‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম’ সম্পর্কে জানেন? ঝুঁকিতে কারা?
হঠাৎ মনে হলো, ঘরের পরিচিত জিনিসগুলো যেন অস্বাভাবিক বড় হয়ে গেছে, কিংবা হাত-পা নিজের চেয়ে ছোট মনে হচ্ছে। কখনো আবার সময় দ্রুত ছুটছে, কখনো চারপাশের সবকিছু মনে হচ্ছে স্বপ্নের মতো। বাস্তবে কোনো পরিবর্তন না ঘটলেও এমন অদ্ভুত অনুভূতি হতে পারে, যাকে বলা হয় অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম।
এটি সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেস ও হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল নিউরোলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী।
অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম কী
অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম (এআইডব্লিউএস) একটি বিরল স্নায়বিক অবস্থা, যেখানে একজন ব্যক্তি বাস্তব জিনিসকে বিকৃতভাবে দেখতে বা অনুভব করতে থাকে। যেমন: জিনিসপত্র খুব ছোট বা খুব বড় মনে হওয়া, দূরে বা কাছে মনে হওয়া ইত্যাদি। এই নামটি এসেছে অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড গল্প থেকে, যেখানে এলিস হঠাৎ বড় বা ছোট হয়ে যায়—ঠিক তেমনই অনুভূতি এই রোগে হয়।
কেন হয়
অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম মূলত মস্তিষ্কের পারসেপশন বা অনুভূতি প্রসেসিংয়ের সাময়িক গোলযোগ। বিশেষ করে অক্সিপিটাল লোব (দৃষ্টি) ও পারিয়েটাল লোব (শরীর ও স্থান বোঝা) এই অংশগুলো ঠিকমতো কাজ না করলে জিনিসের আকার, দূরত্ব, সময়—সবকিছু বিকৃতভাবে অনুভূত হয়।
১. অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমের পেছনে সবচেয়ে সাধারণ কারণ মাইগ্রেন। মাইগ্রেনের কারণে ভিজ্যুয়াল সিগনাল ঠিকভাবে প্রসেস হয় না। তাই জিনিস ছোট বা বড় কিংবা দূরে বা কাছে মনে হয়।
২. ভাইরাল সংক্রমণ, বিশেষ করে এপস্টাইন-বার ভাইরাস সংক্রমণের কারণে হতে পারে। ভাইরাস মস্তিষ্কে প্রদাহ তৈরি করে। এতে নিউরাল সিগনাল প্রসেসিং বিঘ্নিত হয়। সাধারণত শিশু ও কিশোররা বেশি আক্রান্ত হয়।
৩. এপিলেপসি বা খিঁচুনির কারণে হতে পারে। এপিলেপসিতে মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক বৈদ্যুতিক ডিসচার্জ হয়। এর ফলে খিঁচুনির আগে বা পরে এআইডব্লিউএসের মতো পারসেপশন বিকৃতি হতে পারে।
৪. মস্তিষ্কের গঠনগত সমস্যা, মস্তিষ্কে টিউমার, মস্তিষ্কে আঘাত কিংবা স্ট্রোকের কারণে হতে পারে। এগুলো সরাসরি মস্তিষ্কের সেই অংশগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে যেগুলো দৃষ্টি, শরীরের ম্যাপিং, স্থান বোঝা নিয়ন্ত্রণ করে।
৫. কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে হতে পারে।
৬. অতিরিক্ত মানসিক চাপ ও উদ্বেগের কারণে হতে পারে, যদিও তা রোগের কারণ নয়, ট্রিগার হিসেবে কাজ করতে পারে।
৭. মস্তিষ্কের রাসায়নিক ভারসাম্যহীনতা বিশেষ করে সেরোটোনিন, ডোপামিনের ভারসাম্য নষ্ট হলে মস্তিষ্কের তথ্য ব্যাখ্যা করার পদ্ধতি ভুল সংকেত দেয়।
ঝুঁকিতে কারা
শিশু ও কিশোর, সাধারণত ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সীরা বেশি আক্রান্ত হয় অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোমে। এছাড়া মাইগ্রেন, ভাইরাল সংক্রমণ, মৃগী, মস্তিষ্কে আঘাত, টিউমার, স্ট্রোক আছে যাদের এবং বিশেষ কিছু ওষুধ ব্যবহারকারীদের ঝুঁকি বেশি।
এআইডব্লিউএস সাধারণত সাময়িক এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ক্ষতিকর নয়। কিন্তু এটি যদি বারবার হয় বা নতুন করে প্রাপ্তবয়স্ক বয়সে শুরু হয়, সঙ্গে খিঁচুনি, অজ্ঞান অথবা তীব্র মাথাব্যথা থাকে, তাহলে অবশ্যই নিউরোলজিস্ট দেখাতে হবে।
ধরন
কোন ধরনের অনুভূতি বিকৃত হচ্ছে, তার ওপর ভিত্তি করে এআইডব্লিউএসের কয়েকটি ধরন রয়েছে। যেমন:
শরীর সম্পর্কিত বিকৃতি: নিজের শরীর বড় বা ছোট মনে হয়, হাত-পা লম্বা বা খাটো মনে হয়, শরীরের অংশ বিকৃত লাগা।
