বিশ্বের সবচেয়ে শীতল ১০ শহর

মাহমুদ নেওয়াজ জয়
মাহমুদ নেওয়াজ জয়

শীত কারও কাছে আরামের, কারও কাছে রোমান্টিক, আবার কারও কাছে টিকে থাকার পরীক্ষা। আমাদের দেশে শীত মানে সকালে কুয়াশা, গরম চা আর লেপ-কম্বলের আলস্য। কিন্তু পৃথিবীর কিছু শহরে শীত কোনো সাময়িক ঋতু নয়, নিয়ম। শীতই সেখানে বাস্তবতা।

বিশ্বে এমন শহরও আছে, যেখানে বছরের বড় অংশজুড়ে তাপমাত্রা শূন্যের অনেক নিচে থাকে। যেখানে নিশ্বাস নিলেই বুকের ভেতর ঠান্ডা ঢুকে পড়ে।

এই লেখায় থাকছে বিশ্বের এমন ১০টি শহরের গল্প—যেখানে শীত শুধু একটি ঋতু নয়, বরং এর তীব্রতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াই সেখানে জীবনযাপনের প্রধান শর্ত।

১. ইয়াকুতস্ক, রাশিয়া

ইয়াকুতস্ককে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে শীতল বড় শহর। রাশিয়ার সাইবেরিয়া অঞ্চলে অবস্থিত এই শহরে শীতকালে তাপমাত্রা প্রায়ই ঋণাত্মক (মাইনাস) ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে যায়। জানুয়ারি মাসে এখানে বাইরে বের হওয়া মানেই ঝুঁকি নেওয়া। কয়েক মিনিটেই ত্বক জমে যেতে পারে।

এই শহরে ঘরবাড়ি তৈরি হয় বিশেষ কৌশলে। মাটির ভেতর বরফ জমে থাকায় ভবনের পিলার অনেক সময় মাটির ওপরে বসানো হয়। মানুষের দৈনন্দিন জীবন, পোশাক, খাবার—সবকিছুই শীতের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ফল।

২. নোরিলস্ক, রাশিয়া

নোরিলস্ক সাইবেরিয়ার আরেক শীতল শহর, তবে ইয়াকুতস্কের চেয়ে এটি আরও কঠিন পরিবেশের জন্য পরিচিত। এখানে শুধু তীব্র শীতই নয়, দীর্ঘ সময় সূর্যালোকের অভাবও মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে। শীতকালে তাপমাত্রা নিয়মিত ঋণাত্মক ৩০ ডিগ্রির নিচে থাকে। বছরের বড় একটা সময় আকাশ ধূসর, রাস্তা বরফে ঢাকা। তবুও শিল্পকারখানা, খনি আর মানুষের কর্মব্যস্ততা থেমে থাকে না।

৩. উলানবাটর, মঙ্গোলিয়া

মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটর বিশ্বের সবচেয়ে শীতল রাজধানী শহর হিসেবে পরিচিত। পাহাড়বেষ্টিত এই শহরে শীতের সময় ঠান্ডা বাতাস আটকে যায়, ফলে তাপমাত্রা আরও কমে যায়। শীতকালে এখানে ঋণাত্মক ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। শহরের মানুষ মোটা পোশাক, কয়লাভিত্তিক হিটার আর ঐতিহ্যবাহী জীবনযাপনের মাধ্যমে এই শীত মোকাবিলা করে। রাজধানী হয়েও উলানবাটরের শীত আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে।

৪. ইয়েলোনাইফ, কানাডা

ইয়েলোনাইফ কানাডার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের একটি শহর, যেখানে শীত দীর্ঘ এবং নির্দয়। শীতকালে তাপমাত্রা ঋণাত্মক ৩০ ডিগ্রির কাছাকাছি নেমে যায়, আর চারপাশ ঢেকে যায় বরফে। তবে এই শহরের শীত শুধু কষ্টের নয়, সৌন্দর্যেরও। বরফে জমে থাকা লেক, পরিষ্কার আকাশ আর নর্দার্ন লাইটস ইয়েলোনাইফকে অনন্য করে তোলে। মানুষ এখানে প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান করেই বেঁচে থাকে।

৫. উটকিয়াগোভিক, আলাস্কা

আলাস্কার একেবারে উত্তর প্রান্তে অবস্থিত উটকিয়াগোভিক শহরটি শীত আর অন্ধকারের জন্য বিখ্যাত। বছরের বড় একটা সময় এখানে সূর্যের আলো দেখা যায় না। শীতকালে তাপমাত্রা ঋণাত্মক ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। এই শহরে জীবন মানেই সীমিত আলো, তীব্র ঠান্ডা আর প্রকৃতির ওপর নির্ভরতা। তবুও এখানকার মানুষ এই পরিবেশকে আপন করে নিয়েছেন।

৬. ফেয়ারব্যাঙ্কস, আলাস্কা

ফেয়ারব্যাঙ্কস আলাস্কার ভেতরের অঞ্চলে অবস্থিত একটি শহর, যেখানে শীত ভয়ংকর হলেও জীবন তুলনামূলকভাবে সক্রিয়। শীতকালে এখানে তাপমাত্রা ঋণাত্মক ২০ থেকে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত নামতে পারে। এই শহরে মানুষ শীতকে উৎসবে রূপ দিয়েছে। বরফ উৎসব, শীতকালীন খেলাধুলা আর নর্দার্ন লাইটস দেখার আয়োজন ফেয়ারব্যাঙ্কসকে প্রাণবন্ত রাখে।

৭. হারবিন, চীন

চীনের হারবিন শহর শীতের সঙ্গে আনন্দকে মিশিয়ে নিয়েছে। শীতকালে তাপমাত্রা ঋণাত্মক ২০ ডিগ্রির নিচে নেমে গেলেও শহর যেন আরও জীবন্ত হয়ে ওঠে। বিশাল বরফের ভাস্কর্য, আলোয় সাজানো আইস সিটি আর উৎসবের আবহ হারবিনকে আলাদা করে তোলে। এখানে শীত শুধু সহ্য করার বিষয় নয়—উদযাপনেরও নাম।

৮. আস্তানা, কাজাখস্তান

কাজাখস্তানের এই শহরটি খোলা প্রান্তরের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। ফলে শীতকালে ঠান্ডা বাতাস বাধাহীনভাবে শহরের ওপর আছড়ে পড়ে। তাপমাত্রা প্রায়ই ঋণাত্মক ১৫ থেকে ২৫ ডিগ্রির নিচে নেমে যায়। আধুনিক স্থাপত্য আর প্রশস্ত রাস্তার মাঝেও শীত আস্তানার জনমানুষের জীবনে গভীর ছাপ ফেলে।

৯. ইন্টারন্যাশনাল ফলস, যুক্তরাষ্ট্র

মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের ইন্টারন্যাশনাল ফলস শহরটি যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শীতল শহরগুলোর একটি। শীতকালে তাপমাত্রা নিয়মিত ঋণাত্মক ১৫ ডিগ্রির নিচে থাকে। এই শহরে শীতকে ভয় নয়, বরং পরিচয়ের অংশ হিসেবে দেখা হয়। এখানকার মানুষ শীতের সঙ্গে অভ্যস্ত, শীতই তাদের জীবনধারা গড়ে দিয়েছে।

১০. ট্রমসা, নরওয়ে

নরওয়ের আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত ট্রমসা শহরটি পরিচিত 'আর্কটিকের রাজধানী' নামে। শীতকালে এখানে তাপমাত্রা সাধারণত ঋণাত্মক ১০ থেকে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, তবে তীব্র বাতাসের কারণে ঠান্ডা আরও বেশি অনুভূত হয়।

বছরের একটি বড় সময় সূর্য ওঠে না—এ সময়কে বলা হয় পোলার নাইট। নর্দার্ন লাইটস দেখা, শীতকালীন পর্যটন ও সমুদ্রনির্ভর জীবনযাপন এই শহরকে শীতের মাঝেও সক্রিয় ও জীবন্ত রাখে।