বিটিভির পর্দায় শিশুর রঙিন জগৎ সাজিয়েছিলেন যিনি
কাপড়ের একটা পুতুল, নাম বাঘা। চোখ দুটো বোতাম দিয়ে বানানো। আরেকটা পুতুল, মিনি—১৯৬০-৬১ সালের দিকে কলিম শরাফীর একটা ডকুমেন্টারিতে যাদের প্রথম দেখা যায়, তারপর টেলিভিশনের ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানে নিয়মিত হাজির। কালো-সাদা পর্দা। রঙ নেই কোথাও। কিন্তু লাখো শিশুর চোখে তখন এই দুটো পুতুলই রঙের একমাত্র উৎস।
যে মানুষ এদের মাঝে প্রাণ দিতেন, আজ সকালে স্কয়ার হাসপাতালে তিনি নিজেই থেমে গেলেন। মুস্তাফা মনোয়ার প্রয়াত হলেন ৯০ বছর বয়সে। নিউমোনিয়া, দুই সপ্তাহের আইসিইউ, ভেন্টিলেটর খোলা আর ফিরিয়ে দেওয়ার টানাপোড়েন শেষ হলো আজ।
পারুল নামটায় একটু থমকে যেতে হয়। সাত ভাই চম্পার সেই লোককথা—ঘুমিয়ে পড়া সাত ভাইকে জাগিয়েছিল একমাত্র বোন পারুল। মুস্তাফা মনোয়ার তার কেন্দ্রীয় পাপেট চরিত্রের নাম যখন রাখলেন পারুল, এটা নিছক নামকরণ ছিল না। শতবর্ষী লোককথার একটা জাগরণ-চরিত্রকে তিনি তুলে আনলেন টেলিভিশনের পর্দায়।
পারুল-বাঘা-মিনি যে মাটি থেকে উঠে এসেছিল, সেই মাটিটাও একটা গল্প। ১৯৩৫ সালে মাগুরার নাকোল গ্রামে জন্ম, কিন্তু শৈশব কাটে ঝিনাইদহের শৈলকূপার মনোহরপুর গ্রামে—কালী নদীর পাশে, খোলা মাঠ আর বিস্তৃত আকাশের মধ্যে। বাবা কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন একজন আলোকচিত্রী আর বইয়ের চিত্রকর, মেজ ভাই মুস্তাফা আজিজ আঁকতেন ছবি। ছয় ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোটজনের শিল্পে আকর্ষণ তৈরি হয় ঘরের ভেতর থেকেই। পরে কলকাতা চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয় থেকে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন তিনি, ১৯৫৯ সালে। এই বংশধারা আরও দূর গড়ায়—তার ভ্রাতুষ্পুত্র নাফিস বিন জাফর পরে অস্কারজয়ী অ্যানিমেটর হিসেবে পরিচিতি পান। কবিতা থেকে চিত্রকলা, চিত্রকলা থেকে পাপেট, পাপেট থেকে অ্যানিমেশন—একই পরিবারের ভেতর দিয়ে শিল্পের মাধ্যম বদলে গেছে প্রজন্মান্তরে, সুরটা থেকে গেছে অভিন্ন।
এই জাগরণের রাজনীতি তার জীবনে অনেক আগে থেকে লেখা। ১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র মুস্তাফা মনোয়ার ভাষা আন্দোলনের সমর্থনে কার্টুন আঁকেন। শাস্তি হয় কারাবরণ। কিশোর বয়সে শেখা এই পাঠ স্পষ্ট রূপ নেয় মুক্তিযুদ্ধের সময়। ১৯৭১-এ পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী শিবিরগুলোতে তিনি পাপেট প্রদর্শনী নিয়ে যান। ‘আগাছা’, ‘রাক্ষস’, ‘একজন সাহসী কৃষক’—এই শোগুলো দেখে আশ্রয়হীন মানুষ হাসত। হাসির ভেতরেই বার্তা ঢুকে যেত। যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের সামনে একটা কাপড়ের পুতুল কথা বলছে—এটা সান্ত্বনা ছিল, সংগঠিত মনোবলও ছিল তার ভেতরে। প্রবাসী সরকারের সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্বও তিনি দিয়েছেন তখন, ভারতে অবস্থানকালে, স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ার কাজে।
স্বাধীনতার পর তিনি ফিরে আসেন বাংলাদেশ টেলিভিশনে। এবার লড়াইটা ভিন্ন—শত্রু কোনো রাষ্ট্রশক্তি নয়, শিশুদের নিজের প্রতিভা নিয়ে দ্বিধা আর নীরবতা। ১৯৬৯ সালে ঢাকার শিশুদের নিয়ে একটা ছোট প্রতিযোগিতামূলক অনুষ্ঠান শুরু হয়। ১৯৭৬ সালে সেটাই রূপ নেয় ‘নতুন কুঁড়ি’তে, সারা বাংলাদেশের শিশুদের নিয়ে। উপমহাদেশের প্রথম জাতীয় শিশু-প্রতিযোগিতামূলক টেলিভিশন অনুষ্ঠান এটাই। নামটা নেওয়া তার বাবা কবি গোলাম মোস্তফার একটা কবিতা থেকে—‘আমরা নূতন, আমরা কুঁড়ি, নিখিল বন-নন্দনে’। বাবার পঙ্ক্তি, ছেলের প্রতিষ্ঠান। মাসুমা খাতুনের উপস্থাপনায়, কখনো নিজেই উপস্থাপক হয়ে, মুস্তাফা মনোয়ার এমন একটা মঞ্চ তৈরি করলেন যেখানে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটা শিশুও প্রথমবার নিজের প্রতিভা জাতীয় পরিসরে দেখার সুযোগ পায়।
