সালেঙ্কো: স্বপ্ন সত্যি করে এক ম্যাচেই অমরত্ব
'আমি একটা স্বপ্ন দেখেছি,' ক্যালিফোর্নিয়ার এক হোটেলে ঘুম ভেঙে উঠে উত্তেজিত কণ্ঠে রুমমেটকে বলেছিলেন ওলেগ সালেঙ্কো। একটানা আরও বলে চলেছিলেন, 'আমি অনেকগুলো গোল করতে যাচ্ছি, আমরা ক্যামেরুনকে বিধ্বস্ত করতে যাচ্ছি আর ফাইনালে পৌঁছাতে যাচ্ছি।' বহুদিনের পুরোনো বন্ধুর এমন 'প্রলাপ' শুনে দিমিত্রি রাদচেঙ্কোর মনে হয়েছিল, সালেঙ্কোকে বুঝি এবার 'পাগলাগারদে পাঠানো দরকার'!
বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞে জালের দেখা পাওয়াই ফরোয়ার্ডদের কাছে অনেক সময় হয়ে ওঠে সোনার হরিণ। সেখানে এক ম্যাচে এক-দুই-তিন-চার নয়, পাঁচবার নিশানা ভেদ করা আক্ষরিক অর্থেই এক অকল্পনীয় আখ্যান! পেলে-দিয়েগো ম্যারাডোনাদের মতো কিংবদন্তি কিংবা ফেরেঙ্ক পুসকাস-জার্ড মুলারদের মতো গোলমেশিনরাও যা করে দেখাতে পারেননি, ২৪ বছরের টগবগে যুবক সালেঙ্কো যেন সেই অধরা মাধুরীকেই ছুঁতে চেয়েছিলেন।
ফুটবলের মহাযজ্ঞে এক ম্যাচে সর্বোচ্চ চার গোলের রেকর্ড এর আগে ছিল ছয় জনের— পোল্যান্ডের আর্নেস্ত উইলিমোভস্কি, ব্রাজিলের আদেমির, হাঙ্গেরির সান্দর ককসিস, ফ্রান্সের জুস্ত ফঁতেন, পর্তুগালের ইউসেবিও ও স্পেনের এমিলিও বুত্রাগুয়েনোদের মতো মহীরুহদের দখলে ছিল। কিন্তু একাই পাঁচ গোল! এ তো যেন নিছকই এক ফ্যান্টাসি।
তৎকালীন লেনিনগ্রাদে (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) এক রুশ পিতা ও ইউক্রেনিয়ান মাতার ঘরে জন্ম সালেঙ্কোর। কৈশোরেই ফুটবলীয় প্রতিভার দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন তিনি। ১৯৮৬ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে জেনিট লেনিনগ্রাদের (বর্তমানে জেনিট সেন্ট পিটার্সবার্গ) হয়ে ক্লাব ফুটবলে অভিষেক হয় তার। বদলি নেমে ডায়নামো মস্কোর বিপক্ষে ৪-৩ ব্যবধানের জয়ে জয়সূচক গোলটি করে রাতারাতি নায়ক বনে যান। এরপর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দলবদলের অর্থের (ট্রান্সফার ফি) বিনিময়ে যোগ দেন ডায়নামো কিয়েভে। ১৯৮৯ সালের ফিফা যুব বিশ্বকাপে ৫ গোল করে সালেঙ্কো জিতে নেন গোল্ডেন বুট।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙনের পর আন্তর্জাতিক আঙিনায় সিনিয়র পর্যায়ে তার পদচারণা শুরু হয়েছিল ইউক্রেনের জার্সিতে, খেলেছিলেন একটি প্রীতি ম্যাচ। এরপর নিয়তির টানে গায়ে জড়ান রাশিয়ার লাল জার্সি। যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে যখন পা রাখেন, তার নামের পাশে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা মাত্র দুটি। টুর্নামেন্টের শুরুটাও হয়েছিল ডাগআউটের নিভৃত কোণে— বেঞ্চে বসে।
'বি' গ্রুপে নিজেদের প্রথম দুই ম্যাচে পরাক্রমশালী ব্রাজিল (২-০) ও সুইডেনের (৩-১) কাছে হেরে রাশিয়ার নক-আউট পর্বে আশা তখন খাদের কিনারায় ঝুলছে। ব্রাজিলের বিপক্ষে বদলি হিসেবে নাম সালেঙ্কো সুইডেনের বিপক্ষে শুরুর একাদশে সুযোগ পেয়ে দেন আস্থার প্রতিদান, পেনাল্টি থেকে গোল করতে ভুল করেননি। কিন্তু শেষ ম্যাচে ক্যামেরুনকে বড় ব্যবধানে হারানোর কোনো বিকল্প ছিল না। পাশাপাশি আরও কিছু ম্যাচের ফল রাশিয়ার পক্ষে যাওয়ার চাহিদা ছিল।
২৮ জুন— স্ট্যানফোর্ড স্টেডিয়ামের সবুজ ক্যানভাসে সেদিন শুরু হলো সালেঙ্কোর জাদুকরী পারফরম্যান্সের প্রদর্শনী। ১৬তম মিনিটে প্রতিপক্ষের গোলরক্ষকের দুই পায়ের নিচ দিয়ে বল জালে পাঠিয়ে শুরু। এরপর ক্যামেরুন মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ হারালে পাল্টা আক্রমণে রাশিয়ার দ্বিতীয় গোলটি আসে তার পা থেকেই। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার ঠিক আগে সতীর্থ ইলিয়া সিমবালার ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি থেকে হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন এই ৯ নম্বর জার্সিধারী স্ট্রাইকার।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে অবশ্য পাদপ্রদীপের আলো কিছুটা কেড়ে নিয়েছিলেন ক্যামেরুনের ৪২ বছর ৩৯ দিন বয়সী কিংবদন্তি রজার মিলা। বিরতি শেষে বদলি হিসেবে নেমেই ব্যবধান কমিয়ে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতার রেকর্ড গড়েন তিনি। কিন্তু ওই লগ্নটি যে শুধুই সালেঙ্কোর জন্য বরাদ্দ ছিল! ওমারি তেত্রাদজের কাটব্যাক থেকে নিজের চতুর্থ গোলটি করে আদেমির-ককসিস-ইউসেবিওদের রেকর্ডে ভাগ বসান তিনি। আর ৭৫তম মিনিটে গোলরক্ষকের মাথার ওপর দিয়ে বল চিপ করে জালে জড়াতেই রচিত হয় নতুন ইতিহাস। সালেঙ্কো পৌঁছে যান নতুন চূড়ায়! বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম ও এখন পর্যন্ত একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে এক ম্যাচে পাঁচ গোলের অনবদ্য রেকর্ড গড়েন সালেঙ্কো। ম্যাচটি রাশিয়া জিতেছিল ৬-১ ব্যবধানে।
সেই 'পরাবাস্তব' মুহূর্তটি নিয়ে সালেঙ্কো বলেছিলেন, 'ম্যাচের সময় রেকর্ডের কথা আমার মাথায় ছিল না। মাঠের লাউড স্পিকারে তারা কিছু একটা বলছিল, কিন্তু আমরা যেন যত বেশি সম্ভব গোলে জিততে পারি— আমার মনোযোগ ছিল শুধু সেদিকেই। তাছাড়া, কথাটা ইংরেজিতে বলা হচ্ছিল বলে আমি ঠিক বুঝতেও পারিনি যে, আসলে কী বলা হচ্ছে।'
দুর্দান্ত ওই জয়ের পরও গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়ঘণ্টা বাজে রাশিয়ার— সৌদি আরবের কাছে বেলজিয়াম, বুলগেরিয়ার কাছে আর্জেন্টিনা ও নাইজেরিয়ার কাছে গ্রিস হেরে যাওয়ায়। তবে সুইডেনের বিপক্ষে করা একটি আর ক্যামেরুনের বিপক্ষে পাঁচটি— মোট ছয় গোল নিয়ে বুলগেরিয়ার রিস্টো স্টইচকভের সঙ্গে যৌথভাবে সেবারের গোল্ডেন বুট জিতে নেন সালেঙ্কো। ফুটবলের ইতিহাসে তিনিই একমাত্র খেলোয়াড়, যিনি নক-আউট পর্বে না খেলেও এই পুরস্কার জিতেছেন। শুধু তা-ই নয়, যুব বিশ্বকাপ ও মূল বিশ্বকাপ— দুটিতেই গোল্ডেন বুট জেতার একমাত্র অনন্য রেকর্ডটিও এখন পর্যন্ত কেবল তার নামের পাশেই অম্লান হয়ে আছে।
বার্সেলোনায় খেলা স্টইচকভের সঙ্গে এই পুরস্কার ভাগাভাগি নিয়ে এক মজাদার স্মৃতিচারণ করেছিলেন বিশ্বকাপের পর আরেক স্প্যানিশ ক্লাব ভ্যালেন্সিয়ায় সালেঙ্কো, 'এমন একজন কিংবদন্তি খেলোয়াড়ের সঙ্গে গোল্ডেন বুট ভাগ করে নেওয়াটা সম্মানের। পরবর্তীতে আমাদের বেশ কয়েকবার দেখাও হয়েছে। সে ছিল বার্সেলোনায়, আমি ভ্যালেন্সিয়ায়। ও মজা করে বলতো, আমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে, সে আরও একটা গোল বেশি করেনি। আমিও বলতাম, ওরও কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে, ক্যামেরুনের বিপক্ষে আমি নিজে শেষ গোলটি না করে দিমকাকে (রাদচেঙ্কো) দিয়ে করিয়েছিলাম!'
এই অবিশ্বাস্য অর্জনের পর যখন বিশ্ব ফুটবল সালেঙ্কোর পায়ের জাদুতে মুগ্ধ হওয়ার অপেক্ষায়, ঠিক তখনই ঘটে এক নিদারুণ উল্কাপতন। কোচের সঙ্গে তিক্ততা আর ফর্মহীনতার বিষাদময় সমীকরণে স্ট্যানফোর্ডের সেই জাদুকরী ম্যাচটিই হয়ে রইল রাশিয়ার জার্সিতে তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এরপর আর কখনোই জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামা হয়নি তার। ক্লাব পর্যায়ে ভ্যালেন্সিয়া ও রেঞ্জার্সের মতো ঐতিহ্যবাহী দলে খেললেও ভগ্ন স্বাস্থ্যের কাছে হার মেনে ২০০১ সালে মাত্র ৩১ বছর বয়সেই বুটজোড়া তুলে রাখতে বাধ্য হন তিনি। সালেঙ্কোর পুরো আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার থমকে যায় মাত্র নয়টি ম্যাচেই!
অকাল অবসরের এই আক্ষেপ হয়তো তাকে পোড়ায়, তবে ১৯৯৪ সালের সেই দিনটি তাকে অমরত্বের সুধা পান করিয়েছে। গর্ব আর স্মৃতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেছিলেন, 'এক ম্যাচে পাঁচ গোল করতে পারাটা আমার জন্য অত্যন্ত গর্বের। এটাই বিশ্বকাপের সৌন্দর্য— পুরো বিশ্ব আপনার দিকে তাকিয়ে থাকে। আপনি যদি অসাধারণ কিছু করেন, তবে চিরকাল মানুষের মনে থাকবেন। আজও পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ আমার কাছে এসে সেই দিনের কথাই বলে।'