বরং সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে ভয় বেড়েছে। কারণ এখন প্রতিটি ম্যাচ মনে করিয়ে দেয়— সময় শেষের দিকে যাচ্ছে, এবারই সম্ভবত শেষ। প্রতিটি হাঁটা, প্রতিটি পাস, প্রতিটি হাসি, প্রতিটি হাত নাড়া, সবকিছু যেন শেষ অ্যালবামের ছবি।
আমরা জানি, তিনি আগের মতো ছুটবেন না, সব ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে প্রতিদিন বিস্ময় বানাবেন না। কিন্তু মেসির জন্য এখন গতি দরকার হয় না। তার দৃষ্টিই যেন যথেষ্ট, তার একটি নিখুঁত পাসই যেন পর্যাপ্ত। তার পায়ের এক স্পর্শেই বোঝা যায়, ফুটবল এখনও তার কাছে মাথা নোয়ায়।
মেসি এখন অভিজ্ঞতায় পূর্ণ বর্ষীয়ান এক রাজার মতো। একের পর এক যুদ্ধ জিতে ফিরেছেন, মণি-মুক্তাখচিত মুকুট পেয়েছেন, গোটা রাজ্য পেয়েছেন। তবু শেষবারের মতো তিনি আবার ঘোড়ায় উঠছেন। জয়ের জন্য নয় শুধু, নিজের প্রিয় মানুষদের আরেকবার দেখার জন্য, দেখানোর জন্য।
মেসি মানে আমাদের জীবনের এক কোমল জায়গা। যে জায়গায় আমরা শক্ত মানুষ হয়েও দুর্বল হয়ে পড়ি। অফিস, সংসার, চাপ, ব্যস্ততা— সব পেরিয়ে এক রাতের জন্য আবার শিশু হয়ে যাই। আর্জেন্টিনা গোল করলে চিৎকার করি। মেসি পড়ে গেলে বুক ধড়ফড় করে। ক্যামেরা তার মুখে এলে মনে হয়, খুব চেনা একজন মানুষকে দেখছি। অথচ তিনি আমাদের চেনেন না, কোনোদিন চিনবেনও না। তবু কী অদ্ভুত, তার জন্য আমাদের এত মায়া!
এটাই মেসির অলৌকিকতা। তাই হারাবার নেই কিচ্ছু— এ কথা মেসির জন্য সত্যি হতে পারে। কিন্তু আমাদের জন্য নয়।
আমরা হারাতে বসেছি এমন এক মানুষকে, যার পায়ে বল থাকলে পৃথিবী একটু বাড়তি সুন্দর লাগে। আমরা হারাতে বসেছি এমন এক আলোকে, যে আলো আমাদের বহু অন্ধকার রাত পার করে দিয়েছে পরম বিশ্বস্ততায়। আমরা হারাতে বসেছি এমন এক অপেক্ষাকে, যা ম্যাচের আগের রাতকে উৎসব বানিয়ে দিত।
তাই বলি— মহারাজা, তোমার মুকুট আছে। ইতিহাস আছে। অমরত্ব আছে। তবু আমাদের দিকে আবার তাকাও।
শেষ নাচ হোক, শেষ যুদ্ধ হোক, শেষ সকাল হোক— তুমি শুধু আবার মাঠে নামো।
জেতা-হারার হিসাব পরে হবে। শুধু এতটুকুই চাই— আবার যেন পৃথিবী দেখে, সৌন্দর্য কাকে বলে। দেখে, বিদায়ও মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকে এক জাদুকরী বাঁ পায়ের মানুষের সামনে।
আরাফাত রহমান দ্য ডেইলি স্টারের একজন সংবাদকর্মী। তাকে ফিডব্যাক জানাতে পারেন arafat.mcj@yahoo.com