একপেশে লড়াইয়ে রাজনীতির রঙ লাগিয়ে উত্তেজনা কতদিন?
ভারত-পাকিস্তান লড়াই যেন কাজীর গরুর মতোন, মানে কাগজে আছে গোয়ালে নেই। 'ভারতের তো গ্রুপে এখন সহজতম একটা ম্যাচই বাকি।' উপস্থাপককে থামিয়ে ধারাভাষ্যকার হার্শা ভোগলে মজা করে বলে উঠেন, 'এই ম্যাচ থেকেও কি সহজ?'
ভারতের কাছে পাকিস্তান এখন হরহামেশা যেভাবে বিধ্বস্ত হয়। বিপুল হাইপ উঠা ম্যাচের যে ম্যাড়ম্যাড়ে পরিণতি হয় দিনশেষে, কেউ সিরিয়াসলি এটা ভারতের জন্য সহজ ম্যাচ বললে আপত্তি করার জায়গা সীমিত।
দুই দলের লড়াইয় এখন ছড়ায় না উত্তাপ। সর্বশেষ ২০২২ সালে মেলবোর্নে বিরাট কোহলির ক্ল্যাসিক ফিনিশিংয়ে শেষ বলের রোমাঞ্চ দেখা গিয়েছিল। এরপর ওয়ানডে বিশ্বকাপ, ওয়ানডে এশিয়া কাপ, এবারের এশিয়া কাপের প্রথম লড়াইয়ে ভারত জিতেছে প্রবল দাপটে। মাঝে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কিছুটা লড়াই জমেছিলো।
বহুজাতিক আসরে দুই দলের লড়াইয়ের পরিসংখ্যান একদম একতরফা। টি-টোয়েন্টিতে ১৪বারের দেখায় পাকিস্তান ভারতকে হারাতে পেরেছে কেবল ৩বার। কিন্তু বিশ্বকাপে একবার, এশিয়া কাপে একবার।
বৈশ্বিক আসরে ওয়ানডের বেলাতেও একই ছবি। বিশ্বকাপে কখনই পাকিস্তান জেতেনি ভারতের বিপক্ষে, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে জিতেছে দুবাবার। সাম্প্রতিক লড়াই এত বেশি একপেশে যে ভারত না জিতলেই সেটা হবে বড় অঘটন। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে দুই দলের সর্বশেষ ২০ দেখায় পাকিস্তানের জয় কেবল ৩টি।
গত রোববার দুবাইতে দুই দলের ম্যাচে ছিলো বিস্তর ফারাক। একপেশে ম্যাচ ভারত জিতে নেয় হেসেখেলে। অথচ এই ম্যাচ নিয়েই পরে কত উত্তেজনা! সবটাই রাজনীতিকে ঘিরে। ভারতীয় খেলোয়াড়দের ম্যাচ শেষে সৌজন্যতা না দেখিয়ে হান না মেলানো, এর জেরে পাকিস্তান অধিনায়কের পুরস্কার বিতরনী মঞ্চ বর্জন।
এই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ট্যাগ, খেলার আগে চূড়ান্ত হাইপ কি একটু বাড়াবাড়ি এই প্রশ্ন উঠছে। মাঠের পারফরম্যান্সে ফারাক চলতে থাকলে রাজনৈতিক রঙ লাগিয়েও বাণিজ্যিক রসদ জারি রাখা কঠিন হতে পারে।
এই সময়ে দুই দলের স্কিলের পার্থক্য হয়ে গেছে বিস্তর। প্রতিটি সেক্টর ধরে তুলনা করলে পাকিস্তানকে কাগজে কলমে পিছিয়ে রাখতে হয় অনেকটা। টপ অর্ডার ব্যাটিং, মিডল অর্ডার ব্যাটিং, পেস বোলিং, স্পিন বোলিং। ছক্কা মারার সামর্থ্য, রান আটকে রাখার মুন্সিয়ানা। সব কিছুতেই ভারতীয়রা এগিয়ে।
রোববার দুবাইতে সালমান আঘাদের বিধ্বস্ত হওয়ার পর হতাশায় এক পাকিস্তানি ভক্ত বলছিলেন, 'এরা আধুনিক ক্রিকেট খেলতেই জানে না। আপনি বাবর আজমদের নিয়ে খেলেন বা এই সালমানদের নিয়ে খেলেন, কিছুতেই কিচ্ছু হবে না। পাকিস্তানের ক্রিকেটের ডিএনএটাই নাই এখন।'
পাকিস্তান-ভারতের লড়াই বিশ্ব ক্রিকেটের জন্য এক সময় ছিলো সাড়া জাগানো এক রোমাঞ্চের নাম। দুই দলের লড়াইয়ে জন্ম হতো অনেক তারকার, অনেক বিশ্বখ্যাত তারকা আবার হয়ে যেতেন ট্র্যাজিক হিরো।
এখন তারকার ভার কেবল এক দলেই, পাকিস্তান তাদের দল অনেক দিন ধরেই কোন থিতু আদল দিতে পারছে না। পেসারদের ঐতিহ্যে ভরপুর পাকিস্তান দল যেন পেসার শূন্য! ভারতের বিপক্ষে তারা নামল এক পেসার নিয়ে। সেই একমাত্র পেসার শহীন আফ্রিদি আবার বল করেছেন মাত্র দুই ওভার।
পাকিস্তানের এই হালে অবাক হন না দলটির সাবেক অধিনায়ক শোয়েব মালিক। তার মতে স্তবির হয়ে পড়া পাকিস্তানের ক্রিকেট তলানির দিকে যাত্রা করেছে বেশ কিছু বছর ধরে, 'আমি একদম অবাক নই এমন ফলাফলে। আমাদের ক্রিকেট কোথায় দাঁড়িয়ে আছে এটা এই ম্যাচে দেখে গেছে। এমন না যে খারাপ দিন গেছে, খারাপ দিন নয়। আপনার স্কিলই নেই।'
'আমাদের চোখ খোলা জরুরি। হকিতে এক সময় আমরা সেরা ছিলাম, এখন সেটা একদম তলানিতে চলে গেছে, ক্রিকেটও সেই পথেই আছে। আমার এদের প্রতি কোন প্রত্যাশা ছিলো না। বড় দলের বিপক্ষে আমাদের সুযোগ নাই। আমি সব সংস্করণের কথা বলছি। আমাদের ক্রিকেট থেমে আছে অনেকদিন।'
কৌতুক করে কথা চালু আছে, সকালে এক বোর্ড সভাপতির অধীনে পাকিস্তান ক্রিকেটের দিন শুরু হয়, সন্ধ্যায় দিন শেষ হয় আরেক সভাপতির অধীনে। প্রশাসনিক অহরহ রদবদল ছাড়াও কোচ বদল, অধিনায়ক বদল নিত্য ঘটনা। পাকিস্তানে কে কখন অধিনায়ক হচ্ছে, কোচ হচ্ছেন খোদ ক্রিকেটারদের জন্যই হিসাব রাখা কঠিন।
মালিক বলছিলেন, 'আমাদের এখানে চার মাসের জন্য কেউ ক্রিকেট চালাতে আসেন, তারপর চলে যান আরেকজন আসেন। এভাবেই চলছে।'
ভারত, ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া যে মানে নিয়ে গেছে এমন হযবরল অবস্থায় থাকা কারো সেই মান হুট করে স্পর্শ করা সম্ভব না। এক সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছিলো প্রতাপশালী দল। প্রতিভার কমতি না থাকার পরও বড় দলগুলোর সঙ্গে আর পাত্তা পায় না তারা। মাঝে-সাঝে জিতলে বরং সেটাই হয় খবর।
ভারত-পাকিস্তানের ক্রিকেট লড়াইকে রাজনৈতিক রসদ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। পেহেলগ্রামে সন্ত্রাসী হামলা, তারপর দুই দেশের যুদ্ধ জড়ানো, উগ্র জাতীয়তাবাদের চাষ দুই প্রান্তের মানুষকে আরও আলাদা করেছে বিদ্বেষের দেয়াল দিয়ে। ক্রিকেটীয় আলাপ সরিয়ে রেখে তাই ম্যাচ শেষে হাত না মেলানো, প্রেজেন্টেশন অনুষ্ঠান বর্জন তাই আপাতত আলোচ্য। তবে ক্রিকেটীয় স্কিলের ফারাক যদি প্রমিনেন্ট থাকে, লড়াই যদি হয় একপেশে তবে রাজনীতির রঙ দিয়ে একই হাইপ বেশিদিন জারি রাখা কঠিন।
এমনকি ঠিক মজা পাচ্ছে না ভারতীয়রাও। আবুধাবিতে বাস করা কেরালার ট্যাক্সি চালক উনাইস থট্টিল ইউসুফ যেমন বলছিলেন, 'কী দেখব এশিয়া কাপ, আছে তো একটা দল। আর কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নেই।। দেখলেন না গতকাল (রোববার) কতটা একপেশে খেলা হলো।'
সুপার ফোরে দুদলের সম্ভাব্য আরেক ম্যাচ ২১ সেপ্টেম্বর। রাজনীতির রঙ ছাড়া ম্যাচটিতে দর্শকদের আগ্রহী করা যেত কতটা এই প্রশ্ন আছে।