অলিভার কান : পরাস্ত টাইটানের শেষ দীর্ঘশ্বাস
জাপানের ইয়োকোহামা স্টেডিয়াম তখন ধীরে ধীরে ব্রাজিলের রঙে ভরে উঠছে। হলুদ জার্সির ঢেউ, উল্লাসে কাঁপতে থাকা গ্যালারি, পুরো ব্রাজিল দল পঞ্চম শিরোপার আনন্দে মাতোয়ারা, সাম্বা নাচের ছন্দে আর আতশবাজির ঝলকানিতে যখন আকাশ-বাতাস মুখরিত, তখন মাঠের এক প্রান্তে রচিত হচ্ছিল অন্য এক গল্প। উৎসবের সেই বিপুল কোলাহলের মাঝেও সবচেয়ে প্রকট হয়ে উঠেছিল এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। মাঠের এক প্রান্তে, নিজের গোলপোস্টে হেলান দিয়ে বসে আছেন অলিভার কান, জার্মানির 'দ্য টাইটান'। নীরব, স্থির, পরাজিত। যেন যুদ্ধশেষে ধুলো-মাখা বর্ম পরে দাঁড়িয়ে থাকা এক প্রহরী, যে শেষ পর্যন্ত নিজের দুর্গ বাঁচাতে পারেনি। সেই একাকী অবয়বেই ধরা ছিল ২০০২ বিশ্বকাপের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী সত্য: কখনও কখনও এক পুরো টুর্নামেন্টের বীরত্ব এসে থেমে যায় একটি ভুল, একটি মুহূর্ত, একটি দীর্ঘ নীরবতার কাছে।
কিছু কিছু ছবি সময়কে অতিক্রম করে প্রতীকে পরিণত হয়। অলিভার কানের সেই হেলান দেওয়া শরীর তেমনই এক প্রতীক। সেটি শুধু একটি ফাইনাল হারার ছবি নয়; সেটি গোলরক্ষকের চিরন্তন নিঃসঙ্গতার ছবি। কারণ ফুটবলের মাঠে গোলরক্ষক সবসময়ই একা। অন্য দশজন যুদ্ধ করে একসঙ্গে, ভুল করে একসঙ্গে, ক্লান্ত হয় একসঙ্গে; কিন্তু গোলরক্ষকের ভাগ্যে নির্ধারিত থাকে এক অদ্ভুত নির্বাসন। তিনি সবার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকেন, অথচ সবচেয়ে বেশি সামনে। তিনি দলের ভরসা, অথচ ভুল করলে তিনিই একমাত্র দায়ী। যে দূরত্বে তিনি দাঁড়ান, তা কেবল মাঠের নয়, ভাগ্যেরও দূরত্ব।
অলিভার কান এই নিয়তির জন্যই যেন জন্মেছিলেন। তার চোখে ছিল এক ধরনের বন্য উন্মত্ততা, যেন ভিতরে বন্দী কোনো প্রাচীন জন্তুর গর্জন। তিনি স্রেফ বল ঠেকাতেন না; তিনি বলের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়তেন এমনভাবে, যেন শত্রুর গলা চেপে ধরতে যাচ্ছেন। তার মুখে কোমলতা ছিল না, ছিল না অনুকম্পা; ছিল একধরনের নির্মম সততা। তিনি নিজের ভুল ক্ষমা করতেন না, সতীর্থদের শৈথিল্য মেনে নিতেন না, প্রতিপক্ষের সাহসকে বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা না জানিয়েই তা ভেঙে দিতে চাইতেন। গোলবারের নিচে দাঁড়িয়ে তিনি ছিলেন যেন লৌহবর্ম পরা কোনো মধ্যযুগীয় প্রহরী। শীতল, সতর্ক, ক্রুদ্ধ, অবিচল।
সেই বিষাদঘন মুহূর্তের পেছনের গল্পটি বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে পুরো টুর্নামেন্টের দিকে। ২০০২ বিশ্বকাপে জার্মানি কোনোভাবেই ফেভারিট দল ছিল না। বাছাইপর্বে ইংল্যান্ডের কাছে ৫-১ গোলের সেই শোচনীয় পরাজয়ের পর জার্মানদের নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী ছিলেন না খোদ জার্মানরাই। কিন্তু তাদের একটি অব্যর্থ ব্রহ্মাস্ত্র ছিল, যার নাম অলিভার কান। বায়ার্ন মিউনিখের এই গোলরক্ষকের শুধু রিফ্লেক্সই অবিশ্বাস্য ছিল না; তার চোখের সেই ভয়ংকর আগ্রাসন, সিংহের কেশরের মতো সোনালী চুল আর হুংকারে প্রতিপক্ষের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়দের পা রীতিমতো কেঁপে উঠত। গ্রিফন পাখির মতো তিনি যেন একাই পাহারা দিচ্ছিলেন জার্মানির গোলপোস্ট।
গ্রুপ পর্ব থেকে শুরু করে সেমিফাইনাল পর্যন্ত কান যেন রূপ নিয়েছিলেন এক অতিমানবে। প্যারাগুয়ে, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া, প্রতিটি দলের ভয়ংকর সব আক্রমণ আছড়ে পড়েছে কানের বিশ্বস্ত গ্লাভসে। ফাইনালে ওঠার আগ পর্যন্ত পুরো টুর্নামেন্টে তিনি গোল হজম করেছিলেন মাত্র একটি! দলের নড়বড়ে ডিফেন্সের সমস্ত দুর্বলতা কান যেন তার ওই বিশাল শরীর আর অদম্য সাহসিকতা দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। গ্রিক পুরাণের আটলাসের মতো পুরো জার্মান দলকে তিনি প্রায় একাই কাঁধে বয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন বিশ্বকাপের মহারণে।
ফাইনালের মঞ্চ প্রস্তুত হলো এক মহাকাব্যিক দ্বৈরথের জন্য। একদিকে রোনালদো, রিভালদো এবং রোনালদিনহোকে নিয়ে গড়া ব্রাজিলের ভয়ংকর 'থ্রি আর' আক্রমণভাগ, অন্যদিকে জার্মানি এসেছিল লৌহের শৃঙ্খলা নিয়ে, তপ্ত সংযম নিয়ে, এবং সবচেয়ে বড় কথা অলিভার কানকে নিয়ে। কিন্তু ফাইনালের আগে জার্মানির ওপর নেমে এল এক গুরুত্বপূর্ণ অভাব: মাইকেল বালাক নেই, সেমিফাইনালে কার্ড দেখে তিনি নিষিদ্ধ। জার্মানির মাঝমাঠ যেন হঠাৎ তার স্পন্দন হারাল। ফলে সবকিছু আরও বেশি এসে জমল কানের দু'হাতে।
খেলা শুরু হলো। ব্রাজিল বল নিয়ে ওঠে, জায়গা খুঁজে, পাসে পাসে শ্বাসরোধ করে। জার্মানি দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিরোধ গড়ে। খেলার দৃশ্যপট যেন এমন: একদিকে সুর, অন্যদিকে শিলাস্তম্ভ। আর কানের মুখে তখন সেই চেনা কঠোরতা, যেন তিনি আজও কাউকে ছাড় দেবেন না।
প্রথমার্ধে তিনি সেভ করলেন, গর্জে উঠলেন, রক্ষণকে সাজালেন, ভাঙা লাইনগুলো জোড়া দিলেন। রোনালদোর তীক্ষ্ণ শট, ব্রাজিলের বক্স-অভিযান, সব কিছুর সামনে তিনি নিজেকে ছুঁড়ে দিলেন। মনে হচ্ছিল, যদি এই ফাইনাল কোনো অলৌকিকতায় গড়ায়, তবে তার উৎস হবে কানের অদম্যতা। তিনি যেন জার্মানির শেষ প্রদীপ, যে ঝড়ের মধ্যে দপদপ করে জ্বলছে।
