কেন সংস্কৃতির বাজেট অন্তত ২ শতাংশ জরুরি

ইমরান মাহফুজ
ইমরান মাহফুজ

একটি দেশের উন্নয়ন কেবল সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা উঁচু দালান নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই ঘটে, যখন মানুষের মনন, মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও মানবিক চেতনার বিকাশ ঘটে। অবকাঠামো রাষ্ট্রের শরীর গড়ে, আর সংস্কৃতি গড়ে আত্মা। সেই আত্মা যদি দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে অর্থনৈতিক উন্নয়নও দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশে জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতের গুরুত্ব এখনও অত্যন্ত সীমিত। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঘোষিত ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছিল মাত্র ৮২৪ কোটি টাকা—যা বাজেটের মাত্র ০.১০ শতাংশ। এই সামান্য বরাদ্দ দিয়ে একটি জাতির সাংস্কৃতিক বিকাশ, শিল্পী কল্যাণ, গবেষণা, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও সৃজনশীল প্রজন্ম গঠনের মতো বিশাল দায়িত্ব কতটা পালন করা সম্ভব, সে প্রশ্ন অনিবার্য।

আমরা প্রায়ই কিশোর গ্যাং, মাদকাসক্তি, সহিংসতা, নারী নির্যাতন, অনলাইন আসক্তি ও সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করি। সভা-সেমিনার, সংসদীয় আলোচনা কিংবা রাজনৈতিক বক্তৃতায় এসব সমস্যা নিয়ে বিস্তর কথা হয়। কিন্তু সমস্যার গভীরে গিয়ে তার মানবিক ও সাংস্কৃতিক সমাধান নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।

ধরা যাক, নয়ন নামে একটি কিশোরের কথা। এক সময় সে স্কুল-বিমুখ হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূরে সরে গিয়ে উদ্দেশ্যহীন আড্ডা, বেপরোয়া জীবনযাপন এবং অপরাধপ্রবণ বন্ধুমহলের সঙ্গে যুক্ত হয়। একপর্যায়ে সহিংসতা ও অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। বাস্তবে বাংলাদেশে এমন হাজারো নয়নের অস্তিত্ব আছে। প্রশ্ন হলো—এই বিচ্যুতির পথ রোধ করার জন্য আমরা কী করছি?

একটি শিশুর হাতে যদি বই, তুলি, বাঁশি তুলে দেওয়া যায়, তাকে মঞ্চ বা সংগীতে সম্পৃক্ত করা যায়, তাহলে তার চিন্তার জগৎ প্রসারিত হয়। সে কেবল বিনোদনের ভোক্তা থাকে না; হয়ে ওঠে সৃজনশীল মানুষ। গান, নাটক, আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, সাহিত্যচর্চা কিংবা পাঠাগারভিত্তিক কর্মকাণ্ড শিশু-কিশোরদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সহমর্মিতা, নান্দনিকতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ তৈরি করে। সংস্কৃতি মানুষকে শুধু আনন্দ দেয় না, মানুষকে মানুষ হিসেবেও গড়ে তোলে।

বিশ্বের উন্নত দেশগুলো বহু আগেই এই সত্য উপলব্ধি করেছে। তারা সংস্কৃতিকে ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে দেখে। কারণ, সংস্কৃতিতে বিনিয়োগ মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চরিত্র গঠনে বিনিয়োগ। একটি পাঠাগার, একটি নাট্যসংগঠন, একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র কিংবা একটি সংগীত বিদ্যালয় অনেক ক্ষেত্রে অপরাধ প্রতিরোধে এমন ভূমিকা রাখতে পারে, যা কেবল আইন প্রয়োগের মাধ্যমে সম্ভব নয়। আইন অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়, কিন্তু সংস্কৃতি মানুষকে অপরাধের পথ থেকে দূরে রাখে।



বাংলাদেশের বাস্তবতায় জেলা পর্যায়ে সাংস্কৃতিক অবকাঠামো এখনও দুর্বল। আর উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে বলতে গেলে তেমন কোনো অবকাঠামোই নেই। অনেক পাঠাগার কার্যত নিষ্ক্রিয়, শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম সীমিত, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো অর্থসংকটে জর্জরিত। গ্রামীণ জনপদে শিশু-কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশের সুযোগ অত্যন্ত কম। ফলে অবসর সময়ের ইতিবাচক ব্যবহারের ক্ষেত্র সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এই শূন্যস্থান থেকেই অনেক সময় তারা জড়িয়ে পড়ছে মাদক, সহিংসতা কিংবা অনলাইন আসক্তিতে।

এ কারণেই জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতি খাতের জন্য অন্তত ২ শতাংশ বরাদ্দের দাবি অযৌক্তিক নয়, বরং সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয়। সম্প্রতি বাংলাদেশ সাংস্কৃতিককর্মী সংঘ জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতির জন্য ২ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। এই দাবি বাস্তবায়িত হলে সাংস্কৃতিক অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পী কল্যাণ, সাংস্কৃতিক শিক্ষা, গবেষণা, প্রকাশনা ও লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

একটি রাষ্ট্রের পরিচয় কেবল তার জিডিপি, রপ্তানি আয় কিংবা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চলচ্চিত্র, ভাষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও একটি জাতির আন্তর্জাতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দক্ষিণ কোরিয়া তার সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে অর্থনৈতিক শক্তিতেও পরিণত করেছে। জাপান, তুরস্ক, ফ্রান্স কিংবা ভারতের মতো দেশগুলোও সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশও তার সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতি, সংগীত, সাহিত্য ও শিল্পকলাকে জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

সংস্কৃতিখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি মানে শুধু শিল্পীদের সহায়তা দেওয়া নয়। এর অর্থ নতুন পাঠাগার প্রতিষ্ঠা, শিশু-কিশোর সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা, গ্রামীণ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহ দেওয়া, গবেষণা তহবিল গঠন, সাংস্কৃতিক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং বিলুপ্তপ্রায় লোকঐতিহ্য সংরক্ষণ। এসব উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানবিক উন্নয়ন ও নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

আমরা বলি ‘ভালো মানুষ চাই, সুস্থ সমাজ চাই, সহনশীল রাষ্ট্র চাই’। কিন্তু ভালো মানুষ তৈরির জন্য যে ভিত্তি প্রয়োজন, সেই সাংস্কৃতিক খাতে আমাদের বিনিয়োগ কতটুকু? বাস্তবতা হলো, সেই বিনিয়োগ এখনও প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য।

সময় এসেছে সংস্কৃতিকে বিলাসিতা হিসেবে নয়, উন্নয়নের মৌলিক উপাদান হিসেবে দেখার। জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতিখাতে অন্তত ২ শতাংশ বরাদ্দ নিশ্চিত করা কোনো অতিরঞ্জিত দাবি নয়; এটি একটি মানবিক, শিক্ষিত, সৃজনশীল ও সভ্য বাংলাদেশ গঠনের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ। কারণ, সংস্কৃতিই পারে মানুষের ভেতরের অন্ধকার দূর করে তাকে আলোর পথে নিয়ে যেতে। সংস্কৃতিই পারে একটি জাতিকে শুধু সমৃদ্ধ নয়, মহৎ করে তুলতে।