২৭ দিন বাকি

যে মানুষটির সামনে গোলপোস্ট ছোট হয়ে যেত

রামিন তালুকদার
রামিন তালুকদার

সেদিন লিভারপুলের আকাশে মেঘ ছিল। জুলাইয়ের বিকেলে হাওয়া বইছিল ধীরে, গুডিসন পার্কের গ্যালারিতে দর্শকের ভিড় ছিল অল্প, মাত্র আটত্রিশ হাজারের কিছু বেশি। এই সংখ্যাটা সেই মৌসুমে একই মাঠে অনুষ্ঠিত পাঁচটি বিশ্বকাপ ম্যাচের মধ্যে সবচেয়ে কম। কারণটা সহজ, এই শহরের মানুষ আশা করেছিল ইংল্যান্ডকে দেখবে। কিন্তু ফিফা শেষ মুহূর্তে ইংল্যান্ড বনাম পর্তুগাল সেমিফাইনালটা সরিয়ে দিয়েছে ওয়েম্বলিতে, আর সোভিয়েত ইউনিয়ন বনাম পশ্চিম জার্মানির এই ম্যাচটা পাঠিয়ে দিয়েছে মার্সিসাইডে। সেই শহরের মানুষ তখন ক্ষোভে ফুঁসছে, স্থানীয় কাগজ লিখেছিল, এটা 'ক্রীড়া ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা।'

কিন্তু গ্যালারিতে যারা ছিলেন, তারা সেদিন ইতিহাসের একটা পাতার সাক্ষী হয়ে গেলেন; চাইলেও না চাইলেও।

১৯৬৬ সালের সেই ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ ছিল এক অদ্ভুত সময়ের দলিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র একুশ বছর। ইউরোপ তখনও দুই ভাগে বিভক্ত; পশ্চিমে পুঁজিবাদ, পূর্বে সমাজতন্ত্র। ঠান্ডা যুদ্ধের বাতাস প্রতিটি ম্যাচের ওপর দিয়ে বইছিল। জাতীয় সংগীত বাজানো হতো না সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর জন্য, কারণ আয়োজকরা চাননি ওয়েম্বলির মাঠে সোভিয়েত বা উত্তর কোরিয়ার সুর ভেসে উঠুক। সেই রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে ফুটবল খেলতে নেমেছিল সোভিয়েত দল, ৩৬ বছর বয়সী এক গোলরক্ষককে সামনে রেখে, যাকে পৃথিবী তখন চেনে 'কালো মাকড়সা' নামে।

লেভ ইয়াসিন। আপাদমস্তক কালো পোশাকে। কালো জার্সি, কালো প্যান্ট, পায়ে কালো মোজা, মাঠের সবুজ ক্যানভাসে তিনি ছিলেন এক জীবন্ত প্রহেলিকা। চোখেমুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, অথচ পেশিতে লুকিয়ে থাকা বারুদের মতো ক্ষিপ্রতা। প্রতিপক্ষের স্ট্রাইকার যখন একা বল নিয়ে ডি-বক্সে ঢুকে পড়ত, তখন সেই চিরচেনা কালো অবয়বটিকে দেখে মুহূর্তের জন্য হলেও তার স্নায়ু বিকল হয়ে যেত। গোলপোস্টের নিচে তিনি যেন কোনো মানুষ ছিলেন না, ছিলেন এক অদৃশ্য দেয়াল।

সেই বিশ্বকাপে সোভিয়েত দলটা ছিল অসাধারণ। ক্যাপ্টেন আলবার্ট শেস্তেরনিয়ভ, মিডফিল্ডার ভ্যালেরি ভোরোনিন, স্ট্রাইকার ইগর চিসলেঙ্কো আর গ্যালিমজিয়ান খুসাইনভ; প্রতিটি নাম সেই প্রজন্মের ইউরোপীয় ফুটবলে ভয়ের কারণ। তরুণ ডায়নামো কিয়েভের স্ট্রাইকার ভ্যালেরি পোরকুইয়ানকে দলে নেওয়া হয়েছিল শেষ মুহূর্তে, সিদ্ধান্তটা প্রমাণিত হয়েছিল মাঠে।

