ইতিহাস আড্ডা ৮

‘সমাজে বুদ্ধির মুক্তির স্বপ্ন এখনো অধরা’

স্টার অনলাইন রিপোর্ট

'সমাজ-সংস্কৃতির যে প্রেক্ষাপটে এবং যেসব বিষয়ের বিরুদ্ধে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন হয়েছিল ১৯২৬ সালে, সেই প্রেক্ষাপট ও বিষয়বস্তুর তুলনায় আজকের পরিস্থিতি অনেক বেশি বিঘ্ন সৃষ্টিকারী। বলা যায়, বুদ্ধিজীবী শ্রেণির নৈতিক সততার অভাবে বর্তমান সমাজে বুদ্ধির মুক্তির স্বপ্ন এখনো অধরা।'

সোমবার দ্য ডেইলি স্টার সেন্টারে ইতিহাস আড্ডার অষ্টম পর্বে ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত মুসলিম সাহিত্য সমাজের শতবর্ষ উপলক্ষে 'বুদ্ধির মুক্তির মুক্তি কত দূর' শীর্ষক আলোচনা সভায় গবেষক ও অধ্যাপক ওয়াকিল আহমদ কথাগুলো বলেন।

সময়ের সংকট প্রসঙ্গে ওয়াকিল আহমদ বলেন, 'দেশ এমন একপর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে মানুষ তাদের বুদ্ধিবৃত্তির সঙ্গে মত না মিললে প্রতিষ্ঠানে আগুন দিচ্ছে। "দ্য ডেইলি স্টার" ও "প্রথম আলো"র কার্যালয় পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা আমাদের সেই চিত্র হাজির করে। এটি সত্যিই এক বিরাট মুক্তি, যার প্রকৃত অর্থ হলো আমরা কিছুই অর্জন করতে পারিনি।'

তিনি বলেন, 'আমরা উত্তপ্ত হলে পারদের মতো উপরে উঠি, মাত্র ৩৬ দিনে চূড়ায় পৌঁছে যাই। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই পারদ আবার নিচে নেমে আসে।'

তিনি আরও বলেন, 'সমাজের ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোঁড়ামির বিরুদ্ধে যুক্তিনির্ভর চিন্তাধারা কাজ করে, যা মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবুল হুসেন ও আবদুল ওদুদ করেছিল। আজ তাদের স্মরণে কিছুই নেই এই প্রতিষ্ঠানে। আমি এই সংগঠন ও সারথিদের নামে একটি হল বা গবেষণা সেন্টারের প্রস্তাব করছি।'

যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ইতিহাসবিদ, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীপেশ চক্রবর্তী কথা বলেন কাজী আবদুল ওদুদের নৈতিক অবস্থান সম্পর্কে।

তিনি বলেন, 'ওদুদ বিশ্বাস করতেন সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে শক্তিশালী যে একাকী ও সংখ্যালঘু হয়েও সত্যের পথে দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের কাজ বাঙালি মুসলমানের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের একটি সম্ভাবনা খুলে দিয়েছিল। বলা যায়, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সেই সার্বভৌমত্বের বিকাশেরই যেন একটি রেখা-টানা ইতিহাস।'

তিনি আরও বলেন, 'দেশভাগ না হলে বাঙালি মুসলমানের জীবনে এই রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব আসতো না বা অনেক দেরিতে আসতো। আমি দেশভাগের পরে জন্মেছি, কাজেই দেশভাগের বাস্তবতা মেনে নিয়েই আমার নিজের সব চিন্তা।'

অধ্যাপক দীপেশের মতে, 'বর্তমান সময়ে বুদ্ধিজীবীতার শক্তি ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে এবং আধুনিক সমাজেও ওই আন্দোলনের যুক্তিবাদ ও ইহজাগতিকতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। এর মাঝে "মুসলিম সাহিত্য সমাজ" ও "শিখা" পত্রিকার শতবর্ষ উপলক্ষে বাংলা একাডেমির যে আয়োজন, তাতেও রয়েছে দায়সারা ভাব। এমন করে সমাজ চলতে পারে না।'

_rs_7627.jpg
‘বুদ্ধির মুক্তির মুক্তি কত দূর’ শীর্ষক আলোচনা সভায় উন্মুক্ত পর্বে অংশ নেন লেখক বদিউদ্দিন নাজির। ছবি: স্টার

গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসান 'শিখা'র আন্দোলনের নেতাদের নৈতিক সততার কথা তুলে ধরেন, যা তার মতে বর্তমানে প্রায় অনুপস্থিত।

তিনি আন্দোলনের অন্যতম পথপ্রদর্শক আবুল হোসেনের উদাহরণ টেনে বলেন, 'তিনি একসময় নিয়োগের ক্ষেত্রে মুসলিম কোটার সুবিধাভোগী হওয়া সত্ত্বেও এর প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।'

তিনি আরও বলেন, 'আবুল হোসেন বিশ্বাস করতেন কোটা প্রকৃত মেধাকে অপমান করে। সামাজিক চাপে ঢাকার নবাব পরিবারের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পরদিনই তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। বর্তমানের রাজনীতিতে বুদ্ধিবৃত্তিক সততার এমন উদাহরণ আমরা খুঁজে পাব না।'

সাংবাদিক ও গবেষক কাজল রশীদ শাহীন আন্দোলনের সাফল্যের প্রধান অন্তরায় হিসেবে 'সামাজিক অভিজাততন্ত্র'কে চিহ্নিত করেন। 'বুদ্ধির মুক্তি' আন্দোলনের সারকথা ছিল, মানুষের মুক্তি ও চিন্তার স্বাধীনতা।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্যে দ্য ডেইলি স্টারের সাংবাদিক শামসুদ্দোজা সাজেন ১৯২০-এর দশকের সঙ্গে বাংলাদেশের ৫ আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতার তুলনা করেন।

উন্মুক্ত পর্বে অংশ নেন লেখক বদিউদ্দিন নাজির, গবেষক আতাউর রহমান, সংবিধান বিশেষজ্ঞ আরিফ খান, মুশফিকা জাহান সালমা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রেদোয়ান আহমেদ প্রমুখ। 

আয়োজনটির সঞ্চালনা করেন ইমরান মাহফুজ। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনকে নিবেদন করে গান পরিবেশন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এম ওয়াসি।