ইন্টার্নশিপ খোঁজার আগে যে বিষয়গুলো জানা প্রয়োজন
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষের দিকের সেমিস্টারগুলোতে একটি শব্দ সবচেয়ে বেশি শোনা যায়—ইন্টার্নশিপ। কেউ লিংকডইনে খোঁজ করছেন, কেউ সিনিয়রদের কাছে জানতে চাইছেন, আবার কেউ সিভি ঠিকঠাক করতে ব্যস্ত। অনেকের কাছেই এটি কর্মজীবনের প্রথম ধাপ।
তবে আবেদন করার আগে কয়েকটি বিষয় জানা থাকলে পুরো প্রক্রিয়াটিই অনেক সহজ হতে পারে।
সব সুযোগই আপনার জন্য নয়
ইন্টার্নশিপ খোঁজা শুরু করলেই যত বেশি সম্ভব জায়গায় আবেদন করার প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু সব সুযোগ যে সবার জন্য উপযুক্ত হবে, এমন নয়। আবেদন করার আগে ভেবে দেখা দরকার, ভবিষ্যতে কী ধরনের কাজ করতে চান। একই বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেও ভিন্ন ভিন্ন পেশায় যাওয়ার সুযোগ থাকে। যেমন: সাংবাদিকতা বিভাগের একজন শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যম, জনসংযোগ, বিপণন, গবেষণা বা করপোরেট যোগাযোগ—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই কাজ করতে পারেন।
সেক্ষেত্রে ইন্টার্নশিপও সেই লক্ষ্য মাথায় রেখে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের এই অভিজ্ঞতাগুলো পরবর্তীতে চাকরির আবেদন বা সাক্ষাৎকারে কাজে লাগতে পারে। ভবিষ্যতে যেক্ষেত্রে কাজ করতে চান, সেক্ষেত্রের ইন্টার্নশিপ থাকলে সেটিকে প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা হিসেবে দেখানো সহজ হয়।
সিভিতে ফলাফলই সব নয়
ইন্টার্নশিপের জন্য আবেদন করতে গিয়ে অনেকেই ভাবেন, সিজিপিএ বা ফলাফলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বাস্তবে প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত আরও কিছু বিষয়ও দেখতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো প্রকল্প, ক্লাবের দায়িত্ব, স্বেচ্ছাসেবী কাজ, লেখালেখি, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ কিংবা অন্য কোনো সহশিক্ষা কার্যক্রমও সিভিতে জায়গা পেতে পারে। এগুলো একজন শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও কাজের অভ্যাস সম্পর্কে ধারণা দেয়।
আবেদন করার আগে প্রতিষ্ঠানটি সম্পর্কে জানুন
কোনো প্রতিষ্ঠানে আবেদন করার আগে তারা কী ধরনের কাজ করে, সেটি জানা জরুরি। একটি সংবাদমাধ্যম, বিজ্ঞাপনী সংস্থা বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ইন্টার্নের কাজ এক রকম হয় না। প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট, সাম্প্রতিক কাজ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ দেখে কিছুটা ধারণা নেওয়া যেতে পারে। এতে আবেদনপত্র লেখাও সহজ হয়, আবার সাক্ষাৎকারের সময়ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলা যায়।
শুধু বেতন দেখেই সিদ্ধান্ত নেবেন না
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে ইন্টার্নশিপ অনেকের প্রথম উপার্জনের অভিজ্ঞতা। তাই বেতনের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়াই স্বাভাবিক। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় শুধু বেতন নয়, কাজের ধরন, শেখার সুযোগ এবং কার সঙ্গে কাজ করার সুযোগ মিলবে, সেগুলোও বিবেচনায় রাখা দরকার। কয়েক মাসের একটি ইন্টার্নশিপ থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা অনেক সময় ভবিষ্যতের বড় সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে।
