ইরান যুদ্ধে এখন পর্যন্ত যা কিছু হারাল যুক্তরাষ্ট্র
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সংঘাত যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে—এই যুদ্ধের মূল্য শুধু কৌশলগত নয়, মানবিক ও সামরিক দিক থেকেও বড় ক্ষতির।
এখন পর্যন্ত পাওয়া বিভিন্ন সামরিক ও কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত সাত সেনা নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছেন। পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রে ঘটেছে একাধিক সামরিক দুর্ঘটনা, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
সেনা হতাহত
ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে সাত মার্কিন সেনা নিহত এবং ১৪০ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে পেন্টাগন। আহত সেনাদের মধ্যে ১০৮ জন আবার দায়িত্বে ফিরে গেছেন।
তবে সংশ্লিষ্ট দুই সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫০ জন মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।
আহতদের মধ্যে অনেকেই ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার শিকার হয়েছেন, বিশেষ করে ইরাক ও উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে।
তবে তাদের আঘাতের ধরন কেমন এবং এর মধ্যে বিস্ফোরণজনিত মানসিক আঘাত (ট্রমাটিক ব্রেইন ইনজুরি) আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পারেনি রয়টার্স। বিস্ফোরণের সংস্পর্শে এলে এ ধরনের মানসিক আঘাতের ঘটনা সচরাচর ঘটে থাকে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলো এখন ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ইরান এবং তাদের সমর্থিত বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর হামলায় এসব ঘাঁটি বারবার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে।
আকাশে সামরিক দুর্ঘটনা
যুদ্ধের মাঝেই যুক্তরাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক উড়োজাহাজ দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। আকাশে জ্বালানি সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত একটি কেসি–১৩৫ রিফুয়েলিং বিমান ইরাকের আকাশসীমায় বিধ্বস্ত হয়েছে বলে জানা গেছে।
কেসি–১৩৫ বিমানগুলো মার্কিন বিমান বাহিনীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এগুলো যুদ্ধবিমানকে মাঝ আকাশে জ্বালানি সরবরাহ করে দীর্ঘ সময় আকাশে থাকার সুযোগ দেয়। ফলে এই ধরনের একটি বিমানের ক্ষতি যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ অভিযানে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
U.S. Central Command is aware of the loss of a U.S. KC-135 refueling aircraft. The incident occurred in friendly airspace during Operation Epic Fury, and rescue efforts are ongoing. Two aircraft were involved in the incident. One of the aircraft went down in western Iraq, and the…
— U.S. Central Command (@CENTCOM) March 12, 2026
এ ঘটনার কারণ নিয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, যান্ত্রিক ত্রুটি অথবা যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটতে পারে।
মিত্রের ভুলে যুদ্ধবিমান ভূপাতিত
যুদ্ধক্ষেত্রে সবচেয়ে বিব্রতকর ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে কুয়েতের আকাশে। সেখানে কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে ভুলবশত ছোড়া গোলায় যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ–১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
এই ধরনের ঘটনাকে সামরিক ভাষায় ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ বলা হয়—অর্থাৎ মিত্র বাহিনীর ভুলে নিজেদের বাহিনীর ক্ষতি হওয়া। আধুনিক যুদ্ধেও এমন ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে, তবে তা সাধারণত কৌশলগত সমন্বয়ের দুর্বলতাকে সামনে এনে দেয়।
এফ–১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম উন্নত মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান, যা আকাশ থেকে স্থল লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুল হামলার জন্য ব্যবহৃত হয়। ফলে এই বিমানের ক্ষতি শুধু আর্থিক নয়, সামরিক সক্ষমতার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
সামরিক ঘাঁটি ও আকাশ প্রতিরক্ষা অবকাঠামোর ক্ষতি
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের আগ্রাসনের জবাবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান।
নিউইয়র্ক টাইমস অন্তত ১৭টি ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন স্থাপনা ও অন্যান্য অবকাঠামো শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে কয়েকটিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে একাধিকবার হামলা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্মকর্তারা বলছেন, এই পাল্টা হামলার তীব্রতা দেখিয়ে দিয়েছে, যুদ্ধের জন্য ইরান ট্রাম্প প্রশাসনের অনেকের ধারণার চেয়ে বেশি প্রস্তুত ছিল।
সামরিক স্থাপনা
ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদেশগুলোর সামরিক স্থাপনাগুলোয় শত শত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের মিত্ররা এসবের বেশির ভাগই প্রতিহত করেছে। তবু অন্তত ১১টি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি বা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা এই অঞ্চলে থাকা এমন স্থাপনাগুলোর প্রায় অর্ধেক।
অপরদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ২৭টি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
এসব হামলা হয়েছে মূলত ইরাক, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি বা সামরিক স্থাপনা রয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা
মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ওপর আঘাত হেনেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামোগত ক্ষতির মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল হচ্ছে এটি।
ইরান পদ্ধতিগতভাবে রাডার ও যোগাযোগব্যবস্থা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে টার্মিনাল হাই অলটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স (থাড) ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ। এ ব্যবস্থায় রাডার ব্যবহার করে আকাশপথে আসা হুমকি শনাক্ত ও প্রতিহত করা হয়।
ইরান এমন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা করছে, যেগুলোকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা মনে করে। যেমন আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যা ওই অঞ্চলে অবস্থানরত মার্কিন সেনা ও সম্পদ রক্ষার জন্য স্থাপন করা হয়েছে।
কৌশলগত চাপ
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর কৌশলগত চাপ বাড়ছে। একদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা, অন্যদিকে অঞ্চলজুড়ে মার্কিন ঘাঁটির বিস্তৃত উপস্থিতি—এই দুইয়ের সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রকে একাধিক ফ্রন্টে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে থাকা মার্কিন সামরিক উপস্থিতি এখন নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলেও মনে করছেন অনেকে। বিশেষ করে ইরাক, সিরিয়া ও উপসাগরীয় অঞ্চলের ঘাঁটিগুলো এখন সরাসরি সংঘাতের আওতায় চলে এসেছে।
যুদ্ধের মূল্য
যুদ্ধের শুরুতেই সামরিক শক্তির দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষয়ক্ষতির হিসাবও বাড়ছে। সেনা হতাহত, সামরিক উড়োজাহাজের ক্ষতি এবং মিত্রদের সঙ্গে সমন্বয়জনিত সমস্যাগুলো এই সংঘাতের বাস্তব চিত্রকে আরও জটিল করে তুলছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই যুদ্ধ শুধু সামরিক লড়াই নয়—এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
আর সেই প্রেক্ষাপটে এখন প্রশ্ন উঠছে—এই সংঘাতের মূল্য শেষ পর্যন্ত কতটা দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে।