বিশ্বকাপের ৩৮ দিন বাকি

অ্যাটলাসের সিংহদের হুঙ্কার: সেমিফাইনালে আফ্রিকা ও আরবের প্রথম প্রতিনিধি মরক্কো

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

ক্যামেরুন ১৯৯০, সেনেগাল ২০০২, ঘানা ২০১০— বিশ্বকাপের আঙিনায় আফ্রিকার দৌড় যেন চিরকাল লেখা ছিল কোয়ার্টার ফাইনালেই। ৯২ বছরের দীর্ঘ ইতিহাসে সেমিফাইনালের দরজাটা তাদের কাছে ছিল এক দুর্ভেদ্য দেয়াল। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের মরূদ্যানে আক্ষেপ আর দীর্ঘশ্বাসের এই অচলায়তনে ফাটল ধরায় মরক্কো।

ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার চিরচেনা আধিপত্য এড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার পর তৃতীয় দেশ হিসেবে তাদের সেমিফাইনালে পা রাখাটা ছিল ঐতিহাসিক। অ্যাটলাসের সিংহরা রচনা করে এমন এক রূপকথা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম মনে রাখবে ফুটবল বিশ্ব। মরুভূমির বুকে তারা ফুটিয়ে তোলে এমন এক ফুটবলীয় কাব্য, যার প্রতিটি ছত্রে মিশে ছিল অদম্য সাহস আর হার না মানা মানসিকতা।

টুর্নামেন্টের শুরু থেকেই মরক্কো আবির্ভূত হয়েছিল জায়ান্ট কিলার রূপে। গ্রুপ পর্বে ২০১৮ বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট ক্রোয়েশিয়া ও সোনালি প্রজন্মের বেলজিয়ামের মতো পরাশক্তির মুখোমুখি হয়েও তারা বিন্দুমাত্র বিচলিত হয়নি। বেলজিয়ামকে হারিয়ে এবং ক্রোয়েশিয়ার সঙ্গে ড্র করে চমক দেখায় দলটি। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নকআউট পর্বে পা রাখে ওয়ালিদ রেগ্রাগুইয়ের শিষ্যরা।

শেষ ষোলোর লড়াইয়ে তাদের সামনে দাঁড়ায় ২০১০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন। লুইস এনরিকের শিষ্যদের সমস্ত কৌশলকে নিজেদের জমাট রক্ষণের জালে আটকে ফেলে মরক্কানরা। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে গোলশূন্য থাকার পর টাইব্রেকারে গড়ানো ম্যাচে স্প্যানিশদের রীতিমতো স্তব্ধ করে দেন আশরাফ হাকিমি-সোফিয়ান আমরাবাত-হাকিম জিয়েশরা। কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কাটে মরক্কো, জানান দেয় নিজেদের সামর্থ্যের।

আসল ইতিহাস গড়ার মঞ্চটা প্রস্তুত ছিল দোহার আল থুমামা স্টেডিয়ামে, প্রতিপক্ষ কিংবদন্তি ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোসহ শক্তিশালী পর্তুগাল। টুর্নামেন্টে খেলা আগের চার ম্যাচে ১২ গোল নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে এসেছিল পর্তুগিজরা। অন্যদিকে, মরক্কোর ইস্পাতকঠিন রক্ষণ তখন পর্যন্ত বিপক্ষ দলের কোনো খেলোয়াড়কে গোল করার সুযোগই দেয়নি। একমাত্র গোলটি তারা হজম করেছিল কানাডার বিপক্ষে— নায়েফ অগার্দের আত্মঘাতী।

বিশ্বমঞ্চে এর আগে মাত্র দুবার একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল দল দুটি। দুবারই ছিল গ্রুপ পর্বের লড়াই, যেখানে জয়ের হিসাবটা ছিল সমানে সমান। ১৯৮৬ সালের দেখায় মরক্কো ৩-১ গোলের দারুণ এক জয় তুলে নিয়েছিল, আর ২০১৮ আসরে ১-০ ব্যবধানে শেষ হাসি হেসেছিল পর্তুগিজরা।

ম্যাচের ৪২তম মিনিট, ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। সতীর্থ ইয়াহিয়া আত্তিয়াতের বাড়ানো ক্রসে ইউসেফ এন-নেসিরি শূন্যে ভেসে যে জাদুকরী হেডটি করেন, তা যেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তিকেও হার মানিয়েছিল। বল যখন পর্তুগালের জালে জড়ায়, তখন কেবল একটি গোলের উদযাপন হয়নি, বরং লেখা হয় আফ্রিকা মহাদেশের প্রায় এক শতাব্দীর হাহাকারের অবসানের প্রথম শ্লোক।

