দক্ষিণ এশিয়াকে এখনো কীভাবে প্রভাবিত করছে মুঘল উত্তরাধিকার
মুঘল ঐতিহ্য কীভাবে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ, সংস্কৃতি ও রাজনীতিকে প্রভাবিত করেছে দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপচারিতায় সেই বিষয়টি তুলে ধরেছেন আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ, লেখক ও অধ্যাপক সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি। অধ্যাপক রেজাভি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস থেকে ২০১৩ সালে প্রকাশিত ‘ফতেহপুর সিক্রি রিভিজিটেড’ গ্রন্থের রচয়িতা।
দ্য ডেইলি স্টার: এখন ২০২৬ সাল। জহিরউদ্দিন মুহাম্মদ বাবর প্রথম পানিপথের যুদ্ধ জয়ের পর কেটে গেছে পাঁচ শতাব্দী। সম্প্রতি এক প্রবন্ধে আপনি উল্লেখ করেছেন, বাবর মাত্র ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে ইব্রাহিম লোদির বিশাল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছিলেন। সে সময় তিনি ফারগানা উপত্যকায় পৈতৃক আবাসভূমি থেকে উৎখাত হয়েছিলেন এবং দৌলত খান লোদির মতো ব্যক্তিদের আমন্ত্রণে উত্তর ভারতে আসেন। বাবর কীভাবে এমন জয় পেলেন এবং কী কী কারণে তিনি ভারতে মুঘল শাসনের ভিত্তি স্থাপন করতে পেরেছিলেন?
সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি: খুব কম বয়স থেকেই একাধিক শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছিলেন বাবর। প্রথমে ছিলেন তার নিজস্ব মঙ্গোল-তিমুরীয় আত্মীয়রা। তারা বাবরকে ফারগানা উপত্যকার আন্দিজান থেকে উৎখাত করতে চেয়েছিলেন। এরপর ছিলেন শায়বানি খানের নেতৃত্বাধীন উজবেকরা, যারা বাবরকে দুবার সমরকন্দ থেকে বিতাড়িত করেছিলেন। এরপর তিনি উজবেকদের পরাজিত করতে সাফাভি শাসক শাহ ইসমাইলের সঙ্গে জোট বাঁধেন।
বাবর তার প্রতিটি শত্রু ও সহযোগীর কাছ থেকেই শিক্ষা নিয়েছিলেন। উজবেকদের কাছে পরাজিত হয়ে তিনি হতাশ হননি। বরং তিনি নিজের ভুল ও প্রতিপক্ষের শ্রেষ্ঠত্বের কারণগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। পারসিকদের সহায়তায় সমরকন্দ পুনর্দখলের অভিজ্ঞতাও তাকে এমন অনেক কিছু শিখিয়েছিল, যেগুলো তিনি আগে জানতেন না। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে সেনা-বিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এরপর তিনি নিজের বাহিনীকে একই ধরনের পদ্ধতিতে সংগঠিত করতে শুরু করেন, যা ‘তুলুঘমা’ বিন্যাস নামে পরিচিত।
পরে তিনি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার ও উন্মুক্ত যুদ্ধক্ষেত্রে কামান পরিচালনার কৌশল রপ্ত করেন। ১৫১৯ সালে ভারতের সীমান্তের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় তিনি কামান ও বন্দুক এমনভাবে ব্যবহার করেছিলেন, যার সঙ্গে ভারতীয়রা তখনও পরিচিত ছিল না।
১৫২৬ ও ১৫২৭ সালে পানিপথ ও খানুয়ার যুদ্ধে বন্দুক, আরাবা বা কাঠের গাড়ি ও প্রতিরক্ষামূলক আবরণ দিয়ে সুরক্ষিত কামানের মতো নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার এবং নতুন যুদ্ধবিন্যাসে সৈন্যদের ছোট ছোট দলে ভাগ করায় তার সৈন্যরা বিশাল ভারতীয় বাহিনীকে ঘিরে ফেলত। এর সবকিছুই বাবরের বিজয়ে ভূমিকা রেখেছিল। ভারতীয় বাহিনী ছিল বিশৃঙ্খল, প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে এবং একক নেতৃত্বের অধীনে ছিল না।
আর হ্যাঁ, বাবর এই জন্য ভারতে আসার সিদ্ধান্ত নেননি যে সাফাভি ও উজবেকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পশ্চিমাঞ্চল তাকে দক্ষিণমুখী হওয়ার বিকল্প রাখেনি। ওই সময় ভারতে যে সম্ভাবনা ও সুযোগ ছিল, সেটিও বাবরকে আকৃষ্ট করেছিল। অন্তত দুইজন দূত তার জন্য এই সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছিলেন। প্রথমত, দৌলত খান লোদি। তিনি চেয়েছিলেন বাবর তার চাচার জন্য পাঞ্জাবের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করুন। দ্বিতীয়ত, রানা সাঙ্গার এক দূত। তিনি বাবরকে চিঠি লিখে লোদি শাসনকে নিয়ন্ত্রণে আনতে সহায়তা করার অনুরোধ জানান, যাতে তার ছোট রাজ্যটি রক্ষা পায়। এই দুজনের সমর্থন এবং লোদি শাসনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবক্ষয় বাবরকে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছিল।
ডেইলি স্টার: দিল্লি সালতানাত ও মুঘল সাম্রাজ্য উভয়ই উপমহাদেশের বাইরে থেকে আসা শাসকগোষ্ঠীর হাতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর মধ্যে মুঘলরা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি স্থায়ী ও স্থিতিশীল সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পেরেছিল। মামলুক, তুঘলক ও লোদিদের মতো পূর্ববর্তী সালতানাত শাসকদের তুলনায় মুঘল শাসনব্যবস্থার বিশেষত্ব কী ছিল? কোন প্রশাসনিক, রাজনৈতিক বা সামাজিক কারণে মুঘলরা দীর্ঘ সময় ধরে শাসন চালিয়ে যেতে পারল এবং বিস্তৃত ভূখণ্ডকে একীভূত করতে পেরেছিল?
সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি: কিছু ইতিহাসবিদের লেখার ভিত্তিতে সাধারণভাবে মনে করা হয়, বাবর কেবল বিজেতা ছিলেন, প্রশাসক নন। কিন্তু বাস্তব তথ্য তা বলে না। ভারতের পূর্ববর্তী তুর্কি শাসকদের আমলে ‘ইকতা’ভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল। এই পদ্ধতিতে একজন কর্মকর্তাকে একটি ভূখণ্ড দেওয়া হতো এবং তিনি সেখানকার আয় থেকেই নিজের বেতন নিতেন। বাবর এর পরিবর্তে নতুন ব্যবস্থা চালু করেন, যার নাম ছিল ‘ওয়াজহ’। এই পদ্ধতি ভূখণ্ড নয়, বরং রাজস্বকে নির্দেশ করত। যে ভূখণ্ড থেকে এই রাজস্ব আসত, সেটিকে বলা হতো ‘জাগির’ বা নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা। কিন্তু, কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন জমি থেকেই ওই রাজস্ব আসতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না।
এই ব্যবস্থা আকবরের শাসনের শুরুর বছরগুলো পর্যন্তও চালু ছিল। পরে আকবর দুটি নতুন প্রশাসনিক কাঠামো চালু করেন—‘মানসাব’ ও ‘জাগির’। মানসাব অর্থ ছিল পদমর্যাদা বা অবস্থান, আর জাগির বলতে সেই পদমর্যাদার ভিত্তিতে বরাদ্দ করা ভূখণ্ডকে বোঝাত। ইকতার মতোই জাগির ছিল হস্তান্তরযোগ্য। অন্যদিকে মানসাব দেওয়া হতো ব্যক্তির দক্ষতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে। ফলে একজন ব্যক্তি নিম্ন পদে নিয়োগ পেতেন এবং অভিজ্ঞতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে উচ্চতর মানসাবে উন্নীত হতেন। এটা অনেকটা আধুনিক পদোন্নতি ব্যবস্থার মতো। এখন যেমন আপনি যোগ্য হলে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ পান, এরপর সহযোগী অধ্যাপক ও শেষ পর্যন্ত অধ্যাপক হন। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে উচ্চতর পদে যাওয়ার সুযোগ হয়।
দ্বিতীয়ত, জন্ম-পরিচয় নয়, দক্ষতাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে জাতিগত, ধর্মীয় কিংবা বর্ণগত পার্থক্য গৌণ হয়ে যায়। সবাই সুযোগ পাওয়ার যোগ্য ছিল এবং কেউ জন্মগত কারণে বিশেষ সুবিধা পেতেন না। এটিই ছিল মুঘল প্রশাসনের অন্যতম সৌন্দর্য। এর মাধ্যমে বহুজাতিক ও গতিশীল শাসকশ্রেণি গড়ে উঠেছিল। যতদিন এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল, ততদিন মুঘল সাম্রাজ্যও শক্তিশালী ও স্থিতিশীল ছিল।
অবশ্য এর সীমাবদ্ধতাও ছিল। ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব এর পশ্চাৎমুখী বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন।
আমরা এমন এক সময়ের কথা বলছি, যখন ‘জাতি’ বা ‘জাতি-রাষ্ট্র’র ধারণা ছিল না। ফলে ‘বিদেশি’ বা ‘নাগরিক’ বলে আলাদা পরিচয়ও ছিল না। যে-ই কোনো ভূখণ্ডে বসবাস করে সেটিকে নিজের আবাসভূমি হিসেবে গ্রহণ করত, সে-ই ছিল ভারতীয়। ‘বিদেশি’ ধারণাটি আসে ইউরোপ থেকে একক ও একচেটিয়া জাতি-রাষ্ট্রের ধারণা বিস্তারের পর।
ডেইলি স্টার: মুঘল সাম্রাজ্য পশ্চিমে কাবুল ও কান্দাহার থেকে শুরু করে পূর্বে বাংলা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এটা কেবল সামরিক বিজয়ের মাধ্যমে নয়, বরং প্রশাসনিক সংহতি, রাজনৈতিক সমঝোতা ও কৌশলগত জোট, বিশেষ করে প্রভাবশালী রাজপুত পরিবারগুলোর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমেও অর্জিত হয়েছিল। বাংলার বারো ভূঁইয়া কিংবা পরবর্তীকালে শিবাজীর নেতৃত্বে শক্তিশালী মারাঠা আন্দোলনের মতো আঞ্চলিক প্রতিরোধের মুখে এসব সংহতির প্রক্রিয়াকে আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পারি?
সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি: আগেই বলেছি, ষোড়শ শতকে জাতি বা জাতিসত্তার কোনো ধারণা ছিল না। তবে অঞ্চল ও আঞ্চলিক পরিচয় অবশ্যই ছিল। দ্বিতীয়ত, তখন শাসনের বৈধতার ভিত্তি হিসেবে সর্বজনস্বীকৃত ছিল বিজয়। প্রতিরোধ ও পাল্টা প্রতিরোধের বিষয়টিও সামরিক সাফল্যের ওপর নির্ভর করত। শাসককে স্থানীয়ভাবে বসতি স্থাপন করতে হতো এবং স্থানীয়দের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে হতো। কাবুলের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাবরও স্থানীয় গোত্রগুলোর সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন, যাতে তাকে সবাই মেনে নেয়। ভারতে একই বিষয় ঘটেছিল। স্থানীয় অভিজাতদের মধ্যে মুঘলদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বৈবাহিক জোট।
আওরঙ্গজেব মুসলমান কিংবা বিদেশি ছিলেন বলে শিবাজী তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি। তিনি যুদ্ধ করেছিলেন তখন, যখন মনে করেছিলেন যে তার অঞ্চল হুমকির মুখে পড়েছে। বিজাপুর ও গোলকোন্ডাও শিবাজীর সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। দক্ষিণের এই তিনটি রাজ্যই উত্তর থেকে আসা আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল।
প্রকৃতপক্ষে, আকবরের ভূয়সী প্রশংসা করতেন শিবাজী। মনে রাখতে হবে, তিনি একসময় মুঘল প্রশাসনে মানসাবদার হিসেবেও যোগ দিয়েছিলেন। পরে যখন শিবাজী মনে করলেন যে তাকে প্রত্যাশিত মর্যাদা দেওয়া হয়নি এবং তার সঙ্গে যথাযথ আচরণ করা হয়নি, তখন তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। বিষয়গুলো ছিল ভিন্ন। স্থানীয় গোষ্ঠীগুলো যখন তাদের মর্যাদা ও ক্ষমতা কমে যাওয়ার আশঙ্কা করত, তখন প্রতিরোধ গড়ে তুলত। এগুলো ছিল রাজনৈতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার লড়াই, অন্য কিছু না।
ডেইলি স্টার: মুঘল সাম্রাজ্যকে প্রায়ই স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার জন্য স্মরণ করা হয়। ফতেহপুর সিক্রি ও শাহজাহানাবাদের মতো রাজধানী নগরী থেকে শুরু করে তাজমহলের মতো প্রতীকী স্থাপনা, সবই এর মধ্যে পড়ে। তবে মুঘল নগরায়ণ শুধু এসব জাঁকজমকপূর্ণ কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি উপমহাদেশজুড়ে প্রাদেশিক শহর, বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রগুলোকেও প্রভাবিত করেছিল। ব্রিটিশ শাসনামলে গড়ে ওঠা ঔপনিবেশিক শহরগুলোর তুলনায় মুঘল শহরগুলোর চরিত্র কীভাবে ভিন্ন ছিল এবং কৃষি, বাণিজ্য, প্রশাসন ও নগর-গ্রামীণ অর্থনীতির পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসব পার্থক্যের কী প্রভাব পড়েছিল?
সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি: আজকের শহরগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে এর প্রভাব কতটা ভিন্ন বা গুরুত্বপূর্ণ ছিল সে বিষয়ে আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারব না। তবে মুঘল ও ঔপনিবেশিক নগরায়ণ শহর, গ্রামাঞ্চল ও রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পূর্ণ ভিন্ন সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। আর এই পার্থক্য কৃষি, বাণিজ্য ও প্রশাসনের ওপর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল।
ফতেহপুর সিক্রি, আগ্রা ও শাহজাহানাবাদের মতো মুঘল শহরগুলো ছিল মূলত ‘ভোগনির্ভর নগরী’। এগুলো কৃষিনির্ভর রাজনৈতিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এসব শহর অর্থনৈতিক ভিত্তি পেয়েছিল জাগির-মানসাবভিত্তিক রাজস্ব-ব্যবস্থা থেকে, যা গ্রামাঞ্চলের উদ্বৃত্ত সম্পদ সংগ্রহ করে অভিজাত শ্রেণি, কারিগর ও সেবাদানকারী গোষ্ঠীর মধ্যে পুনর্বণ্টন করত। ফলে কৃষি ব্যবস্থা নমনীয় রাজস্ব-চাহিদা ও স্থানীয় মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। নগর বিকাশ কৃষিভিত্তিক সম্পর্ককে মৌলিকভাবে পরিবর্তন না করে বরং কারুশিল্প উৎপাদন ও বাজারমুখী বাগান-চাষকে উৎসাহিত করত।
মুঘল আমলে বাণিজ্য ছিল ব্যাপক ও সমন্বিত। কিন্তু, সেটা প্রধানত অভ্যন্তরীণ ছিল এবং বাজার, সরাইখানা ও বণিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। শহরগুলো রপ্তানি-নির্ভর কেন্দ্রের বদলে প্রাক-পুঁজিবাদী অর্থনৈতিক প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হিসেবে কাজ করত।
প্রশাসনিকভাবে মুঘল শহরগুলো স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ছিল না। সেগুলো ছিল সম্রাটের কর্তৃত্বের সম্প্রসারিত রূপ। কোতওয়াল, কাজি ও আমিলদের মধ্যে প্রশাসনিক দায়িত্ব ভাগ করা ছিল। রাজস্ব আদায় ও অভিজাতদের আবাসের সঙ্গে এটা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত ছিল।
বিপরীতে, কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজের মতো ঔপনিবেশিক শহরগুলো ছিল ‘উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী’ বন্দরনগরী। এগুলো বৈশ্বিক পুঁজিবাদী অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। এসব শহরের উত্থান কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণের দিকে ঠেলে দেয় এবং নীল, আফিম ও তুলার মতো অর্থকরী ফসলের উৎপাদন বাড়ায়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে খাদ্য-নির্ভর কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
একইসঙ্গে স্থায়ী বন্দোবস্ত ও রায়তওয়ারি ব্যবস্থার মতো কঠোর ভূমি রাজস্ব-ব্যবস্থা গ্রামীণ সামাজিক কাঠামো পরিবর্তন করে এবং কৃষকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। বাণিজ্য হয়ে ওঠে সমুদ্রভিত্তিক ও রপ্তানি-নির্ভর, যা ইউরোপীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এর ফলে ঐতিহ্যবাহী অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক ও কারুশিল্প শিল্পের অবনতি বা অধীনস্থতা দেখা দেয়।
প্রশাসনিকভাবে ঔপনিবেশিক শহরগুলোকে পৌরসভা, লিখিত আইন ও আমলাতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছিল। এসব শহর ভৌগোলিকভাবে বিভক্ত ছিল ‘হোয়াইট টাউন’, ‘ব্ল্যাক টাউন’ ও ‘সিভিল লাইনস’-এ। একইসঙ্গে গ্রামীণ অঞ্চল কেবল কাঁচামালের উৎস হিসেবে ব্যবহার করা হলো। ফলে এগুলো ক্রমশ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
ফলে যেখানে মুঘল নগরায়ণ পুনর্বণ্টনভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছিল এবং তুলনামূলকভাবে সমন্বিত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিকে টিকিয়ে রেখেছিল, সেখানে ঔপনিবেশিক নগরায়ণ ভারতকে একটি প্রান্তিক ও রপ্তানি-নির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত করে। এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে কৃষি সংকট, শিল্পহ্রাস ও কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের ওপর।
ডেইলি স্টার: ভারতীয় উপমহাদেশে একাধিক বৃহৎ সাম্রাজ্যের উত্থান ঘটেছে। এর মধ্যে মৌর্য, মুঘল ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ব্যাপ্তি ও ঐতিহাসিক প্রভাবের কারণে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। শাসনব্যবস্থা, রাষ্ট্রপরিচালনা ও রাজনৈতিক সংহতির ক্ষেত্রে এদের দৃষ্টিভঙ্গিকে কীভাবে তুলনা করবেন? অশোক ও আকবরের মতো শাসকদের প্রায়ই এই অঞ্চলের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসকদের মধ্যে গণ্য করা হয়। সেই বৃহত্তর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, পূর্ববর্তী মৌর্য মডেল এবং পরবর্তী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের তুলনায় মুঘল সাম্রাজ্যের অবস্থান কোথায়?
সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি: অশোক, আকবর ও ঔপনিবেশিক যুগের সাম্রাজ্যগুলোর সময়কাল পরস্পর থেকে এতটাই দূরবর্তী ও শতাব্দীর ব্যবধানে বিচ্ছিন্ন যে তাদের মধ্যে প্রকৃত অর্থে তুলনা করা কঠিন। বিশেষ করে মৌর্য ও মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে। তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন সময় ও ভিন্ন বাস্তবতার অংশ।
তবে এই কাল্পনিক প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার একটি উপায় হলো, এই তিনটি সাম্রাজ্যকে উপমহাদেশীয় শাসনব্যবস্থার তিনটি স্বতন্ত্র কিন্তু তুলনাযোগ্য রূপে দেখা। প্রতিটি সাম্রাজ্য রাষ্ট্রক্ষমতা, সমাজ ও অর্থনীতির মধ্যে ভিন্ন ধরনের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল। যদিও সাম্রাজ্যের ব্যাপ্তি ও রাজনৈতিক সংহতির আকাঙ্ক্ষার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ধারাবাহিকতাও ছিল।
(খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ থেকে দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত) মৌর্য সাম্রাজ্য, বিশেষত অশোকের শাসনামলে সম্ভবত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম বৃহৎ ও কেন্দ্রনির্ভর সাম্রাজ্য কাঠামোর প্রতিনিধিত্ব করে। এটি অত্যন্ত কেন্দ্রীভূত আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল। যার প্রতিফলন দেখা যায় অর্থশাস্ত্রের ঐতিহ্য ও অশোকের শিলালিপিতে। এই রাষ্ট্র রাজস্ব, কর্মকর্তাদের কার্যক্রম ও প্রাদেশিক প্রশাসনের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। একই সঙ্গে ‘ধর্ম’ বা ‘ধম্ম’র মাধ্যমে নৈতিক রাজত্বের ধারণা প্রচার করেছিল, যা বহুবিধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার একটি নৈতিক-রাজনৈতিক আদর্শ ছিল।
এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিহিত রয়েছে উপমহাদেশীয় রাজনৈতিক ঐক্যের পথপ্রদর্শক হিসেবে এবং এই ধারণা প্রতিষ্ঠায় যে, সার্বভৌম ক্ষমতা একদিকে বলপ্রয়োগমূলক হতে পারে, অন্যদিকে নৈতিক আদর্শ দ্বারাও পরিচালিত হতে পারে।
(ষোড়শ থেকে অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত) মুঘল সাম্রাজ্য ব্যাপ্তির দিক থেকে মৌর্য সাম্রাজ্যের তুলনীয় হলেও কাঠামোগতভাবে ভিন্ন ছিল, বিশেষ করে আকবরের সময়কাল। এটি মৌর্য রাষ্ট্রের মতো সমানভাবে কেন্দ্রীভূত ছিল না। এখানে মানসাবদারি-জাগিরদারি কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত এক জটিল স্তরভিত্তিক সার্বভৌমত্বের ব্যবস্থা ছিল। এটি ক্ষমতা ভাগাভাগি, দরকষাকষি ও পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। সেখানে তুরানি, ইরানি, ভারতীয় মুসলিম, রাজপুত ও পরবর্তীতে মারাঠা অভিজাতদের সমন্বয়ে গঠিত এক বহুজাতিক অভিজাত শ্রেণি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। ধম্মের মতো একক নৈতিক আদর্শ আরোপের বদলে আকবর ‘সুলহ-ই-কুল’ বা ‘সর্বজনীন শান্তি’র ধারণা প্রবর্তন করেন। এটা ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক নীতি। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ধর্মীয় ও আঞ্চলিক অভিজাতদের সাম্রাজ্যের প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়।
মুঘল রাষ্ট্র গ্রামীণ সমাজকে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেনি। বরং বিদ্যমান কৃষিভিত্তিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে, বিশেষত টোডরমলের রাজস্ব সংস্কারের মাধ্যমে একটি মানসম্মত রাজস্ব মূল্যায়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলে। এতে বৃহৎ পুনর্বণ্টনমূলক ব্যবস্থা টিকে থাকে। এর গুরুত্ব হলো, এটি প্রাক-আধুনিক যুগের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল, যা অর্থনৈতিকভাবে প্রাণবন্ত, সাংস্কৃতিকভাবে সৃজনশীল ও প্রশাসনিকভাবে নমনীয়। এর নগর ও কারুশিল্পভিত্তিক অর্থনীতি রাজদরবারের ভোগ-ব্যবস্থাকে আঞ্চলিক উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
বিপরীতে, ভারতে (অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতক পর্যন্ত) ব্রিটিশ সাম্রাজ্য মৌলিক বিচ্ছেদের সূচনা করে। মৌর্য ও মুঘল রাষ্ট্রের মতো উপমহাদেশের ভেতরে ভিত্তি গড়ে তোলা এবং এখানকার সমাজে বৈধতা অর্জনের চেষ্টা না করে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য বহিরাগত ঔপনিবেশিক কাঠামো গড়ে তোলে, যা মূলত বৈশ্বিক পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত ছিল। তাদের শাসনব্যবস্থা আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রীকরণ, আইনের সংহত রূপ, নজরদারি ও ‘আইনের শাসন’-এর ভাষ্যকে একত্রিত করেছিল। কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্পদ আহরণ ও ভারতীয় অর্থনীতিকে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের জন্য পুনর্গঠন করা। স্থায়ী বন্দোবস্ত ও রায়তওয়ারি ব্যবস্থার মতো ভূমি রাজস্বনীতি কৃষিভিত্তিক সম্পর্ককে মৌলিকভাবে পরিবর্তন করে। একইসঙ্গে ঔপনিবেশিক শহর, বন্দর ও রেলপথের মতো অবকাঠামো বাণিজ্যকে রপ্তানিমুখী বাজারের দিকে নিয়ে যায়।
প্রশাসনিকভাবে ব্রিটিশরা ব্যক্তিনিরপেক্ষ আমলাতন্ত্র এবং আদালত ও পৌরসভার মতো নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে। তবে এগুলো শাসনব্যবস্থাকে স্থানীয় সামাজিক সমঝোতা ও আলোচনার ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যা পূর্ববর্তী সাম্রাজ্যগুলোর বৈশিষ্ট্য ছিল। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব রাজনৈতিক সংহতি প্রতিষ্ঠার চেয়ে বেশি ছিল ভারতকে ঔপনিবেশিকভাবে প্রান্তিক অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোয় রূপান্তরিত করার মধ্যে। একইসঙ্গে অনিচ্ছাকৃতভাবে এটি আধুনিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ভিত্তিও তৈরি করে দেয়।
সেই তুলনায় মুঘল সাম্রাজ্য একটি মধ্যবর্তী হলেও স্বতন্ত্র অবস্থান দখল করে। মৌর্যদের মতো তারা কঠোর কেন্দ্রীকরণ করেনি। বরং আলোচনাভিত্তিক ও সমঝোতাপূর্ণ সার্বভৌমত্বের পরিণত রূপ গড়ে তুলেছিল। আবার ব্রিটিশদের মতো শোষণমূলক ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থাও ছিল না। বরং অভ্যন্তরীণভাবে এটি ছিল পুনর্বণ্টনভিত্তিক রাষ্ট্র, যা সাংস্কৃতিক সমন্বয় ও অর্থনৈতিক সংহতিকে উৎসাহিত করেছিল।
অশোক ও আকবরের মতো শাসকরা বিশেষভাবে স্মরণীয়। কারণ, তারা সাম্রাজ্যের মহত্ত্বের দুটি ভিন্ন আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করেন। একটি হলো নৈতিক সর্বজনীনতা এবং অপরটি রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি। অন্যদিকে, ব্রিটিশ শাসনব্যবস্থা প্রশাসনিকভাবে রূপান্তরমূলক হলেও উপমহাদেশের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতায় একই ধরনের সংহতিমূলক বৈধতা পায়নি।
ডেইলি স্টার: মুঘল, সাফাভি ও উসমানীয় সাম্রাজ্য প্রাক-আধুনিক বিশ্বের তিনটি সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল। এই সাম্রাজ্যগুলোর মধ্যে প্রধান মিলগুলো কী ছিল এবং রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় বা প্রশাসনিক দিক থেকে কোন বৈশিষ্ট্যগুলো তাদের একে অপরের থেকে আলাদা করেছিল?
সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি: প্রথমত, এদের সবাই জাতিগতভাবে তুর্কি, সাংস্কৃতিকভাবে পারসিক এবং ইতিহাসবিদ রিচার্ড ইটন যাকে ‘পারসিয়ানেট বিশ্ব’ বলে বর্ণনা করেছেন, তারই অংশ।
তবে এই তিন সাম্রাজ্যের মধ্যে মুঘলরা আবার অনেক দিক থেকেই ভিন্ন। তাদের সাম্রাজ্য ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক। সেখানে বহুজাতিক ও বিশ্বজনীন শাসকশ্রেণি ছিল এবং ধর্মীয় অন্তর্ভুক্তির প্রতি ছিল উন্মুক্ত মনোভাব। ‘সুলহ-ই-কুল’ নীতি মুঘল সাম্রাজ্যকে অন্য দুই সাম্রাজ্য থেকে পৃথক করেছিল। আকবর বাকি দুই সাম্রাজ্যকে তুলনামূলকভাবে ধর্মীয় গোঁড়ামি দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে করতেন। আকবর এই বিশ্বাসে সব ধর্মকে সহ্য করতেন যে সব ধর্মই অপূর্ণ। আর দারা শিকোহ বিশ্বাস করতেন যে সব ধর্মের মধ্যেই অন্তর্নিহিত সত্য রয়েছে এবং এই কারণে সব ধর্মই সমান।
ডেইলি স্টার: প্রতিষ্ঠার পাঁচ শতাব্দী পর মুঘল সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকারকে আমরা কীভাবে মূল্যায়ন করব? যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এবং বিভিন্ন শাসক ও অঞ্চলের ভিত্তিতে মুঘল নীতিগুলো বদলেছে, তবুও আপনার দৃষ্টিতে এই সাম্রাজ্যের প্রধান শক্তি ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত দুর্বলতা কী কী?
সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি: মুঘল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল ব্যাপক আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের মধ্য থেকে একটি বৃহৎ, স্থিতিশীল ও সাংস্কৃতিকভাবে সমন্বিত রাষ্ট্র গড়ে তোলার সক্ষমতা। মানসাবদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা বহুজাতিক শাসকশ্রেণি গড়ে তুলেছিল, বৃহৎ পুনর্বণ্টনভিত্তিক অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখতে রাজস্ব মূল্যায়নকে মানসম্মত করেছিল এবং ব্যাপকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক নীতি প্রতিষ্ঠা করেছিল। যার সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ আকবরের আমলে দেখা যায় এবং আওরঙ্গজেবের সময়েও এর উপস্থিতি ছিল। এর ফলে রাজপুত, ভারতীয় মুসলিম ও পরবর্তীকালে মারাঠা গোষ্ঠীর সদস্যদেরও সাম্রাজ্যের প্রশাসনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।
উল্লেখ্য, আওরঙ্গজেবের আমলেই শাসক অভিজাতদের সর্বোচ্চ স্তরে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অমুসলিম সদস্য ছিল। এর ফলেই উল্লেখযোগ্য নগরায়ণ, কারুশিল্প উৎপাদন, দূরপাল্লার বাণিজ্য এবং ভাষা, শিল্প ও স্থাপত্যে অভিন্ন উচ্চ সংস্কৃতির বিকাশ ঘটেছিল, যা মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের পরও দীর্ঘকাল টিকে ছিল।
সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল এর প্রশাসনিক বাস্তববাদিতা, বিদ্যমান কৃষিভিত্তিক কাঠামোর ওপর নির্ভরতা, মধ্যস্থতাকারীদের নমনীয় ব্যবহার ও একরৈখিকভাবে ক্ষমতা চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সমঝোতার মাধ্যমে সার্বভৌমত্ব পরিচালনার সক্ষমতা। এর ফলে সাম্রাজ্যটি বিভিন্ন পরিবেশগত ও সামাজিক অঞ্চলে কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পেরেছিল। তবে এই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যেই এর কাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও নিহিত ছিল।
জাগিরদারি ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিকে ক্রমাগত নতুন রাজস্ব উৎসের সম্প্রসারণ বা পুনর্বণ্টনের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছিল। এর ফলে কৃষি উদ্বৃত্তের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি হয়, অভিজাতদের মধ্যে গোষ্ঠীগত প্রতিযোগিতা বাড়ে এবং সম্পদের সংকট দেখা দিলে অস্থিরতা সৃষ্টি হতো। এ ছাড়া, ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিবের ভাষায়, এটি ছিল অত্যন্ত পশ্চাৎমুখী একটি ব্যবস্থা।
আরও একটি সমস্যা ছিল সম্রাটের ব্যক্তিসত্তার বাইরে শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাব। ফলে উত্তরাধিকার সংকট বারবার দেখা দিয়েছে এবং প্রায়শই তা সহিংস রূপ নিত। সাম্রাজ্যের সামরিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থা শক্তিশালী হলেও যুদ্ধের পরিবর্তিত ধরন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্থানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খেত। সমঝোতাভিত্তিক ক্ষমতা কাঠামোর কারণে অষ্টাদশ শতকে কেন্দ্রীয় সংহতি দুর্বল হয়ে পড়লে প্রাদেশিক অভিজাতরা অর্পিত ক্ষমতাকে স্বায়ত্তশাসনে রূপান্তর করতে সক্ষম হয়।
সর্বশেষ, অর্থনৈতিকভাবে প্রাণবন্ত হওয়ার পরও মুঘল শাসনব্যবস্থা কৃষি বা প্রযুক্তিতে এমন কোনো কাঠামোগত রূপান্তর ঘটাতে পারেনি, যা বৈশ্বিক পরিবর্তনের অভিঘাত থেকে তাদের সুরক্ষা দিতে পারত। ফলে অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ইউরোপীয় শক্তির বিস্তারের ফলে বাণিজ্যিক ধারা পরিবর্তনের দ্বৈত চাপে তারা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
