হরমুজ প্রণালিকে ‘মার্কিন ভূখণ্ড’ ঘোষণার হুমকি ট্রাম্পের
ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে পরে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ট্রাম্পের ওই মন্তব্য ছিল রসিকতা।
এএফপি জানিয়েছে, শুক্রবার নিউইয়র্কের গার্ডেন সিটিতে এক সমাবেশে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর তিনি ‘শিগগিরই’ হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন। এ সময় তিনি হাসতে হাসতে বলেন, ‘এটা সত্যি।’
ট্রাম্প আরও দাবি করেন, হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। তার ভাষ্য, ‘আমাদের অবরোধ রয়েছে। আমরা না চাইলে কোনো জাহাজ পার হতে পারবে না।’
তবে ট্রাম্পের বক্তব্যের জবাবে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গরিবাবাদি শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, হরমুজ প্রণালি ‘ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে।’
তিনি বলেন, ‘এই প্রণালি কেবল ইরানের নির্দেশেই খোলা ও বন্ধ হবে।’ যুক্তরাষ্ট্রকে উদ্দেশ করে গরিবাবাদি আরও বলেন, বাস্তবতা মেনে পরাজয় স্বীকার না করা পর্যন্ত ইরান প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখবে।
গরিবাবাদি বলেন, ‘একটি পোস্ট, বিমানবাহী রণতরি, কোনো আদেশ কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দখল করা যায় না।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল রপ্তানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।
জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার মাত্র কয়েকটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে। এর মধ্যে কোনো অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের চলাচল দেখা যায়নি। যুদ্ধের আগে প্রতিদিন ১৩০টিরও বেশি জাহাজ এই জলপথ অতিক্রম করত।
প্রণালিটি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো ইরানের হামলার ঝুঁকিতেও রয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রণালিটি অতিক্রমের সময় তাদের দুটি জাহাজ হামলার শিকার হয়। শুক্রবার আরও একটি জাহাজ হামলার শিকার হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
রয়টার্স বলছে, হরমুজ সংকটের প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় দাম দাঁড়ায় প্রায় ৪ দশমিক শূন্য ৮ ডলার, যা এক বছর আগের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। ট্রাম্প অবশ্য মার্কিন নাগরিকদের সংঘাত চলাকালে কিছুটা বেশি দামে জ্বালানি কেনার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন।
সমাবেশে তিনি বলেন, ‘পেট্রলের জন্য সামান্য বেশি দাম দেওয়া’ গ্রহণযোগ্য, যদি এর বিনিময়ে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে বিরত রাখা যায়।
হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ থাকায় শুক্রবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামও বেড়েছে। ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) উভয় ধরনের তেলের দাম সপ্তাহে যথাক্রমে প্রায় ৬ শতাংশ ও ৫ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ার পথে ছিল।
এদিকে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আলোচনা পুনরায় শুরুরও কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলেও তা কোনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা নয় বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম।
এর মধ্যে ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প ও মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞাকে দায়ী করেছেন।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনার পাশাপাশি ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতিদের হামলাও আঞ্চলিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়িয়েছে। ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার জানিয়েছে, শুক্রবার হুতিরা লোহিত সাগরের বন্দর মোখায় ছয়টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। এতে চারজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।