চুকনগর গণহত্যা: লাশের স্তূপে থেমে যায় ভদ্রা নদীর স্রোত

আহমাদ ইশতিয়াক
আহমাদ ইশতিয়াক

‘মিলিটারি গুলি শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে আমরাও দৌড় দিলাম। ভাসুরের বুকে গুলি লাগল, সঙ্গে সঙ্গে তিনি ঢলে পড়লেন। ধরাধরি করে তাকে একপাশে সরিয়ে আনতেই দেখি, আমার স্বামী আর ছেলেও গুলি খেয়ে পড়ে আছে। ভাসুরকে ছেড়ে যখন স্বামীর কাছে এলাম, দেখি তিনি আর বেচে নেই। তখন পাশে শুয়ে থাকা ছেলের দিকে তাকিয়ে দেখি, সে–ও মরে গেছে। তখন কে যে কাকে ধরবে, কারও কোনো হুঁশ নেই। সবাই নিজের প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াচ্ছে। যেদিকে তাকাই শুধু লাশ আর লাশ।’

চুকনগর গণহত্যায় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এখনো দুচোখ ভিজে ওঠে নব্বই পেরোনো সুশীলা বৈরাগীর। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার আউশখালী গ্রামের এই বাসিন্দা নিজে ভাগ্যক্রমে প্রাণে বেঁচে গেলেও হারিয়েছিলেন স্বামী, সন্তানসহ সাত স্বজনকে।

বিভীষিকাময় সেদিন নিয়ে বলেন, ‘লাশের মধ্যেই দৌড়াতে দৌড়াতে নদীর পাড়ে এসে দেখি, ওখানেও মিলিটারি লোকজনকে দাঁড় করিয়ে গুলি করছে। আমি তখন পাটখেতের ঝোপের মধ্যে গিয়ে লুকালাম। সেদিন আমার শুধু জানটাই বেঁচে যায়, নয়তো যা ছিল সবই তো হারালাম। স্বামী গেল, সন্তান গেল, সঙ্গে থাকা টাকাপয়সা, গয়না—সব ফেলে ভারতে চলে গেলাম।’

চুকনগর
চুকনগর গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী সুশীলা বৈরাগী। গণহত্যায় স্বামী, সন্তানসহ পরিবারের ৭ স্বজনকে হারিয়েছিলেন তিনি। ছবি: আহমাদ ইশতিয়াক

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এক দিনে সংঘটিত সর্ববৃহৎ গণহত্যা হয় খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার ৫ নম্বর আটলিয়া ইউনিয়নের চুকনগর গ্রামে। ১৯৭১ সালের ২০ মে সেদিন শহীদ হন ১০ হাজারের বেশি মানুষ।

মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের ভারতে আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার সহজ রুট ছিল চুকনগর। পার্শ্ববর্তী ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদী ছিল যাতায়াতের মাধ্যম। অন্য রুটগুলোর মতো এখানে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারদের উপদ্রব না থাকায় ভারতে আশ্রয় নিতে এই পথ বেছে নিয়েছিলেন বহু শরণার্থী।

তিন দিক দিয়ে নদীবেষ্টিত জনপদ চুকনগর। চারদিক নিচু হলেও চুকনগর বাজার ও পার্শ্ববর্তী এলাকা ছিল অপেক্ষাকৃত উঁচু। ফলে নদীপথে আসা শরণার্থীরা বিশ্রামস্থল হিসেবে এই এলাকাকে বেছে নিতেন। মে মাসের মাঝামাঝি, বিশেষ করে ১৮ ও ১৯ মে চুকনগর দিয়ে যাতায়াতকারী শরণার্থীর সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছায়। খুলনা, বাগেরহাট, রামপাল, মোড়েলগঞ্জ, শরণখোলা, মোংলা, চালনা তো বটেই; ফরিদপুর ও বরিশাল থেকেও লাখো শরণার্থীর ঢল নামে।

মুনতাসীর মামুন সম্পাদিত ‘চুকনগর গণহত্যা’ গ্রন্থ সূত্রে জানা যায়, সে সময় আটলিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন মুসলিম লীগ নেতা গোলাম হোসেন। লাখো শরণার্থীর ঢল দেখে ১৯ মে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সাতক্ষীরা ক্যাম্পে খবর পাঠান। এরপরই সেখানে এক প্লাটুন সেনা পাঠানো হয়।

২০ মে, ১৯৭১। সকাল ১১টা। সাতক্ষীরার দিক থেকে একটি ট্রাক ও একটি জিপে করে এক প্লাটুন পাকিস্তানি সেনা চুকনগরের মালতিয়া মোড়ের ঝাউতলায় এসে থামে। কাঁচি হাতে পাটখেতে কাজ করতে থাকা এক গ্রামবাসীকে দেখেই তারা গুলি করে হত্যা করে। এরপর কিছুটা সামনে এগিয়ে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত কালভার্ট ভাঙা দেখতে পেয়ে তারা গাড়ি থেকে নেমে তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একটি দল চুকনগর বাজারে প্রবেশ করে, একটি যায় মালোপাড়া-রায়পাড়ার দিকে আর অন্য দলটি নদীর পাড় ধরে গুলি করতে করতে এগোতে থাকে।

চুকনগর
চুকনগরের পাতখোলা বিল গণহত্যার দিন পরিণত হয়েছিল রক্তাক্ত প্রান্তরে। ছবি: আহমাদ ইশতিয়াক

চুকনগরের পাতখোলা বিলে তখন লাখো শরণার্থীর জমায়েত। পাকিস্তানি সেনাদের দুটি দল গুলি করতে করতে সেখানে প্রবেশ করে। প্রাণ বাঁচাতে দিগ্‌বিদিক ছুটতে থাকে সাধারণ মানুষ। কিন্তু একটানা ব্রাশফায়ারে কিছুক্ষণের মধ্যেই পাতখোলা বিল পরিণত হয় রক্তাক্ত প্রান্তরে।

বছরখানেক আগে ডুমুরিয়ার প্রত্যক্ষদর্শী তৎকালীন ছাত্রনেতা সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে কথা বলে দ্য ডেইলি স্টার। তিনি বলেন, ‘গুলির শব্দ শুনেই পাতখোলার মাঠে জমায়েত হাজার হাজার মানুষ প্রাণের ভয়ে পালাতে শুরু করে। ওরা নির্বিচারে ব্রাশফায়ার করছিল। একপর্যায়ে নদীর ধারে গিয়ে দেখে, প্রাণ বাঁচাতে অনেকে নৌকার ভেতর আশ্রয় নিয়েছে। ওরা নৌকার ভেতর ঢুকে ঢুকে মানুষকে হত্যা করে। মালোপাড়ায় ঝোপওয়ালা গাছ ছিল, প্রাণ বাঁচাতে বহু মানুষ সেখানেও উঠেছিল। পাকিস্তানিরা তাদের পাখির মতো গুলি করে মারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জ্যৈষ্ঠ মাস হওয়ায় গ্রামে বেশ কয়েকটি পানিশূন্য পুকুর ছিল। সেখানেও মানুষ লুকিয়েছিল, কিন্তু রেহাই পায়নি।’

কেবল পাতখোলা বিলই নয়, চুকনগর বাজারের চাঁদনী, কালীমন্দির, ফুটবল মাঠ, স্কুল থেকে শুরু করে মালতিয়া, রায়পাড়া, মালোপাড়া, দাসপাড়া, তাঁতিপাড়া এবং ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীসহ সব জায়গায় লাশের পাহাড় জমেছিল। মেশিনগান ও রাইফেলের অবিশ্রান্ত গুলিতে গোটা চুকনগরের বুকে নেমে আসে মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতা।

চুকনগর
চুকনগর গণহত্যায় পরিবারের ৮ সদস্যকে হারিয়েছিলেন নিতাই গাইন। ছবি: আহমাদ ইশতিয়াক

