চাকরির আশায় ঋণ করে রাশিয়া যাওয়া ময়মনসিংহের যুবক ড্রোন হামলায় নিহত
উচ্চ বেতনে চাকরি পাওয়ার আশায় গত মে মাসে রাশিয়া যান ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার যুবক মামুন মিয়াকে (২৫)। কিন্তু সেখানে ভাগ্য তার সহায় হয়নি। ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ পাওয়ার পরিবর্তে নিয়ে যাওয়া হয় রুশ সেনাক্যাম্পে।
ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ দিয়ে জুনে মামুনসহ প্রায় ৩০ জনকে পাঠানো হয় ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে। গত ২ সপ্তাহ আগে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় নিহত হন মামুন।
এ খবর মামুনের পরিবারকে জানান একইসঙ্গে রাশিয়া যাওয়া ঝিনাইদহের রাজন হোসেন। তিনি জানান, একই হামলায় তিনিও গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখান থেকে পালিয়ে দেশে ফেরেন।
নিহত মামুন নান্দাইল উপজেলার খারুয়া ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের খারুয়া গ্রামের মৃত আবুল কাশেমের ছেলে।
মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে মামুনের পরিবার দিশেহারা হয়ে পড়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলেন তিনি। সংসারে মা, স্ত্রী ও ছোট ২ সন্তানকে রেখে রাশিয়া গিয়েছিলেন তিনি।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর আশায় গত ৭ মে একটি এজেন্সির মাধ্যমে ইলেকট্রনিক শ্রমিক হিসেবে উচ্চ বেতনে চাকরির আশায় রাশিয়ার উদ্দেশে পাড়ি জমান মামুন। এজন্য এজেন্সির সঙ্গে তার সাড়ে ৮ লাখ টাকার চুক্তি হয়।
মামুনের সঙ্গে আরও প্রায় ৩০ জনের একটি দল ছিল বলে দাবি রাজনের।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঢাকার এজেন্সির মাধ্যমে ৭ মে একই ফ্লাইটে আমিসহ ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ার উদ্দশে দেশ ছাড়ি। আমাদের ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ৮ মে রাশিয়া পৌঁছাই।'
'কয়েকদিন পর আমাদের একটি সেনাক্যাম্পে নেওয়া হয় প্রশিক্ষণের জন্য। পরে ১২ জুন সবাইকে সম্মুখসারির যুদ্ধে পাঠানো হয়,' বলেন তিনি।
মামুনের পরিবারের অভিযোগ, রাশিয়ায় পৌঁছানোর ৪ দিন পর পাচারকারী চক্র মামুনসহ ওই দলের যুবকদের রুশ সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করে।
স্ত্রী মহিমা আক্তারের সঙ্গে গত ২৬ আগস্ট শেষ কথা হয় মামুনের। তখন মামুন জানিয়েছিলেন, তিনি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার পথ হেঁটে গিয়ে ওয়াই-ফাই সংযোগ করে কথা বলার সুযোগ করতে পেরেছিলেন।
মহিমা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মামুন ভয়-শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন। তার মাথার ওপর দিয়ে ড্রোন ঘুরছিল। আমাকে বলেছিলেন, "কখন কী ঘটে বলা যায় না।" সন্তানদের দেখে রাখার কথাও বলেছিলেন। এরপর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ হয়নি।’
মহিমা জানান, ঋণ করে বিদেশে যাওয়ার পর মামুন ভেবেছিলেন, ২-৩ বছর কাজ করে ঋণ শোধ করবেন এবং বাড়িতে একটি ঘর তুলবেন।
'চার বছরের ও ছয় মাসের দুই সন্তানকে নিয়ে এখন কীভাবে সংসার চালাব, বুঝতে পারছি না। তার মরদেহ কীভাবে দেশে আনব, সেটাও জানি না। সরকারের কাছে আমার স্বামীর মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানাই,' কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন মহিমা।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, মামুনকে রাশিয়ায় পাঠাতে তারা প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা ঋণ করেছিলেন। এর মধ্যে একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নেওয়া হয়। ধানের ওপর প্রায় ৪ লাখ টাকা দাদন নেওয়া হয়। বাকি টাকা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার এবং গরু বিক্রি করে জোগাড় করা হয়।
মামুনের মা রোকেয়া খাতুন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'সংসারের সচ্ছলতা ফেরানোর ৪ মাস আগে ধারদেনা করে সাড়ে ৮ লাখ জোগাড় করে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। এখনো টাকা পরিশোধ করতে পারিনি। সমিতির লোকজন টাকা নিতে এসে ঘুরে যাচ্ছে। আমার ছেলেটার এমন করুণ পরিণতি হবে, ভাবতেও পারিনি। দুই নাতিকে কীভাবে বড় করব, তাও বুঝতে পারছি না।'
মামুনের মরদেহ দ্রুত সরকারি উদ্যোগে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তার পরিবার।
রাজন জানান, ৩০ বাংলাদেশির জন্য দোভাষী হিসেবে কাজ করছিলেন রুশ ভাষা জানা এক কমান্ডার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সম্প্রতি ওই কমান্ডারের কাছ থেকে তিনি মামুনের মৃত্যুর খবর জানতে পারেন।
তিনি বলেন, 'কমান্ডার আমাকে জানিয়েছেন, প্রায় ২ সপ্তাহ আগে এক ড্রোন হামলায় মামুন মিয়া মারা গেছেন। এরপর আমি তার পরিবারকে বিষয়টি জানাই।'
মামুনের মৃত্যুর খবর কিংবা রাশিয়ায় তার পরিণতির বিষয়ে পরিবার ও রাজনের অভিযোগের বিষয়ে পুলিশ বা রাশিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো নিশ্চিত খবর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. জামাল উদ্দিন বাচ্চুর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, 'মামুন ছেলেটি দরিদ্র পরিবারের সন্তান। রাশিয়ায় গিয়ে ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছে বলে শুনেছি। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।'
নান্দাইল মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আজহারুল ইসলাম বলেন, 'আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মামুনের মৃত্যুর খবর দেখেছি। আমরা এ ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিচ্ছি।'
নান্দাইলের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফাতেমা জান্নাত বলেন, 'বিষয়টি আমরা স্থানীয়ভাবে জেনেছি এবং পরিবারকে লিখিত আবেদন দিতে বলেছি। আবেদন হাতে পেলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।'


