এয়ার কন্ডিশনার শরীরে কী প্রভাব ফেলে, কোন বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে?
বৈশ্বিক উষ্ণতার ছোঁয়ায় তাপমাত্রা বাড়ছে আমাদের দেশেও। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এয়ার কন্ডিশনের ব্যবহার। শরীরকে প্রচণ্ড গরম থেকে শীতলতা দেওয়ার পাশাপাশি কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়াতে পারে এসির ব্যবহার।
এই সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন) ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ।
এসি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে কেন
ডা. হাসান মোস্তফা রাশেদ বলেন, আমাদের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশে এয়ার কন্ডিশন ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে কেন—এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। ফ্যান ঘর ঠান্ডা করে না, এটি কেবল ত্বক থেকে ঘাম বাষ্পীভূত হওয়ার হার বাড়িয়ে শরীরকে ঠান্ডা করার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে এসি ঘরের তাপমাত্রা দ্রুত কমিয়ে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ তৈরি করতে পারে। বাইরে যত গরমই থাকুক, এসির মাধ্যমে ঘরের ভেতরে আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। কিন্তু তাপমাত্রা বা আর্দ্রতা খুব বেশি হলে শুধু ফ্যান যথেষ্ট হবে না।
গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে আমাদের দেশেও উষ্ণতা বাড়ছে। প্রতিবছরই তাপমাত্রা বেড়ে চলেছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার কারণে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য এসি এখন অনেকাংশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে দিনকে দিন এসির চাহিদাও বাড়ছে।
এসি কীভাবে কাজ করে
এয়ার কন্ডিশনার ঘরের ভেতরের বাতাস থেকে তাপ ও আর্দ্রতা বাইরে বের করে দেয়—এটাই ঘর ঠান্ডা করার মূল প্রক্রিয়া। এসির দুইটা ইউনিট থাকে—একটা ঘরের ভেতরে ‘ইনডোর ইউনিট’ আর আরেকটা ঘরের বাইরের ‘আউটডোর ইউনিট’। ভেতরের ইউনিটটি ঘরের গরম বাতাস টেনে নিয়ে ঠান্ডা ইভাপোরেটর কয়েলের ওপর দিয়ে প্রবাহিত করে। ইভাপোরেটর কয়েলের ভেতরে থাকে তরল রেফ্রিজারেন্ট, যা তাপ শোষণ করে বাষ্পে পরিণত হয়ে বাতাসকে ঠান্ডা করে। এসির ভেতরে একটি ফ্যান থাকে, যা এই ঠান্ডা বাতাসকে ঘরের মধ্যে প্রবাহিত করে।
গরম হয়ে যাওয়া এই বাষ্পীভূত রেফ্রিজারেন্ট গ্যাসটি আউটডোর ইউনিটে যায় এবং শোষিত তাপকে বাইরে বের করে দিয়ে পুনরায় তরলে রূপান্তরিত হয়। এভাবে এই পুরো চক্রটি বারবার চলতে থাকে এবং ঘর ঠান্ডা হয়।
এসি শরীরের ওপর কী প্রভাব ফেলে
১. এসি বাতাস থেকে আর্দ্রতা শুষে নেয়, যার ফলে ত্বক ও চোখ শুষ্ক হয়ে পড়ে। ফলে ত্বকে খসখসে ভাব ও চুলকানি হতে পারে এবং চোখে অস্বস্তি, জ্বালা বা চুলকাতে পারে।
২. দীর্ঘসময় এসির মধ্যে থাকলে এসির কম আর্দ্রতাযুক্ত বাতাস শরীরের মিউকাস মেমব্রেনকে শুকিয়ে ফেলে, যার ফলে নাকে অস্বস্তি, চুলকানি, সর্দি, গলাব্যথা বা গলায় খুসখুসে অনুভূতি তৈরি হয়।
৩. এসির ঠান্ডা ও শুষ্ক বাতাসে দীর্ঘসময়ে অবস্থান মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। সাইনুসাইটিস বা অ্যাজমার সমস্যাকেও এই শুষ্ক-ঠান্ডা বাতাস বাড়িয়ে দিতে পারে।
৪. ঠিকমতো সার্ভিসিং না করা হলে এসির ইউনিটগুলোর মধ্যে ধুলোবালি, ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শ্বাসতন্ত্রের রোগের কারণ হতে পারে।
৫. ঠান্ডা বাতাস ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের মাংসপেশিকে সংকুচিত ও শক্ত করে তোলে। ফলে এসি রুমে যারা দীর্ঘ সময় কাজ করে, তাদের ঘাড়ে-পিঠে ব্যথা হতে পারে।
৬. বিশেষত রাতের বেলা বাতাস খুব ঠান্ডা বা শুষ্ক হলে তা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
শিশু ও বয়স্করা এই ধরনের সমস্যায় বেশি ভুগে থাকে। কারণ এদের শারীরিক প্রতিরোধ ক্ষমতা পূর্ণ বয়স্ক মানুষের থেকে কম থাকে এবং তাপমাত্রার পরিবর্তনের প্রভাবও তারা তাৎক্ষণিক বুঝতে পারে না।
এসি ব্যবহারে সতর্কতা
এসির কনডেনসারে মধ্যে ধুলা জমে গেলে এসির তাপ বাইরে বের করতে পারে না। এতে তাপ ও চাপ বেড়ে গিয়ে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকির সঙ্গে সঙ্গে ঘরের বাতাসে ময়লা ও দূষণ তৈরি করে, যা শ্বাসতন্ত্রের রোগের কারণ হতে পারে। এজন্য এসির কনডেনসার নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে।
এসির ভেতরের বাতাস বিশুদ্ধ রাখতে প্রতি ৩০ থেকে ৯০ দিন পর পর ফিল্টার পরিষ্কার করতে হবে।
এসির তাপমাত্রা সবসময় ২৪ থেকে ২৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখা স্বাস্থ্যকর।
বাইরের গরম আবহাওয়া থেকে ঘরে ঢোকার সময় ঘরের তাপমাত্রা দ্রুত কমানো উচিত না, শরীরের তাপমাত্রার পার্থক্য (৫-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি) না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
তাপ থেকে বাঁচতে এসির বিকল্প হিসেবে করণীয়
১. প্রচুর পরিমাণে পানি পান করতে হবে ও পানিজাতীয় অন্য খাবার, যেমন: ফলের রস, স্যালাইন, শরবত এসব পান করতে হবে, যা শরীরকে ঠান্ডা রাখবে।
২. খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মসলাদার ও ভাজাপোড়া এবং গুরুপাক খাবার পরিহার করতে হবে। এসব খাবার বদহজম করতে ও শরীরের তাপমাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে।
৩. বাইরে রোদে বের হলে সানস্ক্রিন ও ছাতা ব্যবহার করতে হবে।
৪. সুতির ঢিলেঢালা, আরামদায়ক পোশাক পরিধান করুন।
৫. সরাসরি রোদে থাকা থেকে বিরত থাকুন, বিশেষত দুপুরের দিকে।
৬. দিনের সবচেয়ে গরমের সময় ব্যায়াম বা ভারী কাজ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৭. আপনার থাকার জায়গাটি ঠান্ডা ও বাতাস চলাচলের উপযোগী রাখুন।
৮. নিয়মিত গোসল শরীর ঠাণ্ডা রাখতে সাহায্য করে।