এই গণহত্যায় আটজন স্বজনকে হারিয়েছিলেন বটিয়াঘাটা উপজেলার দাউনিয়াফাদ গ্রামের নিতাই গাইন। তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গুলি শুরু হলে আমি দৌড়ে মসজিদে ঢুকি। বাড়ির পাশের এক মেয়ে আমাকে মাদুর দিয়ে পেঁচিয়ে দেয়, যেন পাকিস্তানি আর্মি দেখতে না পায়। আমি প্রাণে বাঁচলেও চোখের সামনে বাবা, কাকা, কাকাতো ও জ্যাঠাতো ভাই, জেঠিমা, পিসেমশাইসহ আটজনকে হত্যা করে তারা।’

সুরেন্দ্রনাথ বৈরাগীরা ছিলেন পাঁচ ভাই। এক গণহত্যাতেই চার ভাইকে হারান তিনি। স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘মা তখন ভাত রান্না করছিলেন। এমন সময়ই গুলির শব্দ। ভাত আর খাওয়া হলো না। দৌড়ে নদীর পাড়ে গিয়ে দেখি সমানে মানুষ মারছে। আমি খেতের মধ্যে লুকালাম। একসময় গুলি থামল, মিলিটারি চলে গেল। স্ত্রী এসে বলল, আপনার ভাইদের একজনও বেঁচে নেই। দেখলাম, বাড়ির পাশের তিন আত্মীয়ের লাশ আমগাছে ঝুলছে।’

সকাল ১১টায় শুরু হওয়া এই নিধনযজ্ঞ শেষ হয় বিকেল ৫টায়, সেটাও কেবল গুলির মজুত ফুরিয়ে যাওয়ার কারণে। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ (অষ্টম খণ্ড) সূত্রে জানা যায়, মাত্র ছয় ঘণ্টায় এক প্লাটুন পাকিস্তানি সেনার চালানো এই গণহত্যায় কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষ শহীদ হন। তবে মুক্তিযুদ্ধ গবেষকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যাটি আরও অনেক বেশি।

চুকনগর
সুরেন্দ্রনাথ বৈরাগী। চুকনগর গণহত্যায় চার ভাইকে হারিয়েছিলেন তিনি। ছবি: আহমাদ ইশতিয়াক

চুকনগর বাজারের ব্যবসায়ী ও প্রত্যক্ষদর্শী আবুল কালাম বলেন, ‘সেদিন যা হয়েছিল, নিজের চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। চারদিকে এত লাশ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল যে সৎকারের কোনো উপায় ছিল না। তখন বাজার কমিটি ঠিক করল, পার্শ্ববর্তী খরস্রোতা ভদ্রা ও ঘ্যাংরাইল নদীতে লাশগুলো ভাসিয়ে দেওয়া হবে।’

লাশ ফেলার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানান আরেক প্রত্যক্ষদর্শী ও চুকনগর কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এ বি এম শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘চুকনগর বাজারের পাটের গুদামের ৪৪ জন শ্রমিককে আমরা বাছাই করেছিলাম। দুজন করে মোট ২২টি দল করা হয়। ঠিক হয়েছিল, প্রতিটি লাশ ফেলার বিনিময়ে তারা চার আনা (২৫ পয়সা) করে পাবে। কিন্তু লাশের সংখ্যা এত বেশি যে গোনা সম্ভব হয়নি। ৪ হাজার ৪০০ পর্যন্ত গোনার পর তারা আর হিসাব রাখেনি। তা ছাড়া প্রতিটি লাশের সঙ্গেই তারা টাকা, সোনা বা রুপার গয়না পাচ্ছিল।’

ভয়াল সেই পরিণতির কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা এত লাশ ফেলেছিল যে লাশের ভিড়ে নদীর স্রোত পর্যন্ত বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের বাকি দিনগুলোতে মানুষ এই দুই নদীর ধারেকাছেও ঘেঁষেনি। নদীর মাছ ধরা তো দূরের কথা, বিনা পয়সায় দিলেও খাওয়ার সাহস করত না কেউ।’

চুকনগর
চুকনগর গণহত্যায় শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভ। ছবি: স্টার