ফ্লাইট বিশৃঙ্খলা-বাড়তি ভাড়ায় পণ্ড প্রবাসীদের ঈদের স্বপ্ন
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ঢাকার অসংখ্য ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
ফলে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে দেশে ফেরার অপেক্ষায় থাকা অনেক বাংলাদেশির স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।
যদিও যাদের ভালো বেতনের চাকরি আছে বা দেশে জরুরি সমস্যা আছে, কেবল তারা বিকল্প পথে বেশি টাকা খরচ করে দেশে ফিরছেন। কিন্তু উপসাগরীয় অঞ্চলে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আতঙ্কে থাকা বেশিরভাগ প্রবাসী দেশে ফেরার কথা ভাবতে পারছেন না।
বাহরাইনের রাজধানী মানামায় বসবাসকারী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ ইমন জানান, তিনি দেশের ফেরার জন্য ১৬ মার্চের জন্য গালফ এয়ারের একটি ফ্লাইটের টিকিট কিনেছিলেন। কিন্তু এখন মানামা থেকে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে কোনো ফ্লাইট ছাড়ছে না। তাই বাধ্য হয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা বাতিল করেছেন।
গতকাল ফোনে দ্য ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, অনেকে বাহরাইন থেকে সৌদি আরবের রিয়াদ হয়ে বিকল্প পথে দেশে ফিরছেন, কিন্তু সেই টিকিটের দাম অত্যন্ত বেশি।
তার ভাষ্য, ‘মানামা থেকে ঢাকা যাওয়া–আসার ভাড়া সাধারণত ২৫০ বাহরাইনি দিনার (প্রায় ৮০ হাজার টাকা)। কিন্তু রিয়াদ হয়ে ঢাকায় একমুখী টিকিটের দামই এখন ৩০০ বাহরাইনি দিনার (প্রায় ৯৭ হাজার টাকা)।’
ইমন আরও জানান, যুদ্ধের প্রভাবে তার পোশাক ও বিমান টিকিট ব্যবসার বিক্রি অনেক কমে গেছে।
‘এই মুহূর্তে দেশে গিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদ করার কথা ভাবছি না। আমি এখন গালফ এয়ার থেকে টিকিটের টাকা ফেরত পাওয়ার চেষ্টা করছি,’ বলেন তিনি।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালায়। পরে ইরান পাল্টা জবাব হিসেবে সৌদি আরব, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান ও লেবাননে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিগুলোতে হামলা চালাচ্ছে।
ফলে নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে এসব দেশ তাদের আকাশসীমা আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে। এতে পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক ফ্লাইট বাতিল হয়েছে।
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ১৩ মার্চ পর্যন্ত সবচেয়ে প্রবাসীর চাপ থাকা মধ্যপ্রাচ্যের রুটে নির্ধারিত ৮৯৫টি ফ্লাইটের মধ্যে প্রায় ৪৪৭টি বাতিল হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্যবস্তুতে ইরানের হামলায় উপসাগরীয় দেশগুলোতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জন নিহত এবং ২০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে অন্তত চারজন বাংলাদেশি এবং আহতদের মধ্যে আটজন।
মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন এবং তারা দেশে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠান।
বাংলাদেশ সরকার জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রথম অগ্রাধিকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে ঢাকায় অবস্থানরত উপসাগরীয় দেশগুলোর রাষ্ট্রদূত এবং ওই অঞ্চলে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে, যেন বাংলাদেশি প্রবাসীদের সহায়তা করা যায়।
এদিকে অনেক প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ হয়তো ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গেছে, আর কারও কারও চাকরিও আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটির কাছাকাছি অনেক হোটেল ও শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন হামলার আশঙ্কা রয়েছে। যদিও অনেক হামলা প্রতিহত করা হচ্ছে, তবে ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোনের ধ্বংসাবশেষ বেসামরিক এলাকায় পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান আবারও করোনা মহামারির সময়ের মতো বাসা থেকে কাজ করার ব্যবস্থা চালু করেছে।
বাহরাইনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত রাইস হাসান সারওয়ার জানান, হামলার কারণ মানুষ আতঙ্কে আছে। তবে হামলার আগেভাগেই কর্তৃপক্ষ সতর্কবার্তা দেয়, যেন সবাই নিরাপদ স্থানে থাকতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য একটি চার্টার ফ্লাইটের পরিকল্পনা করেছিল। তবে এর ভাড়া বেশি হবে এবং কমপক্ষে ২০০ জন যাত্রী লাগবে। আমরা প্রবাসীদের জানিয়েছি, কিন্তু এখনও পর্যাপ্ত সাড়া পাইনি।’
কাতারে বাংলাদেশ মিশনের এক কর্মকর্তা জানান, দোহা থেকে ঢাকায় কিছু ফ্লাইট চলছে, তবে সাধারণ সময়ের তুলনায় অনেক কম। সাধারণত প্রতিদিন চারটি ফ্লাইট থাকে, কিন্তু এখন তা অনেক কমে গেছে।
তিনি বলেন, ‘ঈদের সময় সাধারণত ঢাকা যাওয়ার যাত্রী অনেক বেশি থাকে, কিন্তু এবার পরিস্থিতি উল্টো।’
লেবাননের হিজবুল্লাহ ও শিয়া অধ্যুষিত এলাকা লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। সেখানে থাকা বাংলাদেশিদের জন্য এবার ঈদে দেশে ফেরার কোনো উপায় নেই।
বৈরুতের উপকণ্ঠে বসবাসকারী কয়েক হাজার বাংলাদেশিসহ অনেক মানুষ এসব হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
গতকাল লেবানন প্রবাসী শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল করিম বলেন, ‘এখন বাংলাদেশিরা দেশে যাওয়ার কথাই ভাবছেন না। তারা চাকরি ও যুদ্ধের প্রভাব নিয়ে চিন্তায় আছেন।’
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা দেবে বাংলাদেশ সরকার।
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্র ও খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। এখনই দেশে ফেরানোর কথা ভাবা হচ্ছে না। তবে প্রয়োজন হলে আন্তর্জাতিক সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে তা করা হবে।’