রাজস্ব বৃদ্ধি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় তামাকপণ্যের ওপর কার্যকর করারোপ জরুরি
বাংলাদেশ আজ এক জটিল জনস্বাস্থ্য সংকটের মুখোমুখি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২২ সালের প্রতিবেদন বলছে, হৃদরোগ, ক্যানসার, ডায়াবেটিস ও শ্বাসকষ্টসহ অসংক্রামক রোগ দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশের জন্য দায়ী। এই সংকটের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি তামাক ব্যবহার।
অথচ বাস্তবতা হলো, তামাকপণ্য এখনো বাজারে তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য ও সস্তা। আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নের প্রাক্কালে তাই তামাক কর ও মূল্য কাঠামোর সংস্কার জরুরি।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম উচ্চ তামাক ব্যবহারকারী দেশ। গ্লোবাল অ্যাডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) ২০১৭ অনুযায়ী, দেশে তামাক ব্যবহারের হার ৩৫ দশমিক ৩ শতাংশ—যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ।
টোব্যাকো এটলাস ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে মারা যান। অর্থনৈতিক ক্ষতিও কম নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে তামাকজনিত স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৮৭ হাজার কোটি টাকা।
বিপরীতে রাজস্ব আয় মাত্র ৪১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ রাষ্ট্র যা আয় করছে, তার দ্বিগুণের বেশি ক্ষতি বহন করছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, তামাকপণ্যের ব্যবহার এত বেশি কেন?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে বিদ্যমান কর কাঠামোর মধ্যেই। বাংলাদেশে তামাকপণ্যে মূলত অ্যাড ভ্যালোরেম কর আরোপ করা হয়। অর্থাৎ পণ্যের দামের ওপর শতাংশ হিসেবে কর নির্ধারণ হয়। ফলে সস্তা পণ্যে কর কম, দামি পণ্যে কর বেশি। এর সঙ্গে সিগারেটের চারটি মূল্যস্তর—নিম্ন, মধ্যম, উচ্চ ও প্রিমিয়াম—যুক্ত হয়ে পুরো ব্যবস্থাকে জটিল করে তুলেছে।
এই বহুমাত্রিক কাঠামো শুধু রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করে না, বরং ভোক্তাদের জন্য একটি সহজ বিকল্প তৈরি করে। দাম বাড়লেই ধূমপায়ীরা ধূমপান ছাড়েন না, বরং সস্তা স্তরে নেমে যান। ফলে মূলত ব্যবহার কমানোর উদ্দেশ্যে যেখানে কর বাড়ানো হচ্ছে, সেটা আর অর্জিত হয় না।
প্রশ্ন জাগে, এই কাঠামো শেষ পর্যন্ত কাদের স্বার্থ রক্ষা করছে?
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত তামাক কর সংস্কার সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় একটি উদ্যোগ। তামাকবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রস্তাব হলো, সিগারেটের চারটি স্তর কমিয়ে তিনটিতে আনা এবং নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে প্রতি ১০ শলাকার দাম ১০০ টাকা নির্ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি উচ্চ স্তরের দাম ১৫০ টাকা এবং প্রিমিয়াম স্তরের দাম ২০০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। এর সঙ্গে প্রতি প্যাকেটে ৪ টাকা সুনির্দিষ্ট কর আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিগত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে পরিবর্তনের গুরুত্ব স্পষ্ট। আগে নিম্ন স্তরে ৬০ টাকা, মধ্যমে ৮০ টাকা, উচ্চে ১৪০ টাকা ও প্রিমিয়ামে ১৮৫ টাকা ছিল। নতুন প্রস্তাবে নিম্ন ও মধ্যম স্তর একীভূত করে সরাসরি ১০০ টাকায় উন্নীত করার উদ্যোগ সস্তা সিগারেটের সহজলভ্যতা কমাতে কার্যকর হতে পারে। একইভাবে উচ্চ ও প্রিমিয়াম স্তরে মূল্য বৃদ্ধি কাঠামোকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করে।
এই সংস্কারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সুনির্দিষ্ট কর সংযোজন, যা কেবল দামের ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কমাতে সহায়তা করবে। এতে রাজস্ব আদায় বাড়বে এবং কর কাঠামো আরও পূর্বানুমানযোগ্য হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা বলছে, তামাকপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি তরুণদের ধূমপান প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
গ্লোবাল ইয়ুথ টোব্যাকো সার্ভের তথ্য বিশ্লেষণ করে নিকাজ ও চালুপকা (২০১৪) দেখিয়েছেন, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সিগারেটের দাম বাড়লে তরুণদের ধূমপান উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। একইভাবে কসটোভা ও তার সহকর্মীদের (২০১১) গবেষণায় দেখা গেছে, সিগারেটের দাম ১০ শতাংশ বাড়লে তরুণদের ব্যবহার প্রায় ২১ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
ফলে এই ধরনের মূল্য সমন্বয় ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তামাকের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারে।
কর কাঠামো সরলীকরণের আরেকটি সুফল প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি। বর্তমান বহুস্তর ব্যবস্থায় কর ফাঁকি ও অপব্যবহারের সুযোগ থাকে। তুলনামূলক সরল কাঠামো এই জটিলতা কমাতে পারে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এই সংস্কারের পক্ষে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে প্রায় ১০ শতাংশ হারে। কিন্তু, তামাকপণ্যের দাম সেই অনুপাতে না বাড়ায় এগুলো আরও সহজলভ্য হয়ে উঠেছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
অনেকে আশঙ্কা করেন, সিগারেটের দাম বাড়লে বিড়ির ব্যবহার বাড়বে। তবে বাস্তবতা ভিন্ন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিম্নস্তরের সিগারেটের বিক্রি বাড়লেও বিড়ির ব্যবহার কমেছে। তাই এমন ধারণা বাস্তবসম্মত নয়। তবে বিড়ি ও ধোঁয়াবিহীন তামাকপণ্যের ওপর কর বৃদ্ধিও সমানভাবে জরুরি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ক বৈশ্বিক কাঠামো অনুযায়ী, তামাকপণ্যে কর বৃদ্ধি ব্যবহার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর নীতিগত উপায়। সেই বিবেচনায়, আসন্ন বাজেটে কার্যকর তামাক কর সংস্কার জরুরি।
তামাক কর বৃদ্ধি ও মূল্য কাঠামো সরলীকরণ একসঙ্গে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ একটি দ্বৈত সুফল পেতে পারে—জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রাজস্ব বৃদ্ধি। আজকের সাহসী সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে কেমন বাংলাদেশ উপহার দিতে চাই।
আবু জাফর: সিনিয়র কমিউনিকেশনস অফিসার, তামাক নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউট