ঠিকানা হারিয়ে ফেলা এক অধিনায়ক
অ্যাপলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস একবার বলেছিলেন, কর্মক্ষেত্রে যারা সবচেয়ে বেশি অবদান রাখেন, তারাই শেষ পর্যন্ত সেরা ম্যানেজার হয়ে ওঠেন।
মাঠে ক্রিকেট দলকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অধিনায়ক নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলগুলো সাধারণত এই একই যুক্তি মেনে চলে। দলের সেরা পারফর্মারকে বা অন্তত এমন কাউকে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়, যার দলে থাকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু একজন অধিনায়কের জন্য বিপদ তখনই শুরু হয়, যখন তার নিজের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স প্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ হয় অথবা তার দল ধারাবাহিকভাবে খারাপ করতে থাকে।
বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় নয় মাস পর মেহেদী হাসান মিরাজ এখন এই দুটি সংকটেরই মুখোমুখি।
বেশ কিছুদিন ধরেই ওয়ানডেতে বাংলাদেশ দলের পারফরম্যান্স ওঠানামা করছে। ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে চলমান সিরিজেও সেই একই চিত্র দেখা গেছে। প্রথম ওয়ানডেতে সফরকারীদের স্রেফ উড়িয়ে দিলেও পরের ম্যাচেই ধরাশায়ী হতে হয়েছে স্বাগতিকদের।
দুই ম্যাচেই বল হাতে উজ্জ্বল ছিলেন মিরাজ। মোট ৫ উইকেট শিকারের পাশাপাশি ওভারপ্রতি রান দিয়েছেন মাত্র তিনের আশেপাশে। বোলার হিসেবে এমন পারফরম্যান্স তার দলে থাকার যৌক্তিকতা তুলে ধরলেও সমস্যাটা অন্য জায়গায়। তার ভূমিকা কেবল বোলার হিসেবে নয়, বরং একজন অলরাউন্ডারের।
সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতিতে ওয়ানডে সংস্করণে মিরাজই এখন বাংলাদেশের প্রধান অলরাউন্ডার। তার কাছ থেকে প্রত্যাশা— বেশিরভাগ ম্যাচেই ১০ ওভার বোলিং করবেন এবং ব্যাটিং অর্ডারের ওপরের দিকে (শীর্ষ সাতের মধ্যে) নেমে রান করবেন।
২০২৫ সালের ১২ জুন ওয়ানডে অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর মিরাজ ১০টি ইনিংসে ব্যাটিং করেছেন চারটি ভিন্ন পজিশনে। এর মধ্যে পাঁচবার পাঁচ নম্বরে, তিনবার ছয় নম্বরে এবং একবার করে সাত ও নয় নম্বরে।
অধিনায়ক হওয়ার আগেও মিরাজকে মিডল অর্ডারে সুযোগ দেওয়া হচ্ছিল। ক্যারিয়ারের প্রথম ছয় বছর লোয়ার অর্ডারে খেললেও ২০২৪ সাল থেকে টানা সাত ম্যাচে তিনি চার নম্বরে ব্যাটিং করেন। এমনকি গত বছরের আইসিসি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে তিন নম্বরেও নেমেছিলেন তিনি। চার নম্বরে তার ক্যারিয়ার গড় ৩৫-এর কাছাকাছি হলেও স্ট্রাইক রেট ৭০-এর নিচে, যা আধুনিক ওয়ানডে ক্রিকেটের মানদণ্ডে বেশ হতাশাজনক।
নেতৃত্ব পাওয়ার পর মিরাজ ব্যাটিং অর্ডারে নিজেকে কিছুটা নিচে নামিয়ে এনেছেন, কিন্তু তার ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। এই সময়ে তার গড় নেমে দাঁড়িয়েছে ১৯.৩৩-এ এবং স্ট্রাইক রেট রয়েছে ৭০-এর সামান্য ওপরে।
একে কেবল 'অফ ফর্ম' হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার উপায় নেই। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে এখন পর্যন্ত ছয় বা সাত নম্বরে ২১ বার ব্যাটিং করে তিনি করেছেন মাত্র ২৮১ রান।, যেখানে গড় ১৪.০৫ আর স্ট্রাইক রেট ৭০.৬। বাংলাদেশের ইতিহাসেই ১১ জন খেলোয়াড় এই পজিশনগুলোতে মিরাজের চেয়ে ভালো গড় ও স্ট্রাইক রেট নিয়ে আরও বেশি রান করেছেন।
গত শুক্রবার পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ওয়ানডেতে মিরাজ যখন সাত নম্বরে মাঠে নামেন, বাংলাদেশ তখন ৯৩ বলে লক্ষ্য থেকে ১৪৮ রান দূরে। ব্যর্থ হয়ে পাঁচ বলে মাত্র ১ রান করেন তিনি। ফাহিম আশরাফের বল আকাশে তুলে ধরা পড়েন ডিপ মিডউইকেটে। তার বিদায়ের মাত্র ছয় ওভারের মধ্যেই গুটিয়ে যায় বাংলাদেশ।
বিসিবির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, অধিনায়ক হিসেবে মিরাজের হাতে সময় আছে আর মাত্র তিন মাস। আজ রোববার মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ নির্ধারণী ম্যাচসহ সামনে আরও কিছু সুযোগ তিনি পাবেন নিজের ব্যাটিং পজিশন গুছিয়ে নিতে। অন্যথায় কেবল অধিনায়কত্বই নয়, বরং টি-টোয়েন্টি সংস্করণের মতো ওয়ানডে দল থেকেও জায়গা হারানোর শঙ্কায় পড়তে পারেন তিনি।