মায়ের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে যেসব উৎকণ্ঠা
রাত তখন প্রায় দেড়টা। বাসার সবাই ঘুমিয়ে গেছে। রান্নাঘরের সিংকে এখনো একটা কাপ পড়ে আছে। ফ্রিজের দরজা খুলে এক মা চুপচাপ দেখছেন, সকালে সন্তানের জন্য রাখা দুধ আছে কি না। তারপর ধীরে ধীরে তিনি ছেলের স্কুলব্যাগটা খুলে দেখেন, হোমওয়ার্ক ঠিকমতো গুছানো হয়েছে কি না।
কেউ তাকে এটা করতে বলেনি। কেউ দেখছেও না। তবু পৃথিবীর অসংখ্য মা এমন কিছু কাজ প্রতিদিন করে যান, যেগুলোর পেছনে থাকে এক ধরনের না বলা ভয়।
মায়েদের ভয় নিয়ে খুব কম কথা হয়। আমরা তাদের ত্যাগ নিয়ে কথা বলি, রান্না নিয়ে কথা বলি, ভালোবাসা নিয়ে কথা বলি। কিন্তু একজন মা ভেতরে ভেতরে কী নিয়ে ভয় পান, সেটা খুব কম মানুষ জানতে চান।
কারণ সমাজ মায়েদের সবসময় শক্ত দেখতে অভ্যস্ত। মা মানেই যেন এমন একজন মানুষ, যিনি ভাঙবেন না, ক্লান্ত হবেন না, ভয় পাবেন না। অথচ অনেক মা প্রতিদিন ভয় নিয়েই ঘুমাতে যান।
একজন মা হয়তো সন্তানের ঘরের বাতি নিভিয়ে দেওয়ার সময় হঠাৎ ভাবেন, ‘আমি যদি হঠাৎ না থাকি?’ এই প্রশ্নটা খুব নীরব। কিন্তু ভয়ংকর গভীর। অনেক মা জানেন, সংসারের অসংখ্য ছোট ছোট জিনিস তাদের হাতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সন্তানের ওষুধ কোথায় রাখা, কার কোন খাবারে অ্যালার্জি, পরীক্ষার তারিখ, ঘুমের অভ্যাস, মন খারাপের ধরন—সবকিছু তারা অদ্ভুত নিখুঁতভাবে মনে রাখেন। তাই মাঝেমধ্যে তাদের মনে হয়, ‘আমাকে ছাড়া এরা কি ঠিকমতো চলতে পারবে?’
এই ভয়টা শুধু মৃত্যুর ভয় নয়।এটা হারিয়ে যাওয়ার ভয়।নিজের প্রয়োজনীয়তা একদিন ফুরিয়ে যাওয়ার ভয়।
অনেক মা ভয় পান, সন্তান বড় হয়ে দূরে সরে যাবে। ছোটবেলায় যে সন্তানটা বৃষ্টির রাতে মায়ের গা ঘেঁষে ঘুমাতো, একসময় সে-ই আলাদা ঘরে চলে যায়। তারপর একদিন ব্যস্ত হয়ে পড়ে নিজের জীবন নিয়ে। ফোন কমে যায়। কথা ছোট হয়ে আসে।
-খেয়েছ?
-হুম।
-শরীর ঠিক আছে?