কিন্তু ফুটবল এক নিষ্ঠুর কবি। সে কখনও পুরো কাব্যকে একটিমাত্র পঙ্ক্তিতে ভেঙে দেয়।
৬৭ মিনিটে সেই পঙ্ক্তি লেখা হলো। রিভালদো দূর থেকে শট নিলেন। সেটি এমন শট ছিল, যা অলিভার কান অগণিতবার ধরেছেন, গিলে ফেলেছেন, মুঠোয় চেপে রেখেছেন। তিনি এগোলেন, হাত মেললেন, বল থামাতে চাইলেন। কিন্তু নিয়তির লেখা যদি ওই মুহূর্তেই অপেক্ষা করে থাকে, তবে মানুষের অনুশীলিত পরিপূর্ণতাও কখনও ব্যর্থ হয়। বলটি তাঁর হাত থেকে ফসকে পড়ল। খুব বড় ভুল? পরিমাপে হয়তো না। কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনাল, সেই রাত, সেই প্রতিপক্ষ, সেই মুহূর্ত, সব মিলিয়ে এটি হয়ে উঠল ইতিহাসের ভারবাহী এক ভুল।
আর ঠিক সেখানে ছিলেন রোনালদো। যেন ভাগ্য তার জন্য দরজা খুলে রেখেছিল। তিনি ছুটে এলেন, রিবাউন্ডে পা ছোঁয়ালেন, বল জালে জড়িয়ে গেল।
১-০।
কিছুক্ষণ পর আবার আক্রমণ। আবার রোনালদো। আবার বল জালে।
স্কোরলাইন ২–০।
শেষ বাঁশি বাজল।
তারপর যা দেখা গেল, সেটিই এই কাহিনির চিরস্থায়ী কেন্দ্র। ব্রাজিলিয়ানরা উল্লাসে ছুটে বেড়াচ্ছে, হলুদ জার্সিতে আলো লেগে যেন সোনালি তরঙ্গ উঠছে; রোনালদো দুই হাত তুলে দাঁড়িয়ে, ১৯৯৮-এর অন্ধকারের ওপর ২০০২-এর সূর্য স্থাপন করছেন। আর অন্যদিকে, আলোর উৎসব থেকে সামান্য দূরে, নিজের রাজ্যের ভগ্নপ্রাচীরের পাশে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছেন অলিভার কান। গোলপোস্টে হেলান দিয়ে।
এই হেলান দেওয়ার মধ্যে কী ছিল? শুধু ক্লান্তি? না। শুধু অনুতাপ? তাও না। সেখানে ছিল একটি টুর্নামেন্টের সমস্ত চাপের অবসান, ছিল প্রায় একক প্রচেষ্টায় ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছে দেওয়ার পর নিজের হাতেই সেই স্বপ্নের কাচ ভেঙে ফেলার অসহ্য উপলব্ধি, ছিল গোলরক্ষকের চিরন্তন বিচার, যেখানে হাজার সেভের মাহাত্ম্য একটি ভুলের অভিঘাতে মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়। গোলপোস্টটি যেন তখন আর কাঠের দুটি দণ্ড নয়; তা হয়ে উঠেছিল তাঁর স্বীকারোক্তির দেয়াল, তাঁর পরাজয়ের একমাত্র সাক্ষী, তাঁর নীরব শোকের ভরসাস্থল।
সেই বিশ্বকাপে অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের স্বীকৃতিস্বরূপ কান প্রথম গোলরক্ষক হিসেবে জিতেছিলেন 'গোল্ডেন বল'। কিন্তু ওই সোনালী স্মারকও তাঁর গোলপোস্টে হেলান দেওয়া সেই বিষণ্ণ ছবিটির আবেদন ম্লান করতে পারেনি। কান সেদিন হারলেও, এক পরাস্ত টাইটানের সেই নিঃসঙ্গ বীরত্ব চিরকালের জন্য জয় করে নিয়েছিল ফুটবল বিশ্বের হৃদয়, প্রমাণ করে দিয়ে গিয়েছিল যে অতিমানবদেরও ভুল হয় এবং সাফল্যের একদম চূড়ান্ত সীমানায় দাঁড়িয়েও মানুষ কতটা অসহায় আর একা হতে পারে।