পানিতে ডুবে নেত্রকোণায় ২ সপ্তাহে ৮ শিশুর মৃত্যু

নিজস্ব সংবাদদাতা, নেত্রকোণা

নেত্রকোণায় গত দুই সপ্তাহে পানিতে ডুবে অন্তত আট শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

গত ২৮ আগস্ট থেকে ১১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত জেলার কলমাকান্দা, মোহনগঞ্জ, পূর্বধলা ও দুর্গাপুর উপজেলায় পৃথক এসব দুর্ঘটনা ঘটে।

নিহতদের মধ্যে ১৮ মাস বয়সী শিশু থেকে ১১ বছর বয়সী শিক্ষার্থীও রয়েছে।

সবশেষ আজ শুক্রবার কলমাকান্দা সদর ইউনিয়নের চিনাহালা এলাকায় পানিতে ডুবে সাড়ে চার বছর বয়সী শিশু আব্দুল্লাহর মৃত্যু হয়। সে ওই এলাকার কাজল মিয়ার ছেলে।

পরিবারের সদস্যদের অজান্তে খেলতে গিয়ে পানিতে পড়ে যায় আব্দুল্লাহ। পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এর এক দিন আগে, বৃহস্পতিবার কলমাকান্দার রংছাতি ইউনিয়নের পানেশ্বরপাড়া এলাকায় বাড়ির পাশের পানিতে পড়ে মারা যায় মিস্টার মিয়ার ১৮ মাস বয়সী শিশু সন্তান রহমান।

পরিবারের সদস্যরা তাকে খোঁজাখুঁজির পর পানিতে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

গত বুধবার মোহনগঞ্জের টেংগাপাড়া এলাকায় খালে পড়ে মারা যায় ১১ বছর বয়সী আলী। সে পানুর গ্রামের আশিকুলের ছেলে এবং পানুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। বাবা-মা ঢাকায় থাকায় সে দাদা আবু তাহেরের কাছে গ্রামেই থাকত।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, খালে মুখ ধুতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পানিতে পড়ে যায় সে। পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

এর আগে ৬ সেপ্টেম্বর কলমাকান্দা সদর ইউনিয়নের কয়রাখালী গ্রামে মাদ্রাসা থেকে বাড়ি ফেরার পথে বাঁশের সাঁকো পার হতে গিয়ে খালে পড়ে মারা যায় আরাফ (৭)। সে ওই গ্রামের হৃদয় মিয়ার ছেলে। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে কলমাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

৪ সেপ্টেম্বর মোহনগঞ্জ পৌরশহরের মাইলোড়া এলাকায় শিয়ালজানি খালে ডুবে মারা যায় ওই এলাকার বাসিন্দা প্রদীপ দের ৬ বছর বয়সী ছেলে পাথর দে। আগের দিন অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলতে বের হয়ে আর বাড়ি ফেরেনি সে। রাতে খোঁজাখুঁজির পর পরদিন সকালে বাড়ির কাছের খালে তার মরদেহ ভাসতে দেখা যায়।

৩১ আগস্ট পূর্বধলার খলিশাউড় ইউনিয়নের পূর্ব পাবই গ্রামে পুকুরে ডুবে মারা যায় প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী সৃজন সূত্রধর (৬)। সে ওই গ্রামের সুমন সূত্রধর ও মিতু রানী সূত্রধর দম্পতির ছোট ছেলে। বাড়ির পাশে ফুটবল খেলার একপর্যায়ে নিখোঁজ হয় সে। পরে পুকুরে একটি বলের পাশে তাকে ভাসমান অবস্থায় পাওয়া যায়।

একই দিন দুর্গাপুরের বাকলজোড়া ইউনিয়নের শিরামখীলা গ্রামে পুকুরে ডুবে মারা যায় নওশাদ (৪)। সে ওই গ্রামের মেহেদি হাসানের ছেলে। বাড়ির উঠানে অন্য শিশুদের সঙ্গে খেলার সময় সে নিখোঁজ হয়। খোঁজাখুঁজির পর বাড়ির পাশের পুকুর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করেন স্বজনরা।

এর আগে ২৮ আগস্ট পূর্বধলার গাংগের বেড়া এলাকায় কংশ নদীতে পড়ে নিখোঁজ হয় গ্রামের মোশারফ হোসেন ও রোজিনা বেগম দম্পতির ১৮ মাস বয়সী মেয়ে সাদিয়া আক্তার।

দাদির সঙ্গে নদীর তীরে যাওয়ার পর খেলতে খেলতে পরিবারের অজান্তে নদীতে পড়ে যায় শিশুটি। স্থানীয়দের পাশাপাশি ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলও উদ্ধার অভিযান চালায়। প্রায় ১৮ ঘণ্টা পর ঘটনাস্থল থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে জারিয়া পূর্বপাড়া এলাকায় নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এসব তথ্যগুলো নিশ্চিত করার পাশাপাশি উদ্বেগ জানিয়েছেন। তারা জানান, শুধু সচেতনতার অভাবে পানিতে ডুবে শিশুদের মৃত্যু হচ্ছে।

তারা আরও জানান, অন্যান্য সামাজিক সমস্যার পাশাপাশি গ্রাম-মহল্লার প্রতিটি মসজিদে কথা বলার সময়ও অভিভাবকদের এ বিষয়ে সচেতন করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, এসব দুর্ঘটনার বেশির ভাগই ঘটেছে পরিবারের সদস্যদের অগোচরে খেলতে গিয়ে পুকুর, খাল বা নদীর পানিতে শিশুদের পড়ে যাওয়ার কারণে। কয়েকটি ঘটনায় নিখোঁজ হওয়ার পর দীর্ঘ সময় খোঁজাখুঁজি করে শিশুদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

নেত্রকোণা সিভিল সার্জন ডা. মো. গোলাম মাওলা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে বাড়ির আশপাশের পুকুর, খাল ও জলাশয়ে পানি বেড়ে যাওয়ায় শিশুদের পানিতে পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে পরিবারের সদস্যদের শিশুদের প্রতি বাড়তি নজর রাখা প্রয়োজন। জেলায় পানিতে ডুবে শিশুমৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনক।’