-হ্যাঁ।
কথোপকথন শেষ।
ফোন রেখে দেওয়ার পর অনেক মা কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর ধীরে ধীরে ফোনটা উল্টো করে রাখেন। বাসার ভেতর তখন অদ্ভুত চুপচাপ লাগে। অনেক মা এই নীরবতাকে ভয় পান। বিশেষ করে যেসব মা পুরো জীবন সন্তানকে ঘিরে কাটিয়েছেন, তাদের কাছে এই পরিবর্তন খুবই কঠিন।
ষাট বছর বয়সী মাহমুদা খাতুন দুই ছেলের মা। মাস্টার্স শেষ করার পর বিয়ের আগে ব্র্যাক-এ চাকরি করতেন। পরে সংসার, সন্তান আর নানা বাস্তবতায় চাকরি আর চালিয়ে যাওয়া হয়নি। স্বামী ব্যস্ত থাকতেন, আত্মীয়দের সহায়তাও তেমন ছিল না। ফলে দুই সন্তানকে প্রায় একাই বড় করেছেন তিনি। এগারো বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর দায়িত্ব আরও বেড়ে যায়। এখন ছেলেরা বড় হয়েছে, তবু তাদের নিয়ে চিন্তা কমেনি। নিজেও খুব একটা বাসার বাইরে যান না।
মাহমুদা খাতুন বলেন, ‘আমার পুরো জীবনটাই ছেলেদের ঘিরে চলে গেছে। কখন কার কোন পরীক্ষা, কার কী খেতে ভালো লাগে, কার শরীর খারাপ হলে কোন ওষুধ লাগে—সব আমি একাই সামলেছি। ওদের বাবা মারা যাওয়ার পর তো আরও বেশি ভয় কাজ করত। মনে হতো, আমাকে ভেঙে পড়লে চলবে না। এখনো রাতে ঘুমানোর আগে দেখি ওরা ঠিকমতো খেয়েছে কি না। ছেলেরা বাসায় ফিরতে বেশি দেরি করলে অস্থির লাগে। ওরা বড় হয়ে গেছে, আমি জানি। তবু মায়ের মনটা তো বদলায় না। শুধু একটা জিনিস বদলেছে—আগে বাসায় অনেক শব্দ ছিল, এখন অনেক চুপচাপ লাগে। মাঝেমধ্যে মনে হয়, নিজের জন্য আলাদা কোনো জীবন ছিল কি না, সেটাই যেন ভুলে গেছি।’
একসময় যে ঘরে সারাক্ষণ শব্দ ছিল, সেই ঘরেই হঠাৎ দুপুরগুলো দীর্ঘ হয়ে যায়। ডাইনিং টেবিলে খাবার বাড়তে গিয়ে মনে পড়ে, এখন আর চারটা প্লেট লাগে না।
অনেক মায়ের সবচেয়ে গোপন ভয় হল, তারা হয়তো ভালো মা হতে পারেননি। এই ভয়টা তারা কাউকে বলেন না। সন্তান অসুস্থ হলে তারা নিজের ভুল খোঁজেন। সন্তান চুপচাপ হয়ে গেলে ভাবেন, ‘আমি কি ওকে ঠিকমতো বুঝিনি?’
পরীক্ষায় খারাপ করলে, সম্পর্কে ভেঙে পড়লে, মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে গেলে অনেক মা নিঃশব্দে নিজেদের দায়ী করেন।
পরিহাসের ব্যাপার হলো, সমাজ মায়েদের সবকিছুর জন্য দায়ী করতে খুব পছন্দ করে। সন্তান ভালো করলে বলা হয়, ‘মায়ের শিক্ষার ফল।’ আবার সন্তান বিপথে গেলেও প্রথম প্রশ্নটা মাকেই করা হয়। ফলে অনেক মা সারাজীবন এক ধরনের অদৃশ্য অপরাধবোধ বয়ে বেড়ান।
‘ইয়োর থেরাপিস্ট’-এর ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট আসিফ উজ জামান রোনাস এ ব্যাপারে বলেন, ‘আমাদের সমাজে মায়েদের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য মানসিক চাপ কাজ করে। তারা মনে করেন, সন্তানের জীবনে কোনো সমস্যা হলে তার দায়ও হয়তো তাদের। এ কারণে অনেক মা দীর্ঘদিন গিল্ট, অ্যাংজাইটি ও ইমোশনাল এক্সহস্টশনের মধ্যে থাকেন।কিন্তু বেশিরভাগ সময় তারা নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করেন না, কারণ ছোটবেলা থেকেই তাদের শেখানো হয়—মাকে সবসময় শক্ত থাকতে হয়।’