ডেইলি স্টার: পঞ্চদশ শতকে জোহানেস গুটেনবার্গের মুদ্রণযন্ত্র আবিষ্কারের পর ইউরোপে ব্যাপক রূপান্তর ঘটে। মুঘল ভারতে তেমন কোনো মুদ্রণ বিপ্লব দেখা যায়নি। কিন্তু, বারুদ ও কামানের মতো সামরিক প্রযুক্তি তারা দ্রুত গ্রহণ করেছিল। এই বৈপরীত্যের কথা ইতিহাসবিদ সুমিত সরকার উল্লেখ করেছেন। মুদ্রণ সংস্কৃতির সীমিত বিস্তার ও নতুন বৌদ্ধিক ধারার ধীর প্রসারের কারণে ইউরোপের তুলনায় ভারত আপেক্ষিক পিছিয়ে পড়েছিল কিনা এবং অষ্টাদশ শতকে ইউরোপীয় বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক সম্প্রসারণের মুখে ভারতের দুর্বলতা গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে এর কতটা প্রভাব ছিল?
সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি: এখানে আমার উত্তর দুটি অংশে ভাগ করব। ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব বহু আগেই উল্লেখ করেছিলেন, ভারতে ‘পুঁজিবাদী বিকাশের সম্ভাবনা’ থাকলেও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে গুরুতর ঘাটতি ছিল। এম. আথার আলী তার ‘পাসিং অব অ্যান এমপায়ার’ প্রবন্ধে মত প্রকাশ করেছিলেন, যখন ইউরোপে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি হচ্ছিল, তখন আমরা হিন্দু ও ইসলাম ধর্ম এক কি না, তা নিয়ে বিতর্কে ব্যস্ত ছিলাম।
আপনার প্রশ্নে ফিরি।
হ্যাঁ, ইউরোপে মুদ্রণযন্ত্র এমন এক নতুন জ্ঞানভিত্তিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে সহায়তা করেছিল, যার মধ্যে ছিল সস্তা বই, ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক বিতর্কের বিস্তৃত প্রচার, মানসম্মত গ্রন্থ, জনপরিসরে মতবিনিময়, প্রযুক্তিগত নির্দেশিকা, মানচিত্র, নৌপরিবহনসংক্রান্ত সাহিত্য ও পরবর্তীতে সংবাদপত্র। এটি ধর্মসংস্কার আন্দোলন, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, বাণিজ্যিক সাক্ষরতা ও আমলাতান্ত্রিক যোগাযোগব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছিল। এই অর্থে মুদ্রণ কেবল তথ্য ছড়িয়ে দেয়নি, জ্ঞান বিস্তারের গতি, পরিসর ও সামাজিক নাগালকে আমূল বদলে দিয়েছিল।
বিপরীতে, মুঘল ভারতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ পাণ্ডুলিপি নির্ভর সংস্কৃতি ছিল। ফারসি, সংস্কৃত, আরবি, ব্রজ, আওধি, বাংলা, দাখনি ও অন্যান্য সাহিত্যিক ঐতিহ্য সমৃদ্ধভাবে বিকশিত হয়েছিল। সেখানে ছিল গ্রন্থাগার, ক্যালিগ্রাফার, মাদ্রাসা, মক্তব, পাঠশালা, দরবারি শিল্পকেন্দ্র ও পণ্ডিতদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক। তবে জ্ঞানের বিস্তার হতো মূলত অভিজাত, লেখক-লিপিকার, দরবার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বণিক-গোষ্ঠীর মাধ্যমে। গণভিত্তিক মুদ্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে হয়নি। এর ফলে জ্ঞানচর্চা উন্নত ও পরিশীলিত থাকলেও তার সামাজিক বিস্তার ছিল তুলনামূলকভাবে সীমিত। বৈজ্ঞানিক, প্রযুক্তিগত, আইনগত ও রাজনৈতিক জ্ঞান সহজে মানসম্মত করা যেত না এবং সমাজজুড়ে দ্রুত ছড়িয়েও পড়ত না।
এর ফলাফল ছিল গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শক্তিশালী মুদ্রণ-নির্ভর জনপরিসরের অভাব প্রাক-আধুনিক ইউরোপের মতো ব্যাপক বৌদ্ধিক বিতর্কের বিকাশকে সীমিত করেছিল। দ্বিতীয়ত, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, নৌপরিবহন, যন্ত্রবিদ্যা, সামরিক প্রশিক্ষণ বা বাণিজ্যিক হিসাবরক্ষণ, যে ক্ষেত্রেই হোক না কেন প্রযুক্তিগত জ্ঞান একই মাত্রায় পুনরুৎপাদনযোগ্য গতিতে ছড়িয়ে পড়েনি। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক যোগাযোগ দরবার, মসজিদ, মন্দির, বাজার ও পাণ্ডুলিপি নির্ভর নেটওয়ার্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। সংবাদপত্র, পুস্তিকা ও মুদ্রিত বিতর্কের ওপর নির্ভরশীল হয়ে ওঠেনি। চতুর্থত, প্রশাসনিক নথি সংরক্ষণের ব্যবস্থা উন্নত থাকলেও ইউরোপীয় রাষ্ট্র ও কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান মুদ্রণ-নির্ভর আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থার মতো রূপ পায়নি।
তবে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করাও ঠিক হবে না। মুঘল সাম্রাজ্যের পতন কেবল মুদ্রণ প্রযুক্তির অভাবে হয়নি। ভারত বৌদ্ধিকভাবে স্থবির ছিল না। ইন্দো-ফারসি জ্ঞানচর্চা, আঞ্চলিক সাহিত্য, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসাবিজ্ঞান, স্থাপত্য, রাজস্ব প্রশাসন ও কারুশিল্প প্রযুক্তি অত্যন্ত উন্নত ছিল। ইউরোপের অগ্রগতিও শুধু বৌদ্ধিক কারণে হয়নি। এর সঙ্গে আটলান্টিক বাণিজ্য, ঔপনিবেশিক লুণ্ঠন, নৌ-শক্তি, যৌথ মূলধনী কোম্পানি, ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সামরিক-অর্থনৈতিক রাষ্ট্র ও ধারাবাহিক আন্তঃরাষ্ট্রীয় যুদ্ধ জড়িত ছিল। এগুলো প্রযুক্তিগত ও সাংগঠনিক উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
আরও ভারসাম্যপূর্ণ উপসংহার হবে এই যে, সীমিত মুদ্রণ সংস্কৃতি নতুন জ্ঞানের ব্যাপক সামাজিক বিস্তারকে ধীর করে দিয়ে এবং বৃহত্তর সমালোচনামূলক জনপরিসর ও প্রযুক্তিগত সংস্কৃতির বিকাশকে দুর্বল করে ভারতের আপেক্ষিক দুর্বলতায় কিছুটা ভূমিকা রেখেছিল।
তবে অষ্টাদশ শতকে ভারতের দুর্বলতা মূলত এই বৌদ্ধিক সীমাবদ্ধতার সঙ্গে মুঘল রাজনৈতিক বিভাজন, আর্থিক সংকট, ক্ষমতার আঞ্চলিকীকরণ, ইউরোপীয় নৌ-বাণিজ্য শক্তির উত্থান ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সামরিকীকৃত করপোরেট ক্ষমতার সম্মিলিত প্রভাবে তৈরি হয়েছিল। মুদ্রণ প্রযুক্তি একমাত্র কারণ ছিল না, তবে এটি পাণ্ডুলিপি নির্ভর সাম্রাজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে মুদ্রণভিত্তিক, পুঁজিবাদী, সামরিকভাবে শক্তিশালী ও বৈশ্বিকভাবে সম্প্রসারণশীল ইউরোপের মধ্যকার গভীর বৈষম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছিল।
ডেইলি স্টার: ভারতের ইতিহাসে মুঘল শাসনের সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকারগুলো কী বলে আপনি মনে করেন? উপমহাদেশের বৃহৎ অংশকে রাজনৈতিকভাবে একীভূত করা এবং মুঘল চিত্রকলা ও তাজমহলের মতো ঐতিহাসিক কীর্তির বাইরে কোন প্রধান সাংস্কৃতিক, শিল্পকলাগত, সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব আজও এই অঞ্চলকে প্রভাবিত করছে?
সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি: মুঘল শাসনের সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার কেবল স্থাপত্য নিদর্শনে নয়, বরং ভারতের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের গভীর কাঠামোগত রূপায়ণের মধ্যে পাওয়া যায়। ভাষাগত ক্ষেত্রে প্রশাসন ও উচ্চ সংস্কৃতির ভাষা হিসেবে ফারসির প্রতিষ্ঠা এবং স্থানীয় ভাষাগুলোর সঙ্গে এর দীর্ঘস্থায়ী মিথস্ক্রিয়া নতুন সাহিত্যিক ধারার জন্ম দেয়। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো উর্দু বা হিন্দুস্তানির বিকাশ। পাশাপাশি ব্রজ, আওধি, পাঞ্জাবি ও পরবর্তীকালে রেখতা কাব্যধারারও বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। এই বহুভাষিক সমন্বয় আজও উত্তর ভারতের সাংস্কৃতিক ও যোগাযোগভিত্তিক পরিমণ্ডলকে প্রভাবিত করে যাচ্ছে।
মনে রাখতে হবে, ফারসি ভাষার বিকাশে মুঘল ভারতের অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, একসময় ভারতে ইরানের চেয়েও বেশি ফারসি গ্রন্থ রচিত হয়েছিল। এর ফলেই ‘ইন্ডিয়ান পারসিয়ান’ বা ভারতীয় ফারসি ধারার বিকাশ ঘটে, যা আজও ‘সাবক-ই-হিন্দি’ নামে পরিচিত।
প্রশাসনিক ক্ষেত্রে মুঘলদের রাজস্ব মূল্যায়ন ব্যবস্থা, নথি সংরক্ষণ পদ্ধতি ও ভূখণ্ডভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে গেছে। এর মধ্যে মানসম্মত পরিমাপ ব্যবস্থা, পরগনা-সরকার কাঠামো ও প্রশিক্ষিত লিপিকার আমলাতন্ত্র রয়েছে। এর অনেক উপাদান ঔপনিবেশিক শাসনামলে গৃহীত ও পুনর্গঠিত হয়েছিল এবং আজও আধুনিক ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থা ও জেলা প্রশাসনে তার প্রতিফলন দেখা যায়।
সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল মানসাবদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে বহুমাত্রিক ও সেবাভিত্তিক অভিজাত শ্রেণির সৃষ্টি। এটি বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে স্বাভাবিক করে তোলে এবং সমঝোতাভিত্তিক সার্বভৌমত্ব ও অভিজাত সহযোগিতার দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে মুঘল পৃষ্ঠপোষকতা বস্ত্রশিল্প, ধাতুশিল্প, কাগজ উৎপাদন, পুস্তক অলংকরণ শিল্প ও কার্পেট নির্মাণে ব্যাপক উৎসাহিত করেছিল। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক কারুশিল্পের ঐতিহ্য বৃহত্তর বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হয়। এসব দক্ষতা, নকশা ও উৎপাদনকেন্দ্রের অনেকগুলোই আজও টিকে রয়েছে। নগর পরিকল্পনা, বাজার, সরাইখানা, উদ্যান এবং জল-ব্যবস্থা বসতি ও বাণিজ্যের ধরনকে প্রভাবিত করেছিল। সাংস্কৃতিক বিনিময় ও ভোগের কেন্দ্র হিসেবে শহরের যে ধারণা, তা পরবর্তী নগর বিকাশেও বজায় ছিল।
দৈনন্দিন সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মুঘল প্রভাব খাদ্য-সংস্কৃতি (রন্ধনপ্রণালী, বিভিন্ন পদ ও দরবারি খাদ্যরীতি), পোশাক, আচার-আচরণ এবং নান্দনিক রুচির মধ্যে গভীরভাবে প্রবেশ করেছিল। এর ফলে এমন এক অভিন্ন সাংস্কৃতিক ভাণ্ডার গড়ে ওঠে, যা ধর্মীয় ও আঞ্চলিক সীমারেখা পেরিয়ে যায়।
তবে সম্ভবত সবচেয়ে স্থায়ী উত্তরাধিকার ছিল অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক নীতির ধারণা। এটা বাস্তবে সবসময় সমানভাবে প্রয়োগ না হলেও ‘সুলহ-ই-কুল’-এর মাধ্যমে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছিল। এই ধারণাই পরবর্তীকালে উপমহাদেশে বহুত্ববাদ ও সহাবস্থানের চিন্তাধারাকে প্রভাবিত করেছে।
সবমিলিয়ে এই উত্তরাধিকারগুলো মুঘল সাম্রাজ্যকে কেবল রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে নয়, বরং সভ্যতাগত যুগ হিসেবে তুলে ধরে। যার সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ছাপ আজও দক্ষিণ এশিয়ার জীবনযাত্রার গভীরে গাঁথা রয়েছে।
ডেইলি স্টার: যদুনাথ সরকার মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের কারণ হিসেবে সম্পদের ঘাটতির চেয়ে শাসকদের অবক্ষয় ও প্রশাসনিক দুর্বলতাকেই দায়ী করেছিলেন। আপনি এর সঙ্গে কতটা একমত? সাম্রাজ্যের পতন কি মূলত নেতৃত্বের ব্যর্থতায় হয়েছিল, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কাঠামোগত, আর্থিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করেছিল?
সৈয়দ আলি নাদিম রেজাভি: প্রকৃতপক্ষে শাসকদের অবক্ষয়ের বিষয়টি সবচেয়ে জোরালোভাবে তুলে ধরেছিলেন উইলিয়াম আরভিন। শাসকদের ‘অবক্ষয়’ ও প্রশাসনিক দুর্বলতার ওপর এই গুরুত্বারোপ শেষ মুঘল যুগের সংকটের একটি দিক তুলে ধরে। কিন্তু, সাম্রাজ্যের পতনের ব্যাপ্তি ও সময়কাল ব্যাখ্যা করার জন্য এই যুক্তিটি শেষ পর্যন্ত খুবই সীমিত হয়ে যায়।
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে আওরঙ্গজেবের পর নেতৃত্বের মান ছিল অসম এবং বারবার উত্তরাধিকার নিয়ে সংঘাতের কারণে কেন্দ্রীয় ক্ষমতা দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। দরবারে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব, শক্তিশালী অভিজাতদের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠায় সম্রাটদের ক্রমবর্ধমান অক্ষমতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলার দৃশ্যমান শিথিলতা—সবই অস্থিরতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু এগুলোকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখলে লক্ষণের সঙ্গে মূল কাঠামোগত সমস্যা গুলিয়ে ফেলার ঝুঁকি তৈরি হয়।
ইরফান হাবিব, এম আথার আলী, সতীশ চন্দ্র ও মুজাফফর আলমসহ বহু গবেষক যুক্তি দিয়েছেন যে, সাম্রাজ্যটির সামরিক-আর্থিক কাঠামোর মধ্যেই গভীর অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য ছিল। জাগিরদারি-মানসাবদারি কাঠামো থেকে আসা রাজস্ব সম্পদ ও ক্রমবর্ধমান অভিজাত শ্রেণির দাবি ধারাবাহিক ভারসাম্যের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু সপ্তদশ শতকের শেষভাগে এই ভারসাম্য তীব্র চাপে পড়ে। তথাকথিত ‘জাগিরদারি সংকট’, অর্থাৎ বণ্টনযোগ্য ও উৎপাদনশীল জাগিরের ঘাটতি, কৃষি উদ্বৃত্তের ওপর চাপ ও মানসাবদারদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় একদিকে গ্রামীণ সংকট এবং অন্যদিকে অভিজাতদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি হয়।
একই সময়ে আঞ্চলিক শক্তির উত্থান কেবল কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা ছিল না, বরং এটি ছিল একটি কাঠামোগত রূপান্তর। প্রাদেশিক গভর্নর, জমিদার এবং মারাঠা, শিখ, আওধ, বাংলার নবাব ও হায়দরাবাদের শাসকের মতো উদীয়মান শক্তিগুলো তাদের ক্ষমতাকে স্বায়ত্তশাসিত শাসনব্যবস্থায় রূপান্তরিত করেছিলেন। যদিও তারা অনেক ক্ষেত্রেই বৈধতার ক্ষেত্রে মুঘল ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছিলেন।
অর্থনৈতিক পরিবর্তন, কিছু অঞ্চলে বাণিজ্যিকীকরণ বৃদ্ধি, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের (বিশেষত দক্ষিণে) কারণে সৃষ্ট বিঘ্ন এবং ইউরোপীয় বাণিজ্যিক কোম্পানিগুলোর ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির ফলে বাণিজ্যিক ধারা পরিবর্তিত হওয়া—এর সবই সাম্রাজ্যের আর্থিক ভিত্তিকে আরও জটিল করে তোলে। সম্প্রসারণের যুগে অত্যন্ত কার্যকর প্রমাণিত সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংকোচন ও বিকেন্দ্রীকরণের প্রেক্ষাপটে নিজেদের যথেষ্ট অভিযোজিত করতে পারেনি।
ফলে ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও দরবারি রাজনীতি পতনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করলেও মুঘল সাম্রাজ্যের পতনকে আরও ভালোভাবে বোঝা যায় একটি প্রাক-আধুনিক সাম্রাজ্যের ভেতরে ক্রিয়াশীল কাঠামোগত, আর্থিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর পারস্পরিক প্রভাবের ফল হিসেবে, যা তার একীভূতকরণ সক্ষমতার সীমায় পৌঁছে গিয়েছিল। নেতৃত্বের ভূমিকার গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারের এই তত্ত্ব এখনো গুরুত্বপূর্ণ। তবে অষ্টাদশ শতকে উপমহাদেশকে আমূল রূপান্তরিত করা পরিবর্তনগুলো ব্যাখ্যা করার জন্য এটিও এককভাবে যথেষ্ট নয়।