সিনিয়রদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগতে পারে
একটি প্রতিষ্ঠানে আগে কাজ করেছেন এমন কারও সঙ্গে কথা বললে অনেক বাস্তব তথ্য জানা যায়। কাজের পরিবেশ কেমন, ইন্টার্নদের কী ধরনের দায়িত্ব দেওয়া হয়, কাজের চাপ কতটা—এসব বিষয় চাকরির বিজ্ঞাপনে সব সময় লেখা থাকে না। তাই আবেদন করার আগে পরিচিত সিনিয়রদের সঙ্গে কথা বলা উপকারী হতে পারে।
সাক্ষাৎকারের প্রস্তুতি নিন
ইন্টার্নশিপের সাক্ষাৎকার মানেই কঠিন প্রশ্ন নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা হয় আবেদনকারী কতটা আগ্রহী, নতুন কিছু শেখার মানসিকতা আছে কি না এবং নিজেকে কতটা স্পষ্টভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। নিজের সিভিতে যা লিখেছেন, সেগুলো সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখা জরুরি। একইসঙ্গে কেন ওই প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চান, সে প্রশ্নের উত্তরও আগে থেকে ভেবে রাখা ভালো।
প্রত্যাখ্যান মানেই শেষ নয়
একটি আবেদন সফল না হওয়ার অর্থ এই নয় যে আপনি অযোগ্য। অনেক সময় একটি পদের জন্য শতাধিক আবেদন জমা পড়ে। ফলে সুযোগ না পাওয়ার পেছনে নানা কারণ থাকতে পারে। তাই একটি প্রত্যাখ্যানকে চূড়ান্ত ফল হিসেবে না দেখে পরের সুযোগের জন্য প্রস্তুতি নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম ইন্টার্নশিপ নিখুঁত নাও হতে পারে, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ
প্রথম কর্মদিবসে ভুল হতে পারে, কোনো দায়িত্ব বুঝতে সময় লাগতে পারে, এমনকি যে ক্ষেত্রটিকে খুব আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, সেখানে কাজ করে ভিন্ন অভিজ্ঞতাও হতে পারে। প্রথম ইন্টার্নশিপে সবকিছু পরিকল্পনামাফিক হবে—এমন প্রত্যাশা না রাখাই ভালো। তবু এই অভিজ্ঞতার গুরুত্ব কম নয়। অনেকের জন্য এটিই কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে প্রথম পরিচয়। ক্লাসরুমে শেখা বিষয়গুলো বাস্তবে কীভাবে কাজে লাগে, সেটি কাছ থেকে দেখার সুযোগ মেলে।
ইন্টার্নশিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো পেশাগত যোগাযোগ তৈরি করা। সহকর্মী, তত্ত্বাবধায়ক কিংবা একই প্রতিষ্ঠানের অন্য কর্মীদের সঙ্গে পরিচয় ভবিষ্যতে কাজে লাগতে পারে। চাকরির সুযোগ, পরামর্শ বা নতুন কোনো সম্ভাবনার খবর অনেক সময় এমন যোগাযোগ থেকেই আসে।
কিছু প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নদের কাজ মূল্যায়ন করে পরবর্তীতে খণ্ডকালীন বা পূর্ণকালীন চাকরির সুযোগও দেওয়া হয়। ফলে ইন্টার্নশিপকে শুধু কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কর্মক্ষেত্র হিসেবেও ভাবা যেতে পারে।
সবচেয়ে বড় কথা, প্রথম ইন্টার্নশিপ অনেক সময় নিজের পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দেয়। যে কাজটিকে দূর থেকে আকর্ষণীয় মনে হয়েছিল, সেটি বাস্তবে কেমন—সেটি বোঝা যায়। আবার কোনো ক্ষেত্র সম্পর্কে নতুন আগ্রহও তৈরি হতে পারে।
তাই প্রথম ইন্টার্নশিপ নিখুঁত না হলেও সেটি গুরুত্বপূর্ণ। এটি শুধু কর্মক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাই নয়, ভবিষ্যতের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্যও একটি ভিত্তি তৈরি করে।



