জেট ল্যাগ কেন হয়, কাটাতে পারেন যেভাবে
ফ্লাইট থেকে নামার পর প্রথম অনুভূতিটা ছিল, আমি সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রে এসে পৌঁছেছি! চারপাশে রাস্তা থেকে শুরু করে সবকিছু একেবারে নতুন। অর্থাৎ পুরো নতুন এক পরিবেশ। এত দূরের একটি দেশে আসার আনন্দ আর কিছুটা মন খারাপে তখন ক্লান্তির কথা খুব একটা মনে হয়নি। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পরেই বুঝলাম, ক্লান্তি যেন আমার সঙ্গে একমত নয়। ঘড়িতে তখন দিনের ব্যস্ত সময়, অথচ চোখে ঘুম আর মাথায় এক ধরনের ভারীভাব। সেখান থেকেই শুরু হলো আমার জেট ল্যাগের অভিজ্ঞতা।
জেট ল্যাগ কী, কেন হয়
আমাদের শরীরে একটি স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি আছে, যাকে বলা হয় সার্কাডিয়ান রিদম। এই ঘড়ি প্রায় ২৪ ঘণ্টার একটি চক্র অনুসরণ করে। এটিই নির্ধারণ করে, কখন আমরা ঘুমাব, জেগে থাকব কিংবা কখন বেশি সতর্ক থাকব। আলো ও অন্ধকার এই জৈবিক ঘড়ির অন্যতম প্রধান সংকেত। সমস্যা শুরু হয় যখন আমরা দ্রুত একাধিক সময় অঞ্চল অতিক্রম করি। ধরুন, বাংলাদেশ থেকে আপনি আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে এলেন। উড়োজাহাজে আপনি কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এমন একটি জায়গায় পৌঁছে গেলেন, যেখানে ঘড়ির সময় বাংলাদেশের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। কিন্তু আপনার শরীর তো ফ্লাইটে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে নিজের ঘড়ি বদলে ফেলতে পারে না। ফলে নতুন জায়গায় যখন সকাল, আপনার শরীর হয়তো তখনো রাত হিসেবে সেটিকে বিবেচনা করছে। আবার স্থানীয় সময় যখন রাত এবং ঘুমানোর প্রস্তুতি নেওয়ার কথা, তখন শরীরের জৈবিক ঘড়ি হয়তো এখনো দিনের সময় মনে করছে! এই স্থানীয় সময় এবং আমাদের নিত্যদিনের সময়ের অসামঞ্জস্যই মূলত জেট ল্যাগের কারণ।
আসলে এক দেশ থেকে আরেক দেশে উড়োজাহাজে দীর্ঘ যাত্রা—বিষয়টি শুনতে যতটা সহজ মনে হয়, আমাদের জন্য ততটা সহজ নয়। বিশেষ করে যখন ভ্রমণের কারণে একাধিক অঞ্চল, মহাদেশ পার হতে হয়। সেই সঙ্গে বদলে যায় সময়। তখন নতুন জায়গায় পৌঁছেও শরীর যেন আগের জায়গার সময়েই আটকে থাকে। ঘুমের সময় এলোমেলো হয়ে যাওয়া, দিনের বেলা হঠাৎ ঘুম পাওয়া, রাতে ঘুম না আসা কিংবা কাজে মনোযোগ দিতে না পারা—এসবই হতে পারে জেট ল্যাগের লক্ষণ।
শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কেননা পড়াশোনা, ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট কিংবা নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার ব্যস্ততার মধ্যে কয়েক দিনের জেট ল্যাগও দৈনন্দিন কাজকে বেশ কঠিন করে তুলতে পারে। যেমন: আমার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার ছিল, আমি জানতাম এখন আমাকে নতুন সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে। কিন্তু শরীর যেন সেটা মানতে চাইছিল না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হতো, আরও কিছুক্ষণ ঘুমানো দরকার। আবার রাতে ঘুমাবার সময় মনে হতো, এখনো তো দিন শেষ হয়নি! নতুন দেশে আসার উত্তেজনা, পরিচিত পরিবেশ থেকে দূরে থাকার অনুভূতি আর সময়ের এই অমিল—সব মিলিয়ে প্রথম কয়েক দিন মানিয়ে নিতে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীদেরই সময় লেগে যায়। তবে ধীরে ধীরে বুঝলাম, জেট ল্যাগের সঙ্গে লড়াই করার সবচেয়ে ভালো উপায় হলো নতুন সময়ের সঙ্গে ধীরে ধীরে মানিয়ে নেওয়া। স্থানীয় সময় অনুযায়ী ঘুমানোর চেষ্টা করা, দিনের বেলায় প্রাকৃতিক আলোতে থাকা, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং খুব বেশি সময় ঘুমিয়ে না পড়া—এসবই কাজে আসে। প্রথম দিকে যতই কঠিন মনে হোক, কয়েক দিনের মধ্যে শরীর নতুন রুটিনকে গ্রহণ করতে শুরু করে।
শিক্ষার্থীরা কীভাবে জেট ল্যাগ কমাতে পারে
জেট ল্যাগ পুরোপুরি এড়ানো সব সময় সম্ভব নয়। তবে কিছু সহজ অভ্যাস শরীরকে নতুন সময়ের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।
১. স্থানীয় সময় অনুসরণ করুন
নতুন দেশে পৌঁছানোর পর যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় সময় অনুযায়ী ঘুম, খাবার ও দৈনন্দিন কাজের রুটিন তৈরি করার চেষ্টা করা ভালো। খুব বেশি সময় ধরে পুরোনো দেশের সময় অনুযায়ী চললে শরীরের মানিয়ে নিতে আরও সময় লাগতে পারে।
২. দিনের আলোকে কাজে লাগান
প্রাকৃতিক আলো আমাদের জৈবিক ঘড়ি সামঞ্জস্য করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই দিনের বেলায় বাইরে হাঁটা বা কিছু সময় প্রাকৃতিক আলোতে থাকা নতুন সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে। নতুন জায়গায় দিনের বেলা বাইরে বের হওয়া এবং স্বাভাবিক কাজকর্মের মধ্যে থাকা ধীরে ধীরে নতুন রুটিনে ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
৩. দিনের বেলা অতিরিক্ত ঘুম এড়িয়ে চলুন
নতুন দেশে এসে খুব বেশি ক্লান্ত লাগলেও দিনের বেলা দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে পড়লে রাতে ঘুমানো আরও কঠিন হতে পারে। খুব প্রয়োজন হলে অল্প সময়ের জন্য ঘুমানো যেতে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ঘুমানো এড়িয়ে চলাই ভালো।
৪. পর্যাপ্ত পানি পান
দীর্ঘ উড়োজাহাজ যাত্রায় শরীর পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে, যা ক্লান্তিকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে, ভ্রমণের সময় এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর পর পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ।
৫. ঘুমের পরিবেশ ঠিক রাখুন
রাতে ঘুমানোর সময় ঘর অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখা এবং ঘুমের আগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার কমানো শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে সাহায্য করতে পারে।
৬. প্রথম কয়েক দিন নিজেকে একটু সময় দিন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার সময় দিতে হবে। নতুন দেশে পৌঁছানোর পর প্রথম দিন থেকেই আগের মতো শতভাগ কর্মক্ষম থাকার প্রত্যাশা করলে হতাশা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের উচিত গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস, পরীক্ষা বা একাডেমিক কাজের আগে পর্যাপ্ত সময় হাতে রাখা।
জেট ল্যাগ কি সবার একই রকম হয়?
জেট ল্যাগের তীব্রতা নির্ভর করতে পারে কয়েকটি বিষয়ের ওপর। যেমন: কতগুলো সময় অঞ্চল পার হতে হয়েছে, কোন দিকে ভ্রমণ করা হয়েছে, ঘুমের অভ্যাস কেমন এবং ব্যক্তিভেদে নতুন সময়ের সঙ্গে কত দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে তার ওপর।
সাধারণভাবে পূর্বমুখী ভ্রমণে শরীরের জন্য নতুন সময়সূচির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া তুলনামূলক কঠিন হতে পারে। তাই বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসা একজন শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতা আবার যুক্তরাষ্ট্র থেকে বাংলাদেশে যাওয়া আরেকজন শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতার মতো নাও হতে পারে।
বিদেশে আসা শিক্ষার্থীদের কাছে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, নতুন ক্লাস, নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়াই সাধারণত সবচেয়ে বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এর পাশাপাশি নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। আমেরিকায় আসার পর আমার নিজের অভিজ্ঞতা থেকে একটি বিষয় বেশ পরিষ্কার হয়েছে, ফ্লাইট থেকে নেমে আমরা নতুন দেশে পৌঁছে যাই। কিন্তু আমাদের পুরোনো ঘড়ি সব সময় সেখানে পৌঁছায় না।
তাই জেট ল্যাগকে ভ্রমণের একটি বিরক্তিকর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখার বদলে স্বাভাবিক একটি সাময়িক প্রতিক্রিয়া হিসেবেও দেখা যেতে পারে। একটু পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, দিনের আলো এবং নিয়মিত রুটিন—এই কয়েকটি বিষয় মেনে চললে অনেক সহজেই নতুন সময়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়।



