'বুকের ওপর থেকে যেন পাথর নেমে গেল'
টানটান উত্তেজনা, ক্ষণে ক্ষণে রং বদলানো ম্যাচ আর এশিয়ান গেমস থেকে ছিটকে পড়ার প্রবল শঙ্কা। এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল বাংলাদেশ হকি দল। শেষ পর্যন্ত টাইব্রেকারের রোমাঞ্চে হংকংকে ৩-২ গোলে হারিয়ে সেই শঙ্কার মেঘ কাটিয়েছে লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা। আর এই জয়ে খেলোয়াড়দের বুকের ওপর চেপে বসা এক বিশাল পাথর যেন নেমে গেছে!
থাইল্যান্ডের ব্যাংককে গতকাল হংকংয়ের বিপক্ষে ম্যাচটি তাই ছিল বাঁচা-মরার লড়াই। এই জয়ের মধ্য দিয়ে পুরুষদের এশিয়ান গেমসে অন্তত ষষ্ঠ স্থান নিশ্চিত করেছে বাংলাদেশ। টুর্নামেন্টের শীর্ষ ছয় দল ২০২৬ সালে জাপানে অনুষ্ঠিতব্য এশিয়ান গেমসে খেলার সুযোগ পাবে, ফলে বাংলাদেশের টিকিটও নিশ্চিত হয়ে গেছে। আগামীকালের পঞ্চম স্থান নির্ধারণী ম্যাচে তারা চাইনিজ তাইপের মুখোমুখি হবে।
বাংলাদেশ হকি দল কখনোই এশিয়ান গেমসে খেলা থেকে বঞ্চিত হয়নি। বাছাইপর্বের গত তিন আসরে তারা হয় চ্যাম্পিয়ন, নয়তো রানার্সআপ হয়েছে। তবে ২০১৪ সালের চ্যাম্পিয়নরা এবার গ্রুপ পর্বের তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে উজবেকিস্তানের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে সেমিফাইনালে ওঠার সুযোগ হারায়। ফলে এশিয়ান গেমসে জায়গা পেতে হংকংয়ের বিপক্ষে জয় ছাড়া আর কোনো বিকল্প ছিল না।
ম্যাচ শেষে থাইল্যান্ড থেকে দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফরোয়ার্ড রাকিবুল হোসেন নিজেদের এই স্বস্তির কথা তুলে ধরে বলেন, 'হংকংয়ের বিপক্ষে জয় পাওয়াটা আমাদের জন্য বুকের ওপর থেকে পাথর নেমে যাওয়ার মতো ঘটনা। কারণ, এশিয়ান গেমসে খেলা সবসময়ই বাংলাদেশের জন্য একটি গর্বের বিষয়।'
এশিয়ান গেমসে কোয়ালিফাই করতে না পারলে কী হতো, সেই ভয়াবহ চিত্রও ফুটে ওঠে তার কথায়। তিনি জানান, এশিয়ান গেমসে খেলতে না পারলে দেশের হকি ডুবে যেত এবং তারা কাউকে মুখ দেখাতে পারতেন না।
মাঠের লড়াইয়ে অবশ্য উত্তেজনার কোনো কমতি ছিল না। প্রথম ৫ মিনিটের মধ্যেই রাকিবুল হোসেনের ফিল্ড গোল এবং আমিরুল ইসলামের পেনাল্টি স্ট্রোকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় বাংলাদেশ। কিন্তু এরপরই রক্ষণের দুর্বলতায় ম্যাচে ফেরে হংকং। ষষ্ঠ মিনিটে পেনাল্টি কর্নার থেকে গোল শোধ করার পর ৩২তম মিনিটে ইশতিয়াক আহমেদের গোলে ২-২ সমতায় ফেরে তারা।
৪১তম মিনিটে আশরাফুল ইসলামের পেনাল্টি কর্নার থেকে বাংলাদেশ ফের লিড নিলেও ৪৬তম মিনিটে হংকংয়ের কুলদীপ সিংয়ের ফিল্ড গোলে আবারও সমতা আসে। ৪৮তম মিনিটে আশরাফুলের আরেকটি পেনাল্টি কর্নার গোলে বাংলাদেশ ৪-৩ ব্যবধানে এগিয়ে যায়। কিন্তু একই মিনিটে হংকংয়ের আইইউ ফ্লেক্সি চি হিম পেনাল্টি স্ট্রোক থেকে গোল করে স্কোরলাইন ৪-৪ করে দেন।
রাকিবুল এই ভুলের জন্য নিজেদেরই দায়ী করে জানান, সহজ সহজ ভুলের কারণে তারা বারবার লিড ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন; তাছাড়া থাইল্যান্ডের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়াও এই পারফরম্যান্সের অন্যতম কারণ।
নির্ধারিত সময়ে সমতা থাকায় ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। আর সেখানেই ত্রাতা হয়ে জ্বলে ওঠেন বাংলাদেশের গোলরক্ষক ও সহ-অধিনায়ক বিপ্লব কুজুর। প্রথম এবং পঞ্চম শট বাদে টানা তিনটি দুর্দান্ত সেভ করে হংকংকে আটকে দেন তিনি। এরপর অধিনায়ক ফজলে রাব্বি দলের হয়ে শেষ শটটি থেকে গোল আদায় করে নিলে ৩-২ ব্যবধানের রোমাঞ্চকর জয় নিশ্চিত হয়।
টাইব্রেকারে নিজের প্রথম শটটি মিস করা নিয়ে রাকিবুল জানান, গোলরক্ষককে বোকা বানালেও শুকনো পিচের কারণে বলটি বাইরে চলে যায়; প্রথম শটে গোল পেলে জয়টা হয়তো আরও সহজ হতে পারত। এশিয়ান গেমসের টিকিট নিশ্চিত হলেও দলের প্রস্তুতির অভাব নিয়ে আক্ষেপ ঝরেছে তার কণ্ঠে।
বাছাইপর্বে আসার আগে ওমান, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও শ্রীলঙ্কার মতো দলগুলো যেখানে পর্যাপ্ত অনুশীলন ও প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে, সেখানে বাংলাদেশ কেবল কিছু অনুশীলন সেশন করেই টুর্নামেন্টে নেমেছে, নিজেদের যাচাই করার কোনো সুযোগ পায়নি। এশিয়ান গেমসের মূল পর্বে ভালো করতে হলে যে পর্যাপ্ত ম্যাচ অনুশীলনের বিকল্প নেই, সেই বার্তাই দিয়ে রাখল বাংলাদেশ।