দৃষ্টিগত বিকৃতি: এটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তি জিনিসপত্রের আকার, দূরত্ব, অবস্থান ভুলভাবে দেখে। জিনিস ছোট অথবা বড় দেখা, জিনিস দূরের অথবা কাছে মনে হওয়া, জিনিসের আকার বিকৃত দেখা।
মিশ্র ধরন: এখানে শরীর ও দৃষ্টির বিকৃতি উভয় একসঙ্গে হয়। নিজের শরীর বিকৃত লাগে, বাইরের জিনিসও বিকৃত দেখা যায়।
সময় বিকৃতি: এটি আলাদা ধরন হিসেবে ধরা হয় না, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে সময় খুব ধীরে যাচ্ছে বা খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে মনে হয়।
স্থান ও দূরত্ব বিকৃতি: স্থান ও দূরত্ব ভুলভাবে অনুভব করা।
একজন রোগীর একাধিক ধরন একসঙ্গে থাকতে পারে। লক্ষণগুলো সাধারণত অস্থায়ী, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মাইগ্রেনের সঙ্গে সম্পর্কিত।
লক্ষণ
১. দৃষ্টিগত বিকৃতি হয়। যেমন: জিনিস অস্বাভাবিক ছোট বা বড় মনে হয়, জিনিস বাস্তবের চেয়ে দূরের বা খুব কাছে মনে হয়, জিনিসের আকার বা রূপ বিকৃত লাগে, সোজা জিনিস বাঁকা বা ঢেউ খেলানো মনে হয়।
২. রোগী নিজের শরীরকে ভুলভাবে অনুভব করে। হাত-পা বড় বা ছোট মনে হয়, শরীর হালকা বা ভারী লাগা, শরীর ভেসে যাচ্ছে মনে হওয়া।
৩. সময়ের অনুভূতির পরিবর্তন হয়, সময় খুব ধীরে যাচ্ছে মনে হয় বা খুব দ্রুত চলে যাচ্ছে।
৪. দূরত্ব ও স্থান সম্পর্কে ভুল ধারণা হয়। যেমন: ঘর বড় বা ছোট মনে হয়, দূরত্ব ঠিকমতো বোঝা যায় না। এর ফলে হাঁটার সময় ধাক্কা খাওয়া, জিনিস ধরতে ভুল হওয়ার প্রবণতা দেখা যায় রোগীর মধ্যে।
৫. নিজেকে বা পরিবেশকে অস্বাভাবিক লাগা, নিজেকে নিজের মতো লাগে না, মনে হয় আমি আমি না, আশেপাশের সবকিছু অবাস্তব বা স্বপ্নের মতো লাগে।
৬. মাথাব্যথা হয়, বিশেষ করে মাইগ্রেন। অনেক ক্ষেত্রে আগে এআইডব্লিউএসের লক্ষণ, পরে মাইগ্রেনের ব্যথা শুরু হয়।
৭. লক্ষণগুলো হঠাৎ শুরু হয়, কয়েক মিনিট থেকে কয়েক ঘণ্টা থেকে আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়।
৮. রোগী সচেতন থাকে, রোগী জানে এটা আসলে বাস্তব না, আমার অনুভূতি ভুল হচ্ছে।
চিকিৎসা
অধ্যাপক ডা. এম এস জহিরুল হক চৌধুরী বলেন, অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড সিনড্রোম চিকিৎসার মূল ভিত্তি—যে কারণে হচ্ছে তা ঠিক করা।
এআইডব্লিউএসের সবচেয়ে সাধারণ কারণ মাইগ্রেন। মাইগ্রেনের ব্যথা কমানোর জন্য ব্যথানাশক ওষুধ দেওয়া হয় রোগীকে। মাইগ্রেন নিয়ন্ত্রণে এলে এআইডব্লিউএসের লক্ষণও কমে যায়।
ভাইরাল সংক্রমণ থাকলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে বিশেষ চিকিৎসা লাগে না, শরীর নিজেই সেরে ওঠে। বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি পান, জ্বর থাকলে প্যারাসিটামল দেওয়া হয়।
এছাড়া খিঁচুনি রোধে অ্যান্টিকনভালসেন্ট বা খিঁচুনি প্রতিরোধী ওষুধ দেওয়া হয়। মস্তিষ্কে টিউমার, আঘাত, স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার, ওষুধ ও অন্যান্য সহায়ক চিকিৎসা দেওয়া হয়। ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে এআইডব্লিউএস হলে সেই ওষুধ বন্ধ বা পরিবর্তন করতে হবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।
কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ করে গুরুতর বা বারবার এআইডব্লিউএস হলে রোগীকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দিতে হবে। উদ্বেগ, মানসিক চাপ কমাতে অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ওষুধ, খুব কম ক্ষেত্রে অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষ করে শিশুদের কোনো ওষুধ ছাড়াই সময়ের সঙ্গে এমনিতেই ঠিক হয়ে যায়।
এছাড়া রোগের লক্ষণ কমানোর জন্য রোগীকে বোঝাতে হবে এটা স্থায়ী নয়, সাময়িক। এতে রোগীর ভয় ও উদ্বেগ কমে। মানসিক চাপ অনেক সময় ট্রিগার হিসেবে কাজ করে, এজন্য নিয়মিত ধ্যান, ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান ও ঘুমাতে হবে। অতিরিক্ত মোবাইল বা স্ক্রিন টাইম কমাতে হবে, উজ্জ্বল আলো, ট্রিগার করা খাবার (চকোলেট, ক্যাফেইন ইত্যাদি) এড়িয়ে চলতে হবে।



