২৩ দিন বাকি

একাকী ঈশ্বর

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

পিঠটা দেখা যাচ্ছে।
শুধু পিঠ। ১০ নম্বর। আর পায়ের কাছে একটি বল।
সামনে ছয়জোড়া চোখ। একটি মাত্র মানুষের দিকে তাকিয়ে।
যেন তারা কোনো মানুষের দিকে তাকাচ্ছে না, তাকাচ্ছে এমন কিছুর দিকে, যার নাম তারা জানে, কিন্তু যাকে বোঝার ভাষা তাদের নেই।

এর কোনো ফুটবলীয় ব্যাখ্যা নেই। ট্যাকটিক্স দিয়ে বোঝানো যাবে না। কোচিং ম্যানুয়ালে এর কোনো অধ্যায় নেই। সেটা ছিল নিছক ভয়। আদিম, অকারণ, প্রায় পবিত্র।

১৯৮২ সালের বিশ্বকাপ, স্পেন। বেলজিয়ামের বিপক্ষে আর্জেন্টিনার ম্যাচ। মাঠের ঘাসে তখন ক্লান্তির ছায়া, কিন্তু একজনের পায়ের কাছে বলটা যেমনি এসে পড়ে, পুরো মাঠের বাতাস বদলে যায়। সেই মানুষটির নাম ডিয়েগো আর্মান্দো ম্যারাডোনা। বয়স একুশ। উচ্চতা পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি। এবং সেদিন, ক্যামেরার ফ্রেমে যা দেখা গেল, তা কোনো খেলার দৃশ্য ছিল না, তা ছিল একটি পুরাণের চিত্র।

লাল জার্সির ছয়জন বেলজিয়ান, প্রত্যেকেই তাদের দেশের সেরা, যেন একটি ওয়াল তৈরি করেছে। ফুটবলের নিয়ম মেনে, কোচের নির্দেশ মেনে, পেশাদারিত্বের তাগিদে। কিন্তু সেই ওয়ালের দিকে তাকালে 'প্রতিরোধ' শব্দটা মাথায় আসে না। আসে অন্য একটি শব্দ।

সমর্পণ।

একজন মাঝখানে দাঁড়িয়ে, শরীর সামান্য ঝুঁকিয়ে, দুই হাত দুই পাশে ছড়িয়ে, যেন নিজেকেই বিশ্বাস করাচ্ছে যে সে প্রস্তুত। তার পেছনে দুজন, তাদের পেছনে আরও তিনজন। কেউ ঝুঁকে আছে। কেউ পা ছড়িয়ে ভারসাম্য খুঁজছে। একজনের হাঁটু প্রায় বাঁকানো, যেন এক্ষুনি মাটিতে বসে পড়বে।

এবং প্রত্যেকের চোখ সেই নম্বর দশের দিকে।
ছবির কেন্দ্রে ম্যারাডোনা। একা, শান্ত, প্রায় অপার্থিব।
হ্যাঁ, ম্যারাডোনার মুখ দেখা যাচ্ছে না এই ছবিতে।
এবং এটাই ছবিটির সবচেয়ে নিষ্ঠুর সৌন্দর্য।

যার ভয়ে ছয়জন মানুষের শরীর এইভাবে টান টান হয়ে আছে, তার চেহারা দেখার প্রয়োজন নেই। পিঠটুকুই যথেষ্ট। কাঁধের বাঁকটুকু, পায়ের ভঙ্গিটুকু, বলের দিকে ঝুঁকে পড়ার সেই একটুখানি ইঙ্গিত, এটুকুই বেলজিয়ানদের স্নায়ু ছিঁড়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

ঈশ্বরের মুখ কেউ দেখে না। তার উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

এই ছবি একটি প্রশ্ন তোলে।

শারীরিক শক্তিতে ছয়জন একজনের চেয়ে বেশি। সংখ্যায় তারা এগিয়ে। তবু কেন তাদের শরীরে ভয়? কেন সেই কাঁধগুলো এতটা ন্যুব্জ? কেন পাগুলো মাটি আঁকড়ে ধরে আছে, দৌড়ানোর জন্য নয়, বাঁচার জন্য?

উত্তরটা সহজ নয়। কিন্তু যারা সেই সময়কার ম্যারাডোনাকে দেখেছেন, তারা জানেন। মাঠে তিনি কেবল একজন ফুটবলার ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি শক্তি, যার কোনো যুক্তিসঙ্গত মোকাবিলা সম্ভব ছিল না। আপনি তাকে থামাতে পারবেন না জেনেও লাইনে দাঁড়াতে হবে, এই ছিল তাদের নিয়তি।

১৯৮২-এর ম্যারাডোনা ছিলেন এমন একজন মানুষ, যার সম্পর্কে পুরো ফুটবল বিশ্ব তখনও নিশ্চিত হয়নি, কিন্তু প্রতিপক্ষ ইতোমধ্যেই বুঝে গিয়েছিল। সেই বিশ্বকাপে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন সাফল্যের হিসেবে, আর্জেন্টিনা বিদায় নেয় দ্বিতীয় রাউন্ডে। ম্যারাডোনাকে মেরে, ধাক্কা দিয়ে, ফাউল করে থামানো হয় বারবার। কিন্তু তা সত্ত্বেও, ওই ছবিটি থাকবে।

কারণ ছবিটি কোনো গোলের নয়। কোনো জয়ের নয়। এটি কেবল একটি মুহূর্তের, যে মুহূর্তে ছয়জন মানুষ বুঝে গিয়েছিল, বল যার পায়ে সে কোনো সাধারণ মানুষ নয়।
মহান ফুটবলারের সংজ্ঞা কী?

গোল? শিরোপা? পরিসংখ্যান?

হয়তো। কিন্তু ম্যারাডোনার মাপকাঠি ছিল আলাদা। তার মাপকাঠি ছিল, প্রতিপক্ষের চোখে যে ভয় জমে উঠত, বল পায়ে নেওয়ার আগেই। মাঠে প্রবেশের আগেই যে আতঙ্ক ড্রেসিংরুমে ছড়িয়ে পড়ত। যে মানুষকে থামাতে একটি দল পুরো ম্যাচের পরিকল্পনা বদলে ফেলত।

ম্যাচে সেদিন জিতেছিল বেলজিয়ানরা। কিন্তু এক নিয়তিও স্বীকার করে নিয়েছিল।

ফটোগ্রাফি অদ্ভুত শিল্প।

এটি সময়কে মেরে ফেলে। একটি মুহূর্তকে চিরকালের করে দেয়, তারপর সেই মুহূর্তটি বাঁচতে থাকে, শ্বাস নিতে থাকে, কথা বলতে থাকে। সেই ছবিতে বেলজিয়ানদের ভয় আজও জীবিত। ম্যারাডোনার অরা আজও অনুভব করা যায়। যদিও তিনি নেই, যদিও সেই মাঠ এখন স্মৃতি।