গ্রুপ পর্বে প্রতিটি ম্যাচ জিতে উঠেছিল কোয়ার্টার ফাইনালে। যেখানে হাঙ্গেরির বিপক্ষে ইয়াসিনের গোলরক্ষণ ছিল দেয়ালের মতো। হাঙ্গেরি একটিমাত্র গোল করতে পেরেছিল, সেটাও সান্ত্বনামূলক। সোভিয়েত ইউনিয়ন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পৌঁছাল।

সামনে পশ্চিম জার্মানি।

২৫ জুলাই, ১৯৬৬। গুডিসন পার্ক।

জার্মান সমর্থকরা এসেছিল পনেরো হাজার। তাদের কণ্ঠস্বর ছাপিয়ে দিচ্ছিল বাকি সব। কিন্তু স্থানীয় লিভারপুলের মানুষ, যারা আসলে ইংল্যান্ডের খেলা দেখতে চেয়েছিল, অথচ পেল না, তারা অদ্ভুত এক সিদ্ধান্ত নিল। তারা সোভিয়েতদের পক্ষে গলা ফাটাল। হয়তো এটা ছিল ফিফার বিরুদ্ধে তাদের রাগের প্রকাশ, হয়তো এটা ছিল সেই সোভিয়েত দলটার প্রতি আসর জুড়ে গড়ে ওঠা ভালোবাসা, কারণ সোভিয়েতরা সেই বিশ্বকাপে ইংরেজ দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছিল তাদের সাহসী খেলায়।

ম্যাচ শুরু হলো। শুরু থেকেই স্পষ্ট হয়ে গেল, এটা সূক্ষ্ম ফুটবলের ম্যাচ হবে না। দ্য টাইমস পত্রিকা পরে লিখেছিল, এটা ছিল 'ড্রেডনট যুদ্ধজাহাজের লড়াই, ভারী বর্মের সংঘর্ষ।' প্রতিটি ট্যাকেলের শব্দ গ্যালারির ওপরের সারি পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছিল।

ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার আর উয়ে সিলারদের মতো তারকাদের নিয়ে গড়া জার্মান আক্রমণভাগ তখন ফুটবলের ত্রাস। সোভিয়েত রক্ষণে আক্রমণের পর আক্রমণ আছড়ে পড়ছে। কিন্তু সোভিয়েত দুর্গের শেষ প্রহরীর নাম যে লেভ ইয়াসিন! একের পর এক জার্মান গোলার মতো শট তিনি রুখে দিচ্ছিলেন জাদুকরের মতো। ডাইভ দিচ্ছেন তো দিচ্ছেনই, যেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কোনো প্রভাবই তার ওপর নেই।

এই অমানবিক রিফ্লেক্স আর ইস্পাতকঠিন স্নায়ুর পেছনে লুকিয়ে আছে এক কঠিন অতীত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ডামাডোলে মাত্র বারো বছর বয়সে তাকে কাজ নিতে হয়েছিল এক কারখানায়। সেই কারখানার ধুলোমাখা মাঠেই তার প্রথম বল ধরা। বরফের দেশে আইস হকিও খেলেছেন দারুণ দক্ষতায়। আইস হকির গোলরক্ষক হিসেবে তীব্র গতির পাক আটকানোর অভিজ্ঞতাই হয়তো তাকে ফুটবলের মাঠেও এমন অতিমানবিক ক্ষিপ্রতা দিয়েছিল। তার দুই হাত যেন ছিল চুম্বক, আর ফুটবলটা এক টুকরো লোহা।

ম্যাচের সেই ফ্রি-কিক আজও ফুটবল ইতিহাসের অমর দৃশ্য। জার্মান খেলোয়াড় বলের পেছনে দাঁড়িয়ে। গ্যালারি নিস্তব্ধ। শট নেওয়া হলো। বল বাতাস কেটে গোলের কোণের দিকে ছুটছে। আর ঠিক তখনই ইয়াসিন উড়লেন। হ্যাঁ, ডাইভ নয়, উড়লেন। পুরো শরীর প্রসারিত, কালো পোশাক বাতাসে ভেসে আছে যেন কোনো বিশাল পাখি ডানা মেলেছে। তার হাত বলটিকে ছুঁয়ে দিল। বলের গতিপথ বদলে গেল। হাজারো দর্শক একসঙ্গে বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল। কিন্তু ইয়াসিন উঠে দাঁড়ালেন এমন নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে, যেন তিনি কেবল নিজের দায়িত্ব পালন করেছেন।