এখানেই নস্টালজিয়ার আসল জায়গাটা। আজকের যে প্রজন্ম চল্লিশ-পঞ্চাশের ঘরে, তারা মনে করতে পারবে—একটা মাত্র টিভি সেট, পুরো পাড়ার শিশুরা মিলে একসঙ্গে বসা, বিদ্যুৎ চলে গেলে হাহাকার, আর তার মধ্যেই বাঘা-মিনির ওই সন্ধ্যার অপেক্ষা। ‘নতুন কুঁড়ি’ সরাসরি সম্প্রচার হতো, রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা ছিল না প্রথমদিকে—মানে একটা শিশু যেদিন গান গাইত বা আবৃত্তি করত, সেটা সেই একবারই দেখা যেত, আর সেই একবারের জন্যই সারা দেশ অপেক্ষা করত টিভি সেটের সামনে।
প্রতিযোগিতায় তিনজন বিচারক, নির্দিষ্ট কয়েকটা বিভাগ, অথচ এই ছোট আয়োজনের ভেতর দিয়েই একটা পুরো প্রজন্ম প্রথম বুঝতে শিখেছিল প্রতিভা দেখানোর একটা জাতীয় মঞ্চ থাকতে পারে তাদের জন্যও। যে শিশুটা গ্রামের স্কুলে গান গাইত শুধু সহপাঠীদের সামনে, সে-ও একদিন স্বপ্ন দেখতে পারত—তার গানও পৌঁছাতে পারে ঢাকার স্টুডিওতে। এই স্বপ্নের সম্ভাবনাটাই মুস্তাফা মনোয়ারের সবচেয়ে স্থায়ী উপহার। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই অনুষ্ঠান দেখে বড় হয়েছে, আর তাদের অনেকেই পরে নিজেরাই অভিনেতা, সংগীতশিল্পী বা চিত্রশিল্পী হয়ে উঠেছে—এই ধারাবাহিকতাই বলে দেয় একটা মঞ্চ কীভাবে গোটা একটা জাতির সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়ে দিতে পারে।
পাপেট আর ‘নতুন কুঁড়ি’র মধ্যে একটা সাধারণ সুতো আছে। দুটোই রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের কড়া কাঠামোর ভেতরে তৈরি। প্রচারণা-ভারী একটা প্রতিষ্ঠান, অথচ সেই কাঠামোকেই তিনি বাঁকিয়ে নিলেন শিশুর কল্পনার পক্ষে। বিটিভির উপমহাপরিচালক, শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালক, এফডিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক—এসব প্রশাসনিক চেয়ারে বসেও তিনি ভোলেননি তার প্রথম দর্শক কারা ছিল। ২০০৪ সালে রাষ্ট্র তাকে একুশে পদকে সম্মানিত করে, আর ২০২৩ সালে দ্য ডেইলি স্টার তাকে দেয় ‘মুক্তচিন্তার পথিক’ সম্মাননা। শিল্পী আর প্রশাসক, এই দুই পরিচয় তার ক্ষেত্রে কখনো একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়নি।
অসুস্থ অবস্থাতেও মুস্তাফা মনোয়ার তাদের একটা পাপেট শো দেখতে যেতেন। বয়স তখন আশির ওপর। শরীর আগের মতো নেই। কিন্তু পাপেটের প্রতি টান একই রকম তীব্র। উত্তরসূরিদের কাজ দেখার এই আগ্রহ বলে দেয়, পাপেট তার কাছে অতীতের গর্ব ছিল না—ছিল একটা চলমান প্রকল্প, যেটা তার প্রস্থানের পরেও চলবে।
আজ সেই প্রকল্পের কেন্দ্রে থাকা মানুষটা নিজেই থেমে গেলেন। কলকাতা থেকে ঢাকা, ভাষা আন্দোলনের জেল থেকে মুক্তিযুদ্ধের শরণার্থী শিবির, সেখান থেকে বিটিভির স্টুডিও—এই দীর্ঘ পথ শেষ হলো স্কয়ার হাসপাতালের আইসিইউতে। বাঘা আর মিনি অবশ্য থেমে যাবে না এত সহজে। পারুল জাগিয়েছিল সাত ভাইকে। মুস্তাফা মনোয়ার জাগিয়েছিলেন কয়েক প্রজন্মের কল্পনা, আর সেই জাগরণের রেশ রয়ে যাবে—যতদিন কোনো শিশু টেলিভিশনের পর্দায় একটা পুতুলকে কথা বলতে দেখে অবাক হবে।