কিছু ভয় আরও ব্যক্তিগত। অনেক মা আয়নায় নিজেদের বদলে যাওয়া চেহারা দেখতে ভয় পান। একসময় যিনি নিজের জন্য বই কিনতেন, সাজতেন, বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতেন, তিনি ধীরে ধীরে শুধু ‘কারও মা’ হয়ে যান। তারপর একদিন হঠাৎ পুরোনো কোনো ছবি দেখে থমকে যান। মনে হয়, ‘এই মেয়েটা কি সত্যিই আমি ছিলাম?’ এই প্রশ্নটা খুব নিঃশব্দে মানুষকে ভেঙে দেয়।
বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারে এখনো মায়ের ক্লান্তিকে আলাদা করে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। জ্বর নিয়েও রান্না করা, শরীর খারাপ নিয়েও অতিথি সামলানো, নিজের চিকিৎসা পিছিয়ে দেওয়া—এসব যেন স্বাভাবিক দায়িত্বের অংশ। ফলে অনেক মা নিজের অসুখ নিয়েও কথা বলতে ভয় পান। কারণ তারা জানেন, তারা বিছানায় পড়ে গেলে পুরো সংসারের ছন্দের পতন হবে।
তাই মাঝরাতে বুক ধড়ফড় করলেও তারা পানি খেয়ে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করেন। হাঁটুর ব্যথা বাড়লেও কাউকে বলেন না। রিপোর্ট হাতে পেয়েও অনেক সময় লুকিয়ে রাখেন।কারণ মা অসুস্থ হলে অনেক পরিবার ভয় পেয়ে যায়।
আবার কিছু মায়ের ভয় পুরোপুরি মানসিক। তারা ভয় পান, নিজের রাগ একদিন সন্তানের মনে ক্ষত তৈরি করবে। ভয় পান, নিজের জীবনের অপূর্ণতা অজান্তেই সন্তানের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন কি না। ভয় পান, তারা যেভাবে কষ্ট পেয়ে বড় হয়েছেন, সেই কষ্টগুলো আবার সন্তানের জীবনে ফিরে আসছে কি না।
কারণ মাও তো মানুষ। তারও ট্রমা থাকে। অপূর্ণতা থাকে। হতাশা ও ক্লান্তি থাকে। কিন্তু সমাজ মায়ের মানবিক দুর্বলতা দেখতে খুব একটা অভ্যস্ত নয়। তাই অনেক মা কান্নাটাও লুকিয়ে ফেলতে শিখে যান। কখনো বাথরুমের ভেতর, কখনো নামাজের পরে মোনাজাতে, কখনো সবাই ঘুমিয়ে যাওয়ার পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে তারা কাঁদেন।
অনেক মা আবার ভয় পান একাকীত্বকে। সন্তান যখন অন্য শহরে চলে যায়, বিদেশে চলে যায় বা নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন অনেক মা নতুন এক নীরব জীবনের মুখোমুখি হন।
সকালে আর কেউ তাড়া দিয়ে বলে না, ‘আমার শার্টটা কোথায়?’ রাতে আর কেউ এসে বলে না, ‘মা, একটু চা বানাবে?’ ঘড়ির টিকটিক শব্দও তখন অনেক জোরে শোনা যায়। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এই ভয়গুলোর বেশিরভাগই তারা একা বহন করেন। কারণ তারা জানেন, পরিবারে তাদের ভেঙে পড়ার সুযোগ খুব কম। মা যদি ভয় পায়, তাহলে বাকিরা সাহস পাবে কোথা থেকে—এই অদৃশ্য চাপটা অনেক মা সারাজীবন বয়ে বেড়ান।
অথচ একজন মায়ের খুব বেশি কিছু লাগে না। তারা চান শুধু কেউ মন দিয়ে জিজ্ঞেস করুক, ‘তুমি কেমন আছ?’ কেউ বলুক, ‘সবসময় এত শক্ত থাকতে হবে না।’ কেউ তার ভয়গুলোকে হাসি দিয়ে উড়িয়ে না দিক। কারণ যিনি সবার ভয় কমানোর চেষ্টা করেন, তার নিজের ভেতরেও অনেক না-বলা আতঙ্ক জমে থাকে।
হয়তো আজ রাতেও কোনো মা সন্তানের ঘরের দরজা আস্তে করে বন্ধ করে দেবেন। যাওয়ার আগে একবার তাকিয়ে দেখবেন, ঘুম ঠিকমতো হয়েছে কি না। তারপর অন্ধকার ঘরে ফিরে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়বেন। আর কেউ জানবেও না, ঘুমিয়ে পড়ার আগে তিনি ঠিক কতগুলো ভয় বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিলেন।