তারুণ্যেই কেন বাংলাদেশ ঘুরে ফেলা উচিত

এমএইচ হায়দার

ঘোরাঘুরির জন্য কি আদৌ কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা আছে? ইচ্ছে হলেই তো যেকোনো বয়সেই ব্যাগ গুছিয়ে ভ্রমণে বেরিয়ে পড়া যায়—তাই না? তবে কুড়ির কোঠায় থাকতেই বাংলাদেশের অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করার মধ্যে এক ধরনের আলাদা মোহনীয়তা আছে, আর তার পেছনে রয়েছে যথেষ্ট যৌক্তিক কারণও।

ভাবছেন, কেন আমি এমনটা বলছি? চলুন, তাহলে এর পেছনের ব্যাখ্যাটা শুনে নেওয়া যাক।

বাজেট ফ্রেন্ডলি ভ্রমণ

শিক্ষার্থী বা সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা অনেকের জন্য ভ্রমণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আর্থিক সংকট। এই সময়ে সাধারণত টিউশনি, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা এন্ট্রি-লেভেলের চাকরি থেকে অর্জিত আয় দিয়েই চলতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে পরিবারের খরচে সহযোগিতা করা বা নিজের দৈনন্দিন ব্যয় সামলানোর দায়িত্বও নিতে হয়।

তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভ্রমণের খরচ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। যেমন: একবার আমি আর আমার এক বন্ধু দিনাজপুর ভ্রমণে গিয়ে মাত্র ৫০০ টাকা খরচ করে প্রতি রাতে থাকার ব্যবস্থা করতে পেরেছিলাম।

শিক্ষার্থী জীবনে তখন আরাম-আয়েশ বা অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধার কথা খুব একটা মাথায় আসেনি—যেটা এখন এসে বেশি গুরুত্ব পায়। সময় ও সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে অবশ্যই বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়বেন। তবে এই বয়সে খুব সহজেই এবং অল্প খরচে নিজের দেশকে ঘুরে দেখা সম্ভব। কারণ শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে নানান বাজেট ফ্রেন্ডলি ভ্রমণ পদ্ধতি, যেগুলো তারা অনায়াসেই গ্রহণ করতে পারে।

তারুণ্যেই কেন বাংলাদেশ ঘুরে ফেলা উচিত
ছবি: স্টার

বাংলাদেশ নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর

ইউরোপে সাশ্রয়ী ও অ্যাডভেঞ্চারধর্মী ভ্রমণ, আমেরিকায় দীর্ঘ পথের রোড ট্রিপ, এশিয়ার আধুনিক ও প্রাণবন্ত মহানগর ঘুরে দেখা কিংবা অচেনা মনোমুগ্ধকর পাহাড়ে ট্র্যাকিং করার স্বপ্ন কমবেশি সবারই থাকে। তবে আমাদের নিজের দেশটিও যে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এক বিশাল ভাণ্ডার—তা ভুলে গেলে চলবে না।

সুপরিচিত পর্যটনকেন্দ্র থেকে শুরু করে অচেনা-অজানা পথ—বাংলাদেশের সর্বত্রই যেন অপার সৌন্দর্য ছড়িয়ে আছে। সুবিশাল পাহাড়ি অঞ্চলের আঁকাবাঁকা ও এবড়োথেবড়ো পথে হেঁটে প্রকৃতিকে উপভোগ করা, ঝরনার ধারায় আনন্দে মেতে ওঠা, হাওরে নৌকাভ্রমণ, কক্সবাজারের সমুদ্রসৈকতে বসে অলস সময় কাটানো কিংবা সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ও বন্য পরিবেশ ঘুরে দেখা—আরও কত কী রয়েছে! প্রকৃতি যেন অপরিসীম সৌন্দর্যের ভাণ্ডার নিয়ে বসে রয়েছে।

শুধু প্রকৃতি নয়, আমাদের দেশের ঐতিহ্য, খাবারদাবার ও আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্যও নিঃসন্দেহে আপনার মনে গভীরভাবে জায়গা করে নেবে।

সম্ভবত সচেতনতা ও সঠিক প্রচারের অভাবে বাংলাদেশের অনেক মানুষ নিজের দেশের সৌন্দর্য সম্পর্কে তেমনিভাবে অবহিত নয়। অন্যথা, আপনি এ দেশের যেকোনো একটি জেলা নির্বাচন করে ঘুরতে বেরিয়ে পড়ুন এবং দেখবেন যে সেখানে কিছু না কিছু মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যের সন্ধান পাবেন।

তারুণ্যেই কেন বাংলাদেশ ঘুরে ফেলা উচিত
ছবি: স্টার

ভ্রমণ শেখায় জীবনের অদেখা পাঠ

আমার মনে হয়, প্রথম দুটো কারণই ভ্রমণের পরিকল্পনা শুরু করার জন্য যথেষ্ট। তবে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়—ভ্রমণ আপনাকে জীবনের এমন সব পাঠ শেখায়, যা কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস কিংবা চাকরির প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে কখনোই শেখানো হয় না। জীবনের তরুণ বয়সে এসব শিক্ষা অর্জন করতে পারলে দৃষ্টিভঙ্গি নিঃসন্দেহে আরও বাস্তবসম্মত ও পরিপক্ব হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশ ভ্রমণের মধ্য দিয়ে চলুন না, নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করি।

