‘বিশ্বাসঘাতকতার মাস্টারক্লাস’

৩০ বছর ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থায় থেকে সোভিয়েতদের হয়ে গুপ্তচরবৃত্তি করেছিলেন যিনি

স্টার অনলাইন ডেস্ক

১৯৬৩ সালের ৩০ জুলাই যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর কর্মকর্তা কিম ফিলবির সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশ্যে আসে। এর বহু বছর পর ২০১৬ সালে বিবিসি তার একটি অপ্রকাশিত ভিডিও প্রচার করে। সেখানে তাকে পূর্ব জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা স্টাসির কর্মকর্তাদের সামনে নিজের গুপ্তচরজীবনের কৌশল তুলে ধরতে দেখা যায়।

১৯৮১ সালের ওই ভিডিওতে ফিলবি বলেন, ‘জীবনের প্রায় পুরোটা সময় আমি প্রচার এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছি।’

ভিডিওটি পূর্ব জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থার আর্কাইভ থেকে খুঁজে বের করেছিল বিবিসি।

বিবিসির সাবেক নিরাপত্তাবিষয়ক সংবাদদাতা গর্ডন কোরেরা ২০১৬ সালে ভিডিওটি নিয়ে প্রতিবেদন করেন।

তিনি বলেন, ‘ফিলবি যেন বিশ্বাসঘাতকতার একটি মাস্টারক্লাস নিচ্ছেন। তিনি বলছেন, কীভাবে কেমব্রিজে পড়ার সময় সোভিয়েত গুপ্তচররা তাকে নিয়োগ দেয়। কীভাবে তিনি এমআই৬-এ যোগ দেন। আর কীভাবে সেখানকার গোপন তথ্য চুরি করেন।’

ফিলবি ছিলেন কেজিবির কুখ্যাত ‘কেমব্রিজ ফাইভ’ গুপ্তচরচক্রের অন্যতম প্রধান সদস্য। নিজের বিশ্বাসঘাতকতা নিয়ে তাকে কথা বলতে দেখা যায়, এমন একমাত্র পরিচিত ভিডিও এটি।

ঝাপসা ভিডিওতে ফিলবিকে মোটা ফ্রেমের চশমা, স্যুট ও টাই পরা অবস্থায় দেখা যায়।

তিনি বলেন, ‘আমি এখন শত্রুশিবিরে কাটানো আমার কর্মজীবনের দিকে ফিরে তাকাচ্ছি। সেখানে আমি ৩০ বছর কাটিয়েছি।’

এরপর তিনি জানান, কীভাবে বছরের পর বছর ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার গোপন নথি সোভিয়েতদের হাতে তুলে দিতেন।

ফিলবি বলেন, ‘প্রতি সন্ধ্যায় আমি বড় একটি ব্রিফকেস নিয়ে অফিস থেকে বের হতাম। তাতে আমার লেখা প্রতিবেদন থাকত। মূল আর্কাইভ থেকে বের করা ফাইলও থাকত। সন্ধ্যায় সেগুলো আমার যোগাযোগকারীর হাতে দিতাম। পরদিন সকালে ফাইলগুলো ফেরত পেতাম। এর মধ্যে কাগজপত্রের ছবি তোলা হয়ে যেত। খুব সকালে সেগুলো অফিসে নিয়ে যেতাম। তারপর আবার যথাস্থানে রেখে দিতাম। বছরের পর বছর আমি এ কাজ করেছি।’

পূর্ব জার্মানির গোয়েন্দা সংস্থা স্টাসির কর্মকর্তাদের সামনে নিজের গুপ্তচরজীবনের কৌশল তুলে ধরছেন ফিলবি। ছবি: সংগৃহীত

বিবিসি জানায়, ওই গুপ্তচরচক্রে ফিলবির সঙ্গে ছিলেন ডোনাল্ড ম্যাকলিন, গাই বার্জেস, অ্যান্থনি ব্লান্ট ও জন কেয়ার্নক্রস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও স্নায়ুযুদ্ধের সময় তারা ব্রিটেনের গোপন তথ্য ক্রেমলিনের হাতে তুলে দিয়েছিলেন।

'স্টালিনস অ্যাপোস্টলস: দ্য কেমব্রিজ ফাইভ অ্যান্ড দ্য মেকিং অব দ্য সোভিয়েত এম্পায়ার' বইয়ের লেখক অ্যান্টোনিয়া সিনিয়র বিবিসিকে বলেন, তাদের বিশ্বাসঘাতকতাকে কখনো কখনো রোমাঞ্চকর করে দেখানো হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে মঞ্চ ও পর্দায় তাদের দুঃসাহসী ও আকর্ষণীয় চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে তারা ছিল মিথ্যাবাদী ও অপ্রীতিকর বিশ্বাসঘাতক। তারা নিজের দেশের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। যারা তাদের ভালোবাসত, তাদের সঙ্গেও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। তাদের অপরাধে সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের বিশ্বাসঘাতকতা স্টালিনকে ইউরোপের অর্ধেক অংশ দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধতে সাহায্য করেছিল। কেমব্রিজ ফাইভ সেই সাম্রাজ্যবাদী প্রকল্প এগিয়ে নিতে খুবই উৎসাহী ছিল। তারা এটিকে বিশ্ববিপ্লবের নামে চালিয়েছিল।’

১৯৬৮ সালে প্রকাশিত কিম ফিলবির আত্মজীবনী। ছবি: সংগৃহীত

ফিলবির বিশ্বাসঘাতকতার পরিণতিও ছিল প্রাণঘাতী। স্টাসির কর্মকর্তাদের সামনে তিনি স্বীকার করেন, আলবেনিয়ায় সিআইএ ও এমআই৬-এর যৌথ একটি অভিযানের তথ্য তিনি ফাঁস করেছিলেন। এর ফলে শত শত মানুষ নিহত হন।

১৯৬৮ সালে প্রকাশিত আত্মজীবনীতে ওই আলবেনীয় এজেন্টদের সম্পর্কে ফিলবি বলেছিলেন, তারা যেন ‘এইমাত্র গাছ থেকে নেমে এসেছে’।

নিউইয়র্ক টাইমস বইটিকে ‘অনুতাপহীন ও আত্মমগ্ন’ বলে বর্ণনা করেছিল।

সিনিয়র দাবি করেন, ফিলবি অনেক মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের প্রতি তার ‘নির্মম উদাসীনতা’ ছিল।

‘ম্যাগনিফিসেন্ট ফাইভ’

১৯৩০-এর দশকের শুরুতে ফিলবি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন। সে সময় তাকে সোভিয়েত গুপ্তচর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৪০ সালে তিনি এমআই৬-এ যোগ দেন। পরে সংস্থাটির সোভিয়েতবিরোধী গোয়েন্দা কার্যক্রমের প্রধানও হন।

এই পদে থেকে তিনি ব্রিটিশ ও মার্কিন গোপন তথ্য সরাসরি কেজিবির হাতে তুলে দেওয়ার সুযোগ পান। একইসঙ্গে পশ্চিমাদের কমিউনিস্টবিরোধী অভিযান নস্যাৎ করতে থাকেন।

ফিলবি খুব দ্রুত গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে এসেছিলেন। এর পেছনে তার পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানও ভূমিকা রেখেছিল।

অ্যান্টোনিয়া সিনিয়র এই ব্যবস্থাকে বলেছেন ‘চ্যাপোক্রেসি’ বা ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের ভেতরে সুবিধাপ্রাপ্ত পুরুষদের ঘনিষ্ঠ একটি নেটওয়ার্ক। তাদের বেশির ভাগেরই অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনার একই ধরনের পটভূমি ছিল।

ফিলবিসহ ‘ম্যাগনিফিসেন্ট ফাইভের’ পাঁচ সদস্য। ছবি: সংগৃহীত

সিনিয়র বলেন, কঠোর যাচাই বা যোগ্যতার চেয়ে সামাজিক শ্রেণি ও ব্যক্তিগত পরিচিতির গুরুত্ব সে সময়ে বেশি ছিল।

তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে এই চ্যাপোক্রেসিই ফিলবিকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থায় নিয়ে আসে। তখন নিরাপত্তা সংস্থাগুলোতে বুদ্ধিমান লোকের বিপুল চাহিদা ছিল। তাই ফিলবির মতো মানুষ খুব সহজেই যাচাইয়ের ধাপ পার হয়ে যেতেন।’

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এই শ্রেণিগত পক্ষপাত ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারই সুযোগ নিয়েছিল কেমব্রিজ ফাইভ। তারা ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের অতি গোপন তথ্য হাতিয়ে নেয়।

সিনিয়র বলেন, ‘ফিলবি পারমাণবিক গবেষণার তথ্য ক্রেমলিনের হাতে তুলে দেন। যুক্তরাজ্যের মন্ত্রিসভার বৈঠকের পূর্ণ কার্যবিবরণীও দেন। ব্লেচলি পার্কের গোপন তথ্যও দেন। ব্লেচলি পার্ক ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের সংকেত ও কোড ভাঙার কেন্দ্র। ফিলবি উইনস্টন চার্চিল ও ফ্র্যাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের ব্যক্তিগত চিঠিপত্রও ক্রেমলিনের হাতে তুলে দেন।’

তিনি বলেন, ‘তালিকাটি দীর্ঘ এবং হতবাক করে দেওয়ার মতো। তাই সোভিয়েত গোয়েন্দারা তাদের নিজেদের মধ্যে “ম্যাগনিফিসেন্ট ফাইভ” নামে ডাকত। এতে অবাক হওয়ার কিছুই নেই।’

ছবি: সংগৃহীত

প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৫১ সালে বার্জেস ও ম্যাকলিন সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে যান। এরপর ফিলবিকেও গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৫৫ সালে এমআই৬ থেকেও তাকে বরখাস্ত করা হয়। তারপরও ১৯৬৩ সালে তিনি মস্কো পালাতে সক্ষম হন।

কীভাবে তিনি এত দিন টিকে ছিলেন, তার ইঙ্গিত মেলে স্টাসির কর্মকর্তাদের দেওয়া শেষ পরামর্শে।

সেখানে ফিলবি বলেন, ‘তারা আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তাদের লক্ষ্য ছিল আমার মনোবল ভেঙে স্বীকারোক্তি আদায় করা। কিন্তু আমাকে শুধু নিজের মনোবল ধরে রাখতে হয়েছিল। আপনাদের প্রতি আমার পরামর্শ হলো, এজেন্টদের কখনো স্বীকার করতে বলবেন না। তারা সবকিছু অস্বীকার করবে।’

কেন কারও বিচার হয়নি

কেমব্রিজ ফাইভের কাউকেই গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। এ কারণে সরকারিভাবে তাদের আড়াল করা হয়েছিল, এমন ধারণাও রয়েছে।

তবে সিনিয়রের মতে, বাস্তবতা আরও জটিল।

তিনি বলেন, ‘গত বছরের শুরুতে ফিলবি, ব্লান্ট ও কেয়ার্নক্রসকে নিয়ে এমআই৬ অনেক নথি প্রকাশ করে। সেগুলো থেকে ভিন্ন একটি চিত্র পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ভুল করেছিল। তবে মূল সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। গুপ্তচরবৃত্তি প্রমাণ করা খুব কঠিন ছিল। ভিডিওতে ফিলবি অন্যভাবে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিষ্ঠান পুরো ঘটনা ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল। আর তিনি সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিচার এড়িয়েছিলেন। বাস্তবতা এতটাও সরল ছিল না।’

বার্জেস ও ম্যাকলিন পালিয়ে যাওয়ার পরই সন্দেহের কেন্দ্রে আসেন ফিলবি। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাকে নজরদারিতে রাখা হয়। গোপনে তার কথোপকথন শোনা হয়। তাকে অনুসরণও করা হয়। একজন শীর্ষস্থানীয় ব্যারিস্টার তাকে কঠোর জেরা করেন।

তারপরও আদালতে নেওয়ার মতো প্রমাণ মেলেনি।

সিনিয়র বলেন, ‘ফিলবি যে মিথ্যা বলছিলেন, তা সবার কাছেই স্পষ্ট ছিল। কিন্তু সেটি প্রমাণ করার মতো কিছু ছিল না।’

রুশ ডাকটিকেটে কিম ফিলবি। ছবি: সংগৃহীত

রাশিয়ায় নায়ক

শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ফিলবি, ব্লান্ট ও কেয়ার্নক্রসের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করতে পেরেছিল। তবে এর বিনিময়ে তাদের বিচারের হাত থেকে দায়মুক্তির প্রতিশ্রুতি দিতে হয়। তাই সেই স্বীকারোক্তি আদালতে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায়নি।

সিনিয়র বলেন, ‘ব্রিটেনে কেমব্রিজ ফাইভকে সবচেয়ে বেশি রক্ষা করেছে আইনের শাসন। এখানে প্রমাণ ও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া হয়। সেটিই তাদের বিচার এড়াতে সাহায্য করেছে। অথচ তারা স্টালিনের হয়ে কাজ করত। স্টালিন হলে তাদের মাথায় গুলি করতেন অথবা গুলাগে মরতে পাঠাতেন।’

সোভিয়েত ইউনিয়নে পালিয়ে ফিলবি সেখানে নায়কের মর্যাদা পান। তিনি কেজিবির কর্নেল পদ পর্যন্ত পৌঁছান। ১৯৮৮ সালে তার মৃত্যু হয়। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ডাকটিকিটেও তার ছবি স্থান পায়।

রাশিয়ায় আজও তাকে সম্মানের চোখে দেখা হয়। মস্কোতে রাশিয়ার বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থার সদর দপ্তরের কাছে তার নামে একটি চত্বর রয়েছে। কুরস্কের যুদ্ধক্ষেত্রের কাছেও তার ভাস্কর্য রয়েছে।

সিনিয়র বলেন, ‘কিম ফিলবিকে রুশ জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছেন পুতিন।’

মস্কোর কাছে কুনসেভো সমাধিক্ষেত্রে ফিলবিকে সমাহিত করা হয়েছে। যে দেশকে তিনি নিজের ঘর বলে মনে করতেন, শেষ পর্যন্ত সেখানেই তার ঠাঁই হয়।

২০১৬ সালে বিবিসির গর্ডন কোরেরা সেখানে গিয়ে প্রতিবেদন করেন। তখন চারপাশ বরফে ঢাকা ছিল। সেই দৃশ্য তাকে জন লে কারের বিখ্যাত গুপ্তচর উপন্যাস 'দ্য স্পাই হু কেম ইন ফ্রম দ্য কোল্ডের' কথা মনে করিয়ে দেয়।

কোরেরা লিখেছিলেন, ‘ফিলবি সেই গুপ্তচর ছিলেন, যিনি ঠান্ডা থেকে বেরিয়ে আসেননি। বরং তিনি ঠান্ডার মধ্যেই চলে গিয়েছিলেন।’