দ্বিতীয়ার্ধে গোল শোধ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে তারকা ফুটবলারে ঠাসা পর্তুগাল। তারা একের পর এক আক্রমণ শানাতে থাকে মরক্কোর ডি-বক্সে। চোটের ছোবলে প্রথম পছন্দের চার ডিফেন্ডারের তিনজনকে হারিয়েও নিজেদের গোলপোস্টের সামনে অটল দুর্গ গড়ে তোলেন কোচ রেগ্রাগুই। এমনকি অধিনায়ক রোমেইন সাইস স্ট্রেচারে করে মাঠ ছাড়ার পর যোগ করা সময়ে দশ জনের দলে পরিণত হলেও কোনো ফাটল ধরেনি রক্ষণে।

উপায় না পেয়ে বদলির বেঞ্চ থেকে নামানো হয় রোনালদোকে। তবে পর্তুগিজদের ত্রাতা হতে পারেননি তিনি। নক-আউট পর্বে গোল না পাওয়ার হতাশা আর বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ার তীব্র বেদনা নিয়ে চোখের জলে টানেল দিয়ে তার প্রস্থান ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম বিষাদময় দৃশ্য। অন্যদিকে, মাঠের ভেতরে তখন প্রথম আফ্রিকান ও আরব দল হিসেবে মরক্কানদের সেমিফাইনালের টিকিট পাওয়ার বাঁধভাঙা উল্লাস।

পর্তুগালকে হারানোর পর মারাকেশের বিখ্যাত জেমা আল-ফনা চত্বর থেকে শুরু করে রাবাতের রাস্তায় নেমে এসেছিল মানুষের ঢল। এই উন্মাদনা কেবল মরক্কোতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। আইভরি কোস্টের আবিদজান থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ, তিউনিসিয়ার তিউনিস থেকে লিবিয়ার মিসরাতা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। এমনকি প্যারিসের চ্যাম্পস এলিসিস বা লন্ডনের এডজওয়ার রোডেও উড়েছিল মরক্কোর লাল-সবুজ পতাকা।

জয়ের পর আবেগাপ্লুত কোচ রেগ্রাগুই বলেছিলেন, 'আমরা সত্যিই দারুণ এক পর্তুগাল দলের মুখোমুখি হয়েছিলাম। আমাদের যা কিছু আছে তা নিয়েই লড়েছি, এখনো আমাদের খেলোয়াড়রা চোটে ভুগছে। ম্যাচের আগে ছেলেদের বলেছিলাম, আফ্রিকার জন্য আমাদের ইতিহাস গড়তে হবে। আমি খুব, খুব খুশি।'

এই অর্জনকে স্বীকৃতি দিতে পিছপা হয়নি আফ্রিকান ফুটবলও। মহাদেশটির সর্বোচ্চ ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিএএফ টুইট করেছিল, 'মহাদেশীয় অর্জন!... অ্যাটলাসের সিংহদের কী দারুণ এক অর্জন।' গোটা আরব বিশ্ব ও আফ্রিকা মহাদেশের প্রতিনিধি হয়ে উঠেছিল দলটি।

মরক্কোর মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি কিছু দৃশ্য চিরকাল গেঁথে থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের মনে। গ্যালারিতে ছুটে গিয়ে দলটির ফুটবলারদের তাদের মায়েদের জড়িয়ে ধরে চুমু খাওয়া কিংবা মাঠের সবুজ ঘাসে আনন্দে নাচার দৃশ্যগুলো তারা উপহার দিয়েছিল, যা ছিল নিখাদ ভালোবাসার এক অনন্য ক্যানভাস। পেশাদারিত্বের আড়ালে লুকিয়ে থাকা এই মানবিক আবেগের প্রকাশ মরক্কোকে প্রিয় করে তুলেছিল ভক্তদের কাছে।

তবে স্বপ্নের সেমিফাইনালে আগের আসরের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের অভিজ্ঞতার কাছে ২-০ ব্যবধানে হার মানতে হয় তাদের। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই থিও হার্নান্দেজের গোলে পিছিয়ে পড়াটা ছিল বড় ধাক্কা, আর শেষ মুহূর্তে রান্দাল কোলো মুয়ানির গোল তাদের ফাইনালে ওঠার স্বপ্ন চূর্ণ করে দেয়। পুরো ম্যাচে ৫১ শতাংশ বল দখলে রাখার পরও ফরাসি দেয়াল ভাঙতে না পারলেও বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের বিপক্ষে লড়াই করতে পারার গর্ব নিয়ে মাঠ ছাড়ে রেগ্রাগুইয়ের দল।

রূপকথার এই যাত্রায় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী প্লে-অফে গ্রুপ পর্বের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়ার কাছে ২-১ ব্যবধানে হেরে চতুর্থ হয়েই বিশ্বকাপ শেষ করতে হয় মরক্কোকে। শেষটা রাঙানো না গেলেও চোট আর ক্লান্তিতে জর্জরিত দলটির কাছে হয়তো এটি ছিল এক কদম বেশি ফেলার চেষ্টা।

তবে সেখানে কান্নার কোনো স্থান ছিল না৷ দর্শকদের প্রবল করতালির ঝংকারের মাঝে ছিল কেবলই প্রাপ্তির আনন্দ। মরক্কো যদিও কোনো ট্রফি জেতেনি, কিন্তু বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয় ঠিকই জিতে নিয়েছিল তারা।