‘আমার জীবন বদলাতে হলে, আগে নিজেকে বদলাতে হতো’
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের কঠিন শুরুর ধাপ পেরিয়ে এখন নিজেকে নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বাংলাদেশের ব্যাটার সোবহানা মোস্তারী। সাম্প্রতিক আইসিসি টুর্নামেন্টগুলোতে তার ধারাবাহিকতা ও আক্রমণাত্মক ব্যাটিং মানসিকতার স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা গেছে। নেপালে অনুষ্ঠিত আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে বাংলাদেশ অপরাজিত থেকে দাপুটে ভঙ্গিতে বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে। সেখানে সোবহানা মোস্তারী টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক হিসেবে শেষ করেন।
ডেইলি স্টার–এর আবদুল্লাহ আল মেহেদীর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তার ক্যারিয়ারের শুরুর সংগ্রাম, উন্নতির পেছনের কারণ এবং আরও অনেক বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। নিচে সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ তুলে ধরা হলো—
দ্য ডেইলি স্টার: ক্যারিয়ারের শুরুতে বড় ইনিংস না খেলতে পারা নিয়ে সমালোচনা ছিল, এমনকি দলে আপনার জায়গা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। মানসিকভাবে সময়টা কতটা কঠিন ছিল, আর কী আপনাকে এগিয়ে চলতে অনুপ্রাণিত করেছে?
সোবহানা মোস্তারী: আমি স্বীকার করি, আমার ক্যারিয়ারের শুরুটা আমার নিজের, আমার আশপাশের মানুষদের কিংবা ক্রিকেট বোর্ডের প্রত্যাশার মতো ছিল না। সময়টা ছিল খুবই কঠিন… তখন আমি বুঝতে পারি, আমার জীবন বদলাতে হলে, আগে নিজেকে বদলাতে হবে। সাফল্যগুলো খুব বড় না হলেও, বড় দলগুলোর বিপক্ষে খেলা আমাকে ধীরে ধীরে রান করার মানসিকতায় অভ্যস্ত করে তোলে।
ডেইলি স্টার: আপনার প্রথম ফিফটি করতে বেশ কয়েকটি ইনিংস লেগেছিল। এটা কি দক্ষতার ঘাটতি ছিল, নাকি আত্মবিশ্বাসের অভাব?
সোবহানা: আমি ২০১৮ সালে অভিষেক করি, তখন আমরা মূলত বেশি টি-টোয়েন্টি খেলতাম। যদি আমার প্রথম ২০টি ইনিংস দেখেন, আমি ছয় বা সাত নম্বরে ব্যাট করতাম। সঙ্গে সঙ্গে গিয়ে বড় শট খেলতে আমি অভ্যস্ত ছিলাম না। আমি সিদ্ধান্ত নিই, যদি ওপরের দিকে ব্যাটিং করি এবং বেশি বল খেলতে পারি, তাহলে নিজের খেলাটা বদলাতে পারব। ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কথা বলি, তারা রাজি হয়, আর ধীরে ধীরে রান আসতে শুরু করে। এমনকি এখনো আমার মনে হয়, ব্যাটিং অর্ডারে আমার নির্দিষ্ট কোনো স্থায়ী পজিশন নেই, আর ক্যারিয়ারের শুরুতে এভাবেই ১৫–২০টা ম্যাচ কেটে গিয়েছিল।
ডেইলি স্টার: বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে দলের পারফরম্যান্সকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
সোবহানা: ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে আগে ভালো উইকেটেও আমরা ১১০ রান পার করতে হিমশিম খেতাম। কিন্তু এবার নিয়মিতভাবেই আমরা ১৫০ প্লাস রান করেছি। এতে আমাদের বোলাররা মানসিকভাবে স্বস্তি পেয়েছে, মুক্তভাবে বল করতে পেরেছে… আর আমাদের ফিল্ডিং তো সবসময়ই ভালো। আসল চিন্তার জায়গাটা ছিল ব্যাটিং, আর সেখানে আমরা ভালো করতে পেরেছি।
ডেইলি স্টার: আপনার কোচেরা আপনাকে দলের সবচেয়ে বেশি উন্নতি করা ব্যাটার হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
সোবহানা: আমি ম্যানেজমেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞ, বিশেষ করে আমার অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি আপুর প্রতি। আমাকে নিয়ে অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে হয়েছে তাকে, কিন্তু তিনি কখনো নেতিবাচক কিছু বলেননি। আমার ব্যাটিং কোচ নাসিরউদ্দিন ফারুক সবসময় বলতেন, নেটে আমার ব্যাটিং ছিল টপ ক্লাস, শুধু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের গতি ও মানসিকতায় মানিয়ে নেওয়াটাই বাকি ছিল। আজ আমি যেখানে আছি, সেখানে পৌঁছাতে তার বড় অবদান আছে। আমি কৃতজ্ঞ যে তারা কখনো আমাকে হতাশ করেননি। অনেক সময় দলে বাদ পড়াটাও ভালো, কারণ তখন বুঝতে পারি, আসলে কোন জায়গায় মনোযোগ দেওয়া দরকার।
ডেইলি স্টার: সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আপনার ধারাবাহিকতার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলো কী বলে মনে করেন?
সোবহানা: ফিটনেস অবশ্যই একটা কারণ, তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য এসেছে আন্তর্জাতিক মানের তীব্রতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে। ৩৫–৪০ রান পার করার পর নিজের মেজাজ ও মনোযোগ ধরে রাখার ওপর আমি কাজ করেছি। ঘরোয়া ক্রিকেটে আমরা সহজেই রান করি, কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ৩০–৪০ করার পর কীভাবে ইনিংসটা এগিয়ে নিয়ে যেতে হয়, সেটা বুঝতে আমার সমস্যা হতো, কখনো ক্লান্তি, কখনো ভুল সিদ্ধান্তের কারণে। তাই ৩৫–৪০ পেরোনোর পর ধৈর্য, মনোযোগ আর মানসিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার অনুশীলন করেছি।
আগে যখন আমাকে সঙ্গে সঙ্গে বড় শট মারতে হতো, তখন আমার ফিটনেস সেই পর্যায়ে ছিল না, যেসব শট ৬০ গজ গিয়ে ক্যাচ হতো, এখন সেগুলো ৮০ গজ গিয়ে ছক্কায় পরিণত হচ্ছে। আমাদের ফিজিও আমাকে বলেছিলেন, ফিটনেসে কাজ করলে এই শটগুলো একসময় বাউন্ডারি পেরোবে। আমি ফিটনেস উন্নত করার দিকেই মনোযোগ দিই, আর এখন আল্লাহর রহমতে আমার প্রায় ৮০ শতাংশ শটই ঠিকভাবে কানেক্ট করছে।
সর্বশেষ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বড় দলের বিপক্ষে ধৈর্য ধরে ব্যাটিং করার অভ্যাস আমাকে ইনিংস গুছিয়ে খেলতে আত্মবিশ্বাস দিয়েছে। আমি একবার রোহিত শর্মাকে নিয়ে একটি লেখা পড়েছিলাম, তার ক্যারিয়ারও কঠিনভাবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি কিংবদন্তি হয়েছেন, বিশ্বকাপ জিতেছেন। আমি চাই, আমার ক্যারিয়ারও তার মতো সুন্দরভাবে শেষ হোক।
ডেইলি স্টার: বছরের পর বছর আপনার ব্যাটিং অনুপ্রেরণা কারা?
সোবহানা: আমি দক্ষিণ আফ্রিকার অধিনায়ক লরা উলভার্ডটকে অনুসরণ করি। শৈশবের আইডল হরমনপ্রীত কৌর, কারণ তার লং-হ্যান্ডেল ব্যাটিং স্টাইলটা আমার খুব পছন্দ, যেটা আমিও ব্যবহার করি। ছোট বয়সে তামিম ইকবালকেও খুব পছন্দ করতাম। আমার বয়স যখন নয়, তখন বাবা আমাকে তামিম ভাই যে ব্যাট (সিএ) ব্যবহার করতেন, সেটা না কিনে এসএস ব্যাট কিনে দিয়েছিলেন। আমি তখন টানা এক সপ্তাহ কান্না করেছিলাম। এক সপ্তাহ পর বাবা আবার আমাকে সিএ ব্যাট কিনে দেন।
ডেইলি স্টার: শেষ প্রশ্ন, বাংলাদেশ পুরুষ দলের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে খেলা না হওয়া নিয়ে আপনার অনুভূতি কী?
সোবহানা: আমি আশাবাদী ছিলাম, তারা যেতে পারবে। ছোটবেলায় আমি যখন অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে গিয়েছিলাম, সেটাই ছিল আমার জীবনের সেরা সময়গুলোর একটি। প্রতিটি ক্রিকেটারের স্বপ্ন থাকে বিশ্বকাপে খেলার। তাই বিশ্বকাপ মিস করা খুব কষ্টের, খুব কঠিন বাস্তবতা। কিন্তু বাস্তবতাকেই মেনে নিতে হয়।