ধান-ভুট্টায় লোকসান, ভরসা সুপারি

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়

বালারহাটের সুপারির গলিতে এক বস্তা টাটকা সুপারি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার ফুলমতি গ্রামের কৃষক মোবারক হোসেন। বস্তার ভেতরে ছয় পোন (প্রতি পোনে ৮০টি) সুপারি রয়েছে। প্রতি পোন বিক্রি করছেন ৪০০ টাকা দরে।

মোবারক হোসেনের বসতভিটার আশপাশে রয়েছে ৬০টি সুপারিগাছ। প্রতিটি গাছে এবার সাত-আট পোন করে সুপারি ধরেছে।

মোবারক হোসেন বলেন, ‘এ বছর গাছের সুপারি হামাকগুলা (আমাদের) বাঁচে থুইছে। সুপারি না থাকলে হামারগুলার কষ্ট ছিল। এ্যালা (এখন) গাছ থাকি সুপারি পাড়ি আর বাজারোত বিক্রি করি সংসার চালবার নাইকছি (চালাচ্ছি)।’

তিনি জানান, এ বছর আলুতে তার বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। আবহাওয়া বৈরি থাকায় ধান ও ভুট্টা চাষ করেও উৎপাদন খরচ তুলতে পারেননি। এদিকে সার, বীজ ও ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় চাষবাসের খরচ আগের চেয়ে বেড়েছে। তাই ধান-ভুট্টায় লোকসানের পর সংসারের খরচ মেটাতে ভরসা হয়ে উঠেছে বসতভিটার এই সুপারিগাছগুলো।

একই হাটে সুপারি বিক্রি করতে আসা কৃষক ধনেশ্বর চন্দ্র বর্মণ (৬৫) বলেন, তার বসতভিটার চারপাশে ৭০টি সুপারিগাছ আছে। প্রতিটি গাছে এবার আট থেকে নয় পোন সুপারি ধরেছে।

তিনি বলেন, ‘আগের বছরগুলোতে সুপারি বেচা টাকা দিয়া ছওয়া-পোয়ার (ছেলেমেয়ে) পড়াশোনার খরচ চালেইছোং (চালিয়েছি)। কিন্তু এবার আলু আর ধান চাষ করি লোকসানোত আছোং। তাই সুপারির টাকা দিয়া সংসার চালবার নাইকছোং।’সুপারি

ধনেশ্বরের ভাষায়, সুপারি এখন তাদের জন্য আশীর্বাদ। একবার গাছ লাগালে ৩৫ থেকে ৪০ বছর পর্যন্ত সুপারি পাওয়া যায়। বছরে সামান্য জৈব সার ও পানি দিলেই চলে, বাড়তি কোনো পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না।

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার নাজিমখান গ্রামের কৃষক শামসুল আলম (৭০) সুপারিকে দেখছেন বাণিজ্যিক সম্ভাবনার ফসল হিসেবে। আট বিঘা জমির দুটি বাগানে তার প্রায় তিন হাজার সুপারিগাছ আছে। প্রতিবছর এখান থেকে ২৫-২৬ লাখ টাকার সুপারি বিক্রি করেন তিনি। বাগানের পরিচর্যায় বছরে তার খরচ হয় সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা।

শামসুল আলম বলেন, ‘আমাদের গ্রামের প্রায় সব কৃষকের বসতভিটার চারপাশে সুপারিগাছ আছে। সুপারি বিক্রি করে সবাই লাভবান হচ্ছেন। অন্য ফসলে লোকসান হলেও এ বছর কৃষকের সবচেয়ে বড় ভরসা হয়ে উঠেছে সুপারি।’

রংপুরের পীরগাছা উপজেলার চৌধুরানী গ্রামের কৃষক রণজিৎ রায় (৬০) বলেন, ‘এ বছর গাছের সুপারি না থাইকলে হামারগুলার বারোটা বাজি গেল হয়। সুপারি বিক্রির টাকা দিয়াই এ্যালা সংসার চলা নাইকছি।’

তিনি জানান, এ বছর প্রতি পোন সুপারি ৩০০ থেকে ৬০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। উৎপাদন খরচ খুব কম হওয়ায় সুপারি এখন কৃষকের নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে।

রংপুর নগরের সিটি মার্কেটের সুপারির আড়তদার আবদুল হাকিম জানান, প্রতিবছর এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত কৃষকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ সুপারি কেনা হয়। পরে তা মাটিতে সংরক্ষণ করে সারা বছর দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়।

তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবছর দুই কোটি টাকার বেশি সুপারির ব্যবসা করি। আমার মতো শতাধিক পাইকার এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কৃষক যেমন লাভবান হচ্ছেন, আমরাও লাভবান হচ্ছি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রংপুর অঞ্চলে প্রায় ৫৫ লাখ সুপারিগাছ রয়েছে। শুধু এই অঞ্চলেই দেড় হাজারের বেশি বাণিজ্যিক সুপারিবাগান গড়ে উঠেছে। এসব বাগান থেকে প্রতিবছর ৩০০ কোটির বেশি সুপারি উৎপাদিত হয়।

রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, একসময় সুপারি চাষ ছিল শৌখিন ব্যাপার। এখন তা লাভজনক বাণিজ্যিক কৃষিতে পরিণত হয়েছে। উত্তরাঞ্চলের আবহাওয়া সুপারি চাষের উপযোগী।