আর বাকি ৯৯ দিন

শিরোপার প্রত্যাশা যখন মরীচিকা: ফেভারিটদের স্বপ্নভঙ্গ হয় বারবার

সাব্বির হোসেন
সাব্বির হোসেন

ফুটবল বিশ্বকাপের সুদীর্ঘ যাত্রায় একটি ধ্রুব সত্য বারবার সামনে এসেছে— চিত্রনাট্য আসলে কখনোই আগে থেকে লিখে রাখা যায় না। মাঠের লড়াই শুরুর আগে যারা নিজেদের অপ্রতিরোধ্য ভেবে বসেন, শেষ হাসিটা প্রায়ই তাদের হাসা হয় না বলে ইতিহাস সাক্ষী। ১৯৩৪ সালে অস্ট্রিয়ার 'ভুন্ডারটিম' থেকে শুরু করে ১৯৫৪ সালে হাঙ্গেরির 'ম্যাজিক্যাল ম্যাগিয়ার্স' কিংবা ১৯৮২ সালে ব্রাজিলের শৈল্পিক ফুটবল খেলা দল— বিশ্বকাপের মঞ্চ বারবার আগে থেকে ভেবে রাখা ফেভারিটদের বধ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ বিশ্বকাপ যখন কড়া নাড়ছে দুয়ারে, তখন পেছনে ফিরে তাকালে একটি চমকপ্রদ মিল চোখে পড়ে: যাদের মাথায় শিরোপা ওঠার কথা থাকে, শেষ পর্যন্ত সেরার মুকুটটা তাদের জন্য বড় বেশি ভারী হয়ে দাঁড়ায়।

১৯৫৪

শুরুর দিকের হৃদয়ভঙ্গ (১৯৩০-১৯৫৪)

১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপেই এই ধারার শুরু। ফেভারিট হিসেবে আর্জেন্টিনা (১৯২৭ ও ১৯২৯ সালের দক্ষিণ আমেরিকান চ্যাম্পিয়নশিপ বা কোপা আমেরিকাজয়ী) মন্তেভিদিওতে পা রাখে। স্বাগতিক উরুগুয়েও (১৯২৪ ও ১৯২৮ সালের অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন) তখন ছিল পাদপ্রদীপের আলোয়।

দুই দলই সেমিফাইনালে ৬-১ গোলের বিশাল জয়ে ফাইনালে উঠলেও শিরোপা নির্ধারণী মঞ্চের স্নায়ুচাপ বদলে দেয় সব। এমনকি কোন বল দিয়ে খেলা হবে, তা নিয়েও শুরু হয় ঝগড়া! প্রথমার্ধে নিজেদের তৈরি বল দিয়ে খেলে ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত স্বপ্নভঙ্গ হয় আলবিসেলেস্তেদের। দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুইয়ানরা তাদের বল দিয়ে খেলে তিনবার লক্ষ্যভেদ করে ৪-২ গোলে জিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়।

চার বছর পর ১৯৩৪ বিশ্বকাপে দুনিয়াকে মুগ্ধ করেছিল 'ভুন্ডারটিম' খ্যাত অস্ট্রিয়ার সেই বিখ্যাত দল। টানা ১৪ ম্যাচে অপরাজিত থেকে তারা বিশ্বকাপ খেলতে এসেছিল। কিন্তু সেমিফাইনালে ইতালির কৌশলের কাছে ১-০ গোলে হেরে যায় তারা। অথচ দুই দলের আগের ১২ দেখায় স্রেফ একটিতে জিতেছিল আজ্জুরিরা। এরপর ফাইনালে চেকোস্লোভাকিয়াকে হারানো ইতালি ১৯৩৮ সালের আসরেও চ্যাম্পিয়ন হয়ে শিরোপা ধরে রাখে।

তবে সবচেয়ে বড় আবেগময় ঘটনা ঘটে ১৯৫০ সালে। এর আগের বছর কোপা আমেরিকায় আট ম্যাচে ৪৬ গোল করা স্বাগতিক ব্রাজিলকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ধরে নিয়ে ফাইনালের আগেই সংবাদপত্রে শিরোনাম হয়— 'এরাই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন'। কিন্তু পিছিয়ে থেকেও ঘুরে দাঁড়িয়ে ২-১ গোলে জিতে ইতিহাস গড়ে উরুগুয়ে। স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় ২ লাখ দর্শক রীতিমতো স্তব্ধ হয়ে যান। এটি ফুটবল বিশ্বে 'মারাকানাজো' বা মারাকানা ট্র্যাজেডি নামে পরিচিত।

১৯৫৪ সালের বিশ্বকাপে ফেরেঙ্ক পুসকাস ও স্যান্দর ককসিসের সমন্বয়ে ফেভারিট হাঙ্গেরি ছিল ইতিহাসেরই অন্যতম সেরা দল। গ্রুপ পর্বে তৎকালীন পশ্চিম জার্মানিকে 8-৩ গোলে বিধ্বস্ত করা দলটি ফাইনালে সেই একই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়। তবে মাত্র ৮ মিনিটের মাথায় ২-০ গোলে এগিয়ে গিয়েও শেষ পর্যন্ত ৩-২ ব্যবধানে পরাস্ত হয় তারা, যা 'মিরাকল অব বার্ন' বা বার্নের বিস্ময় হিসেবে পরিচিত।

ব্রাজিলের দাপট ও ব্যর্থতার গল্প (১৯৫৮-১৯৮২)

১৯৫৮ সালে পশ্চিম জার্মানি ফেভারিট থাকলেও বিশ্ব অবাক হয়ে দেখে ১৭ বছরের কিশোর পেলে ও ২৪ বছরের তরুণ গারিঞ্চার পায়ের জাদু। তাদের ওপর ভর করেই আট বছর আগের বেদনা ভুলে বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজেদের প্রথম ট্রফি জেতে ব্রাজিল। চার বছর পরও সাফল্যের ধারা বজায় রাখে তারা। পেলে চোটে পড়লেও গারিঞ্চার একক নৈপুণ্যে টানা দ্বিতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হয় সেলেসাওরা।

কিন্তু ১৯৬৬ বিশ্বকাপে ঘটে ছন্দপতন। টানা তিন শিরোপার লক্ষ্যে থাকা ব্রাজিলের স্কোয়াডটি ছিল বয়সের ভারে ন্যুব্জ। আর প্রতিপক্ষের কড়া ট্যাকলে বারবার জর্জরিত হন পেলে। সব মিলিয়ে গ্রুপ পর্ব থেকেই ছিটকে যায় ফেভারিটরা। শিরোপা জিতে নেয় আয়োজক ইংল্যান্ড। ১৯৭০ সালের আসরে পেলের দক্ষতায় ব্রাজিল আবার ছন্দে ফেরে। সেবারই প্রথম কোনো ফেভারিট দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি নান্দনিক ফুটবল খেলে প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে যায়।

চার বছর পর আবারও শুরু হয় ফেভারিটদের পতন। ইয়োহান ক্রুইফের 'টোটাল ফুটবল' দিয়ে বিশ্ব কাঁপানো নেদারল্যান্ডস ফাইনালে পশ্চিম জার্মানির কাছে হেরে যায়। ১৯৭৮ সালেও ফেভারিট জার্মানি ও ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে ঘরের মাঠে বাজিমাত করে প্রথমবারের মতো সোনালী ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরে স্বাগতিক আর্জেন্টিনা।

তবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে শোকাবহ বিদায়ের ঘটনা ঘটে ১৯৮২ সালে। জিকো-সক্রেটিসদের নিয়ে গড়া সেই শৈল্পিক ব্রাজিল দলটি ইতালির পাওলো রসির হ্যাটট্রিকে যেন নির্বাক হয়ে যায়! দ্বিতীয় গ্রুপ পর্বে ৩-২ গোলে হেরে থামে তাদের টানা ২৪ ম্যাচ অপরাজিত থাকার যাত্রা। এরপর ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে দীর্ঘ ৪৪ বছর পর ফের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় ইতালি।

আধুনিক যুগের অঘটন (১৯৮৬-২০২২)

১৯৮৬ সালের আসরে ব্রাজিল সামান্য ব্যবধানে ফেভারিট থাকলেও দিয়েগো ম্যারাডোনার জাদুতে শিরোপা জেতে আর্জেন্টিনা। তার সেই অতিমানবীয় পারফরম্যান্স এখনও বিস্ময়ে অভিভূত করে ফুটবলপ্রেমীদের। চার বছর পর স্বাগতিক ইতালি ফেভারিট থাকলেও আর্জেন্টিনাকে পরাস্ত করে চ্যাম্পিয়ন হয় পশ্চিম জার্মানি।

১৯৯৪ ও ১৯৯৮— দুই বিশ্বকাপেই ব্রাজিল ছিল ফেভারিটদের তালিকার শীর্ষে। যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে সেলেসাওরা শিরোপা জিতলেও চার বছর পর ফ্রান্সে ঘটে নাটকীয়তা। ফাইনালের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে রোনালদোর রহস্যময় অসুস্থতা পুরো ব্রাজিল দলকে এলোমেলো করে দেয়। স্বাগতিকরা জিনেদিন জিদানের জোড়া গোলে একপেশে লড়াইয়ে ৩-০ ব্যবধানে জিতে নিজেদের প্রথম শিরোপার স্বাদ পায়।

নতুন সহস্রাব্দে অঘটনের মাত্রা আরও বাড়ে। ২০০২ সালে ফেভারিট থাকা আর্জেন্টিনা ও ফ্রান্স গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। অথচ ধুঁকতে ধুঁকতে বিশ্বমঞ্চে যাওয়া ব্রাজিল রোনালদোর অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনে রেকর্ড পঞ্চমবারের মতো চ্যাম্পিয়ন হয়। চার বছর পর রোনালদিনহো-কাকাদের নিয়েও তারাই ছিল ফেভারিট। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে দলটি বিদায় নেয় জিদানের ফ্রান্সের কাছে। ফরাসিরাও শেষমেশ পারেনি, ফাইনালে পেনাল্টি শ্যুটআউটে হারে ইতালির কাছে।

আর্জেন্টিনাদক্ষিণ আফ্রিকায় ২০১০ সালের বিশ্বকাপে স্পেন তাদের 'টিকি-টাকা' ফুটবলশৈলী দিয়ে ফেভারিটদের মান রক্ষা করে শিরোপা জেতে। নতুন কোনো অঘটনের তাই জন্ম হয়নি। কিন্তু চার বছর পর সেই পুরনো বিড়ম্বনা ফিরে আসে আরও ভয়ঙ্করভাবে। ঘরের মাঠে ফেভারিট ব্রাজিল সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বিব্রতকর পরাজয়ের স্বাদ পায়। এরপর ফাইনালে জার্মানরা হাসে শেষ হাসি।

২০১৮ ও ২০২২ সালের গত দুটি আসরেও এই ধারা বজায় ছিল। রাশিয়ার মাটিতে শিরোপাধারী জার্মানি গ্রুপ পর্বেই বিদায় নেয়। আর সবশেষ কাতার বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও ফ্রান্সের গায়ে ফেভারিট তকমা থাকলেও শেষ পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৬ বছরের আক্ষেপ ঘোচায় আর্জেন্টিনা। সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচ হেরে অভিযান শুরু করলেও লিওনেল মেসির হাত ধরে তৃতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয় আলবিসেলেস্তেরা।

বিশ্বকাপ আসলে এমন এক মহাযজ্ঞ, যেখানে ফর্মের চেয়ে স্নায়ুর লড়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নান্দনিক ফুটবলের চেয়ে বেশি কার্যকর কৌশল। আর ১৯৫০ সালের উরুগুয়ে হোক বা ১৯৮২ সালের ইতালি— এই চ্যাম্পিয়ন দলগুলোকে নিয়ে কেউ আগে থেকে উচ্চবাচ্য করেনি। মাঠের লড়াইয়ে তাই প্রত্যাশার চাপে 'শিকার' হওয়ার চেয়ে লক্ষ্যভেদী 'শিকারী' হওয়াটাই জয়ের আসল চাবিকাঠি।