বিশ্বকাপে ভিসা না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ ইরানি সমর্থকেরা
বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের ইতিহাস বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে মেক্সিকোতে পৌঁছেছে ইরান। কিন্তু মাঠের লড়াই শুরু হওয়ার আগেই দলটিকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে ভিসা-সংক্রান্ত বিতর্ক। যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি না পাওয়ায় দলের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা বিশ্বকাপ যাত্রা থেকে ছিটকে পড়েছেন, আর তাতেই হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন ইরানি সমর্থকেরা।
রোববার ভোরে মেক্সিকোর সীমান্তবর্তী শহর তিহুয়ানায় পৌঁছায় ইরান দল। স্থানীয় সময় সকাল পাঁচটায় বিমানবন্দরে নামার পর খেলোয়াড়দের স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন অল্প কয়েকজন সমর্থক। তাদেরই একজন সাদেগ গালাভি। শহরটির বাসিন্দা এই মেকানিক ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে জাতীয় দলকে স্বাগত জানাতে ছুটে এসেছিলেন।
ইরানের সাদা জার্সি গায়ে জড়িয়ে গালাভি বলেন, 'আমার জাতীয় দল আমার শহরে এসেছে। তাদের স্বাগত জানাতে উপস্থিত থাকা আমার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।'
তবে দলের আগমনকে ঘিরে আনন্দের পাশাপাশি ছিল হতাশাও। খেলোয়াড়রা যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা পেলেও প্রতিনিধিদলের সবাই সেই অনুমতি পাননি। প্রায় ১৫ জন কর্মকর্তা ভিসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ইরান ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি মেহদি তাজ। অতীতে তিনি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যাকে যুক্তরাষ্ট্র সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
এই সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে গালাভি বলেন, 'এটার কোনো মানে হয় না। খেলাধুলা শান্তির প্রতীক হওয়ার কথা। সেখানে রাজনীতি আর খেলাধুলাকে একসঙ্গে মিশিয়ে দিলে কখনোই ভালো কিছু হয় না।'
ইরানকে ঘিরে বিতর্ক অবশ্য নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা যৌথভাবে আয়োজিত এই বিশ্বকাপের আগে থেকেই নানা অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল দলটি। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো অংশগ্রহণকারী দেশ এমন এক পরিস্থিতিতে টুর্নামেন্টে খেলছে, যেখানে আয়োজক দেশের একটির সঙ্গে তাদের সরাসরি সামরিক উত্তেজনা রয়েছে।
এক পর্যায়ে ইরানের অংশগ্রহণ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ফিফার অবস্থানের কারণে সেই অনিশ্চয়তা কেটে যায়। এরপরও নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে ইরান ফুটবল ফেডারেশন পরিকল্পনা পরিবর্তন করে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার টাকসনে অবস্থান করার কথা থাকলেও দলটি শেষ পর্যন্ত মেক্সিকোর তিহুয়ানাকেই বেছে নেয়।
এতসব ঘটনার পরও সমর্থকদের বিশ্বাসে ভাটা পড়েনি। ক্যালিফোর্নিয়ার সান ডিয়েগো থেকে আসা ইরানি-আমেরিকান সমর্থক সিনা মোঘাদ্দাম মনে করেন, এসব চাপ দলকে দুর্বল নয়, বরং আরও শক্তিশালী করবে।
তিনি বলেন, 'ইরানের ইতিহাস হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। এ ধরনের পরিস্থিতি আমাদের আরও শক্তিশালী করে, দুর্বল নয়।'
বিশাল ইরানি পতাকা হাতে দাঁড়িয়ে থাকা এই সমর্থক আবার নকআউট পর্বে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য মুখোমুখি লড়াইয়ের স্বপ্নও দেখছেন। তার মতে, সেটি হলে বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত ম্যাচগুলোর একটি হবে।
অন্যদিকে নিরাপত্তা নিয়েও ছিল ব্যাপক সতর্কতা। সশস্ত্র মেক্সিকান পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর কড়া পাহারায় দলটিকে হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। অনুশীলন ভেন্যুতেও রাখা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে ছেলেকে নিয়ে সারারাত গাড়ি চালিয়ে আসা আরেক সমর্থক হোসেইন নিকইয়ার মনে করেন, তিহুয়ানায় অবস্থান করাটা দলের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ। তবে তারও অভিযোগ, বিশ্বকাপে রাজনীতি না থাকার যে কথা বলা হয়, বাস্তবতা তার সঙ্গে মেলে না।
তিনি বলেন, 'ফিফা বলে বিশ্বকাপে রাজনীতির কোনো স্থান নেই, সবকিছুই ফুটবলের ফেয়ার প্লে নিয়ে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, সেটি পুরোপুরি সত্য নয়।'
মাঠের বাইরে এতসব বিতর্ক ও উত্তেজনার মধ্যেই এখন বিশ্বকাপ মিশন শুরু করতে যাচ্ছে ইরান। নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়াম ও মিশরের বিপক্ষে গ্রুপ পর্বে খেলবে তারা। ইতিহাসে কখনোই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব পেরোতে না পারা ইরানের সামনে এবার নতুন অধ্যায় লেখার সুযোগ।