এই নির্লিপ্ততাই তাকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছিল। অনেক গোলরক্ষক বড় সেভের পর চিৎকার করে উদযাপন করেন। ইয়াসিন করতেন না। তার মুখে থাকত এক অদ্ভুত শান্তি। যেন অসম্ভব বাঁচানো তার কাছে সাধারণ কাজ। আর সেই কারণেই প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকাররা ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলত। তারা বল মারার আগেই ভাবত, 'এই মানুষটিকে কি আদৌ পরাস্ত করা সম্ভব?'

পেনাল্টি সেভ করার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রায় অতিমানবীয়। বলা হয়, তিনি ১৫০টিরও বেশি পেনাল্টি ঠেকিয়েছেন। কিন্তু সংখ্যা দিয়ে ইয়াসিনকে ব্যাখ্যা করা যায় না। তার আসল শক্তি ছিল মানসিক দাপট। তিনি শট নেওয়ার আগে স্ট্রাইকারদের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতেন এমনভাবে, যেন তাদের মনের ভেতর ঢুকে পড়ছেন। অনেক খেলোয়াড় পরে স্বীকার করেছেন, ইয়াসিনের সামনে দাঁড়ালে গোলপোস্ট ছোট হয়ে যেত।

তার কালো পোশাক নিয়েও আছে আলাদা অধ্যায়। অন্যরা যখন উজ্জ্বল রঙের জার্সি পরত, ইয়াসিন ইচ্ছা করেই বেছে নিয়েছিলেন সম্পূর্ণ কালো পোশাক। কালো জার্সি, কালো শর্টস, কালো মোজা, এমনকি অনেক সময় কালো টুপিও। দূর থেকে তাকে মনে হতো রাতের ছায়া। সেই থেকেই জন্ম নেয় ‘ব্ল্যাক স্পাইডার’ নামটি। কারণ তিনি যেন নিজের জালে আটকে ফেলতেন প্রতিটি শট।

ইয়াসিনের আগে গোলকিপিং ব্যাপারটা ছিল বড্ড একঘেয়ে। গোললাইন ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা আর বল ধরতে পারলেই দায়িত্ব শেষ, এমন ধারণাকে তিনি ছুড়ে ফেলেছিলেন আঁস্তাকুড়ে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, গোলরক্ষক কেবল দলের শেষ রক্ষাকবচ নয়, সে প্রথম আক্রমণকারীও হতে পারে। বল লুফে নিয়েই বিদ্যুৎগতিতে নিখুঁত থ্রো করে তিনি দলের কাউন্টার অ্যাটাক শুরু করতেন। ডি-বক্সের বাইরে এসে বল ক্লিয়ার করার যে দৃশ্য আজ আমরা আধুনিক ফুটবলে দেখি, তার প্রথম রূপকার ছিলেন এই কালো মাকড়সাই।

তার এই অসামান্য কীর্তির স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৬৩ সালে তার হাতে উঠেছিল ব্যালন ডি'অর। ফুটবল ইতিহাসের একমাত্র গোলরক্ষক হিসেবে এই কীর্তি আজও তার একক সম্পত্তি হয়ে আছে। কোনো গোলরক্ষক যে কেবল গোল বাঁচিয়েই গোটা একটা ম্যাচের ভাগ্য একাই লিখে দিতে পারেন, ইয়াসিন ছিলেন তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

গুডিসন পার্কের সেই বিকেলে পশ্চিম জার্মানির কাছে সোভিয়েত ইউনিয়ন হয়তো হেরে গিয়েছিল, কিন্তু লেভ ইয়াসিনের সেই হাওয়ায় ভাসা ডাইভিং সেভগুলো অমরত্ব পেয়ে গিয়েছিল ফুটবল ইতিহাসে। গোলপোস্টের নিচে যখনই কোনো গোলরক্ষক অকল্পনীয় কোনো সেভ করেন, ফুটবল বিশ্ব যেন আজও সেখানে সেই 'কালো মাকড়সা'রই ছায়া দেখতে পায়।