বড় হচ্ছে বাজেট, সংকুচিত হচ্ছে উন্নয়ন ব্যয়

আহসান হাবিব
আহসান হাবিব
রেজাউল করিম বায়রন
রেজাউল করিম বায়রন

১৯ বছর আগে, ২০০৬-০৭ অর্থবছরের জন্য তৎকালীন বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান ৬৯ হাজার ৭৪০ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট ঘোষণা করেছিলেন। এরপর তিনটি সরকার এসেছে-গেছে। জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি।

এবার অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দেশের ৫৪তম বাজেট উপস্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।

বাজেটের আকার নাটকীয়ভাবে বাড়লেও জিডিপির তুলনায় এর অনুপাত খুব বেশি বদলায়নি। ২০০৬-০৭ অর্থবছরে বাজেট ছিল জিডিপির প্রায় ১২ দশমিক ৬৮ শতাংশ। আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে তা হতে যাচ্ছে ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।

অর্থাৎ দেশের অর্থনীতির আকার বড় হলেও সরকারের আর্থিক সক্ষমতা সেই অনুপাতে শক্তিশালী হয়নি।

ফলে বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু বড় বাজেট করাই মূল বিষয় নয়। বরং প্রশ্ন হলো—বর্ধমান ঋণ, দুর্বল রাজস্ব আদায় ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে অর্থনীতি এই ব্যয়ভার কতটা টেকসইভাবে বহন করতে পারবে।

গত দুই দশকে দেশের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। বিদ্যুতের আওতা বেড়েছে, গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ উন্নত হয়েছে, মোবাইল ও ইন্টারনেট প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রা বদলে দিয়েছে।

পদ্মা সেতু ও ঢাকা মেট্রোরেলের মতো বড় অবকাঠামো প্রকল্প যোগাযোগ ব্যবস্থায় পরিবর্তন এনেছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়িয়েছে।

তবে এসব উন্নয়ন মানুষের প্রত্যাশাও বাড়িয়েছে। মানুষ এখন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত পরিবহন, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, মানসম্মত শিক্ষা ও ভালো নগরসেবা চায়।

ঢাকাবাসী আরও মেট্রোরেল লাইন চান। দেশের অন্য অঞ্চলের মানুষ চান উন্নত মহাসড়ক, পদ্মা ও যমুনার ওপর দ্বিতীয় সেতু এবং নতুন শিল্প বিনিয়োগ। ফলে সরকারি ব্যয়ের চাপ কাঠামোগতভাবেই বেড়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা (ফিসকাল স্পেস) সংকুচিত হয়েছে।

এখন বাজেটের বড় অংশই চলে যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ে। উচ্চ ঋণ ও সুদের হারের কারণে দেশি-বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধের খরচ বেড়েছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খাদ্যে ভর্তুকির চাপও রয়েছে।

এর সঙ্গে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-কমিশন বাস্তবায়ন হলে স্থায়ী ব্যয়ের চাপ আরও বাড়তে পারে। ফলে সামগ্রিক বাজেটের আকার বাড়লেও উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য জায়গা সংকুচিত হচ্ছে।

দুর্বল রাজস্ব আদায় এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত অন্যতম কম। এতে ঋণের ওপর নির্ভর না করে উন্নয়ন ব্যয় চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে।

আর্থিক খাতও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, ঋণ অনিয়ম ও দুর্বল আদায় ব্যবস্থার কারণে খেলাপি ঋণ বেড়েছে। এতে ব্যাংক খাতের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে।

সরকারের ব্যাংকঋণ বাড়ায় বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ পাওয়া কঠিন হচ্ছে। ব্যবসার ঋণ ব্যয়ও বাড়ছে।

অন্যদিকে দেশের পুঁজিবাজার এখনও অগভীর ও অস্থির। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নে এর ভূমিকা সীমিত। ফলে অর্থনীতি এখনও মূলত ব্যাংক খাতনির্ভর।

সুশাসনের ঘাটতি ও দুর্নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি ক্রয়ে অনিয়মের অভিযোগ সরকারি ব্যয়ের কার্যকারিতা কমিয়ে দিয়েছে।

বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত এক শ্বেতপত্রে বলা হয়েছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়ে থাকতে পারে।

এদিকে বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়িয়েছে। করোনা মহামারি বাণিজ্য, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনে বড় ধাক্কা দেয়। পরে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দেয়। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে এর প্রভাব পড়ে সরাসরি।

২০২৩ সালের মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে রয়েছে। এতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। এতে মূল্যস্ফীতি ও বৈদেশিক মুদ্রাবাজারের ঝুঁকি আরও বেড়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে কঠিন নীতিগত ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে।

একদিকে প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে। সরকার যদি প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সম্প্রসারণমূলক ব্যয়নীতি নেয়, তাহলে ঋণ ও মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) চলমান কর্মসূচি।

আইএমএফের সংস্কার শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে কর আদায় বাড়ানো, ব্যাংক খাত সংস্কার, ভর্তুকি কমানো, আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার ও বিনিময় হার আরও নমনীয় করা।

এসব পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা আনতে সহায়ক হতে পারে। তবে স্বল্পমেয়াদে এর রাজনৈতিক ও সামাজিক খরচ থাকবে।

নতুন অর্থমন্ত্রীর জন্য চ্যালেঞ্জ শুধু বড় বাজেট দেওয়া নয়। সীমিত সম্পদ ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাও বড় কাজ।

তাকে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অর্থ কি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে যাবে, নাকি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও দক্ষ জনশক্তি তৈরির মতো মৌলিক খাতে—সেই ভারসাম্য ঠিক করতে হবে।

সবশেষে, এই বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। উচ্চ প্রত্যাশা, আর্থিক চাপ, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা ও দুর্বল প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর এই সময়ে সরকার কীভাবে অর্থনীতি সামাল দিতে চায়, তারই প্রতিফলন হবে এবারের বাজেট।