ভ্রমণের সময় আমি প্রায়ই রিকশাচালক কিংবা লোকাল বাসচালকদের সঙ্গে আলাপে মেতে উঠি এবং মনোযোগ দিয়ে তাদের কথা শুনি। তখন বুঝতে পারি—পেশা বা সামাজিক অবস্থান ভিন্ন হলেও মানুষের অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি অনেক ক্ষেত্রেই আশ্চর্যজনকভাবে একরকম।

তারুণ্যেই কেন বাংলাদেশ ঘুরে ফেলা উচিত
ছবি: সাজ্জাদ ইবনে সাঈদ/স্টার

আমি কৃষকদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছি, তাদের সঙ্গে একই পাতে বসে খাবার ভাগ করে নিয়েছি। তখন উপলব্ধি করেছি—শহরবাসী হিসেবে আমরা যেভাবে তাদের জীবন সম্পর্কে যেমন ধারণা পোষণ করি, বাস্তবিক অর্থে তাদের জীবনটা অত সহজ বা শান্তিপূর্ণ নয়।

অনেক সময় মানুষের দয়া, আন্তরিকতা ও অতিথিপরায়ণতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আবার কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতেও পড়েছি, যেখানে বিষয়টি ঝগড়া-বিবাদে গড়িয়েছে এবং কিছু উগ্র প্রকৃতির মানুষ আমাকে হুমকি দিয়েছে বা প্রতারণার চেষ্টা করেছে।

মানুষের প্রবৃত্তি ও আচরণ সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ ভ্রমণের পথে সেই অভিজ্ঞতা আপনি পাবেন স্পষ্ট, গভীর ও অনেক সময় অপ্রত্যাশিতভাবে। দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরে বেড়ানো নিঃসন্দেহে আপনার দৃষ্টিকে আরও প্রসারিত করবে।

তারুণ্যেই কেন বাংলাদেশ ঘুরে ফেলা উচিত
ছবি: স্টার

অবিস্মরণীয় স্মৃতির স্মারক

বেশিরভাগ মানুষের জীবনে বিশের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়টা এক অসাধারণ অধ্যায়। আপনি তখন প্রাপ্তবয়স্ক—তবে বড় কোনো ভুল না করলে কেউ আপনাকে চোখ রাঙিয়ে কথা বলবে না। আবার প্রাপ্তবয়স্ক হয়েও তখনো পূর্ণ মাত্রার দায়িত্বশীলতা আপনার কাছ থেকে প্রত্যাশিত নয়। শক্তি থাকে অদম্য এবং ভাগ্য খুব সুপ্রসন্ন হলে হয়তো জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়নি এখনো আপনাকে।

এই সময়টাই জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় কিছু মুহূর্ত গড়ে ওঠার সময়।

পেছন ফিরে তাকালে দেখি, তখনকার কোনো জায়গার জাঁকজমক বা বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে অনেক বেশি মনে পড়ে সেই সময়ের সাধারণ অথচ অমূল্য মুহূর্তগুলো।

মনে পড়ে—একবার আমি আর আমার এক বন্ধু উদ্দেশ্যহীনভাবে ইজিবাইকে চড়ে বেরিয়েছিলাম। ঘুরতে ঘুরতে কখন যে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রাম পেরিয়ে, এমনকি অন্য এক বিভাগে ঢুকে পড়েছিলাম, তা খেয়ালই ছিল না। 
সেদিন অনেক দেরি হয়ে যাওয়ায় আর ফেরা সম্ভব হয়নি; বাধ্য হয়ে সেই অচেনা জায়গাতেই রাত কাটাতে হয়েছিল।

তারুণ্যেই কেন বাংলাদেশ ঘুরে ফেলা উচিত
ছবি: সাজ্জাদ ইবনে সাঈদ/স্টার

আরেক রাতের কথা আজও মনে পড়ে—এক পাহাড়ি এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ঘন অন্ধকারে যেন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। একটা ঘটনার কথা মনে পড়লে এখনো খানিকটা রাগ হয়, এক জায়গায় ঘুরতে গিয়ে আমার এক বন্ধু চুইঝাল মাংস খেতে গিয়ে দেরি করে ফেলায় ঢাকায় ফেরার বাস মিস করে ফেলেছিলাম আমরা।

আরও একটি স্মৃতি আছে—একবার বৃষ্টির মধ্যে আমরা এক অচেনা গ্রামে আটকে পড়েছিলাম। কোনো দুশ্চিন্তা না করেই রাস্তার ধারের এক টং দোকানে আশ্রয় নিয়েছিলাম। ভিজে একেবারে একাকার হয়ে গেলেও সেই মুহূর্তগুলো ছিল নির্ভার আর প্রাণখোলা।

বিশের কোঠা বহু আগেই পেরিয়ে এসেছি। তবু নিজেকে প্রশ্ন করি—ওই বয়সে যদি এভাবে ঘুরে না বেড়াতাম, তাহলে কি সেই সময়গুলো আমার জীবনে এতটা স্মরণীয় হয়ে থাকত?

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী