কোরবানির মাংস স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সংরক্ষণ করার উপায়
পবিত্র ঈদুল আজহার দিন কোরবানি সম্পন্ন করার পর পরিবার-পরিজন, আত্মীয়স্বজন ও অসহায় মানুষের মাঝে তা বিতরণ করা হয় এবং নিজেদের জন্যও কিছুটা মাংস সংরক্ষণ করা হয়। মাংস নষ্ট হওয়া, দুর্গন্ধ সৃষ্টি বা স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক পদ্ধতিতে মাংস সংরক্ষণ করলে তা টাটকা ও নিরাপদ থাকে এবং পরে নিশ্চিন্তে রান্না করা যায়।
কোরবানির মাংস স্বাস্থ্যসম্মতভাবে সংরক্ষণ করার উপায় কী?
• মাংস সংরক্ষণের আগে না ধোয়া
আমরা অনেকেই মাংস সংরক্ষণের আগে ধুয়ে তারপর প্যাকেটজাত করি। এটি স্বাস্থ্যসম্মত মনে হলেও আসলে এটি করা ভুল। কারণ, ধোয়ার পর মাংসের পানি থেকে গেলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর আশঙ্কা থাকে।
ফ্রিজারে মাংস সংরক্ষণ করতে চাইলে তা ধোয়া যাবে না; বরং সরাসরি প্যাকেটে ভরে সংরক্ষণ করতে হবে। তাই কোরবানির পরপরই যতটুকু রান্না করতে চান, সেটুকু আলাদা করে রেখে বাকিটা দ্রুত সংরক্ষণ করুন।
• প্রয়োজন অনুযায়ী ছোট ছোট ভাগে মাংস সংরক্ষণ করা
আপনি সাধারণত যতটুকু মাংস রান্না করেন বা একবারে রান্না করতে চান, সে অনুযায়ী ছোট ছোট ভাগে মাংস সংরক্ষণ করুন। যেমন আধা কেজি বা এক কেজি করে ভাগ করে রাখা যেতে পারে। এতে রান্নার সময় যতটুকু প্রয়োজন বা যে কয়টা ভাগ প্রয়োজন, তা বের করা সহজ হয়; অনেকটা মাংস বের করে বরফ গলানোর প্রয়োজন পড়ে না।
এ ছাড়া গরু বা খাসির বিভিন্ন অংশ; যেমন—মাথা, সিনা, রান কিংবা পাঁজরের মাংস আলাদা আলাদা পলিথিনে সংরক্ষণ করতে পারেন।
• এয়ারটাইট প্যাকেজিং
মাংস ভাগ করার পর দ্রুত পলি ব্যাগ, জিপলক ব্যাগ বা এয়ারটাইট কনটেইনারে প্যাক করে ফেলতে হবে। পলি বা জিপলক ব্যাগে মাংস রাখার পর ভেতরের বাতাস যতটা সম্ভব বের করে ব্যাগটি ভালোভাবে সিল করে রাখতে হবে। এতে মাংসের গায়ে অতিরিক্ত বরফ জমে গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা কমে যায়।
এ ছাড়া এয়ারটাইট কনটেইনারও ব্যবহার করা যেতে পারে।
• লেবেলিং
কত তারিখে মাংস ফ্রিজারে রাখা হচ্ছে, তা প্যাকেটের গায়ে লিখে রাখতে হবে। এতে করে যে মাংস আগে রাখা হয়েছে, সেগুলো প্রথমে রান্না করে ফেলা যায়।
• সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ
কোরবানির ঈদের সময় সাধারণত অনেক পরিমাণ মাংস সংরক্ষণ করতে হয়। তাই আমরা অনেক সময় দ্বিধায় পড়ে যাই, ‘তাপমাত্রাটা ঠিক কত সেট করব?' এটি মূলত নির্ভর করে কত দিনের জন্য মাংস সংরক্ষণ করতে চান তার ওপর।
অল্প সময়ের জন্য সংরক্ষণ (রেফ্রিজারেটর)
সংরক্ষণের ৩ থেকে ৫ দিনের মধ্যে মাংস রান্না করার পরিকল্পনা থাকলে নরমাল রেফ্রিজারেটরের তাপমাত্রা ১ থেকে ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা উচিত।
দীর্ঘদিনের জন্য সংরক্ষণ (ফ্রিজার)
দীর্ঘ সময়ের জন্য মাংস সংরক্ষণ করতে চাইলে ফ্রিজার অর্থাৎ যেখানে বরফ জমে সেখানকার তাপমাত্রা মাইনাস ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে সেট করতে হবে। অনেক ফ্রিজারে এমনিতেই এই তাপমাত্রা সেট করা থাকে। এই তাপমাত্রায় মাংসের গুণগত মান বজায় থাকে এবং জীবাণুর সংক্রমণের ঝুঁকি কম থাকে।
• সংরক্ষণের সময়সীমা অনুসরণ করা
মাংসের স্বাদ ও গুণগত মান বজায় রাখতে মাংসের ধরন ও সংরক্ষণ পদ্ধতি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়সীমা অনুসরণ করা উচিত। টাটকা মাংস ও কিমা মাংস রেফ্রিজারেটরে যথাক্রমে ৩–৫ দিন এবং ১–২ দিন পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়। অন্যদিকে ফ্রিজারে টাটকা মাংস ৬–১২ মাস এবং কিমা মাংস ৩–৪ মাস পর্যন্ত সংরক্ষণ করা সম্ভব।
• রান্নার আগে সঠিকভাবে মাংস ডিফ্রস্ট করা
মাংস ডিফ্রস্ট করার সবচেয়ে ভালো ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায় হলো একটি পাত্রে স্বাভাবিক তাপমাত্রার পরিষ্কার পানিতে প্যাকেটসহ মাংস ভিজিয়ে রাখা। এক্ষেত্রে স্বাদ অটুট রাখতে গরম পানি ব্যবহার না করাই ভালো।
• পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা
কোরবানির মাংস প্রসেসিং ও সংরক্ষণের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কাঁচা মাংস ধরার আগে ও পরে সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নিতে হবে। মাংস কাটার জন্য আলাদা ছুরি ও কাটিং বোর্ড ব্যবহার করা উচিত।
এ ছাড়া রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজারে মাংস সংরক্ষণের আগে অবশ্যই এর ভেতরের অংশ ভালোভাবে পরিষ্কার করে নিতে হবে।
