জুতার সাইজ থেকে কণ্ঠস্বর: বয়স বাড়ছে বুঝবেন যেভাবে
হঠাৎ খেয়াল করলেন, আগের জুতা জোড়া আর ঠিকমতো ফিট হচ্ছে না। শক্ত মেঝেতে খালি পায়ে হাঁটলেও লাগছে অস্বস্তি। আবার খাবারে আগের মতো স্বাদ পাচ্ছেন না। কিংবা কণ্ঠস্বরেও এসেছে পরিবর্তন।
এগুলো কি বয়স বাড়ার লক্ষণ?
ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটানোর সঙ্গে বয়স বাড়ে। আর বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরেও নানা পরিবর্তন আসতে পারে। এর কিছু পরিবর্তন খুব ধীরে ঘটে, তাই অনেক সময় সেগুলো আমাদের চোখে পড়ে না।
পায়ের গঠন, ত্বক, ব্যায়ামের সময় হৃৎস্পন্দন, স্বাদ, কণ্ঠস্বর—এমনকি মাইগ্রেনের উপসর্গেও বয়সের সঙ্গে পরিবর্তন আসতে পারে।
নিউইয়র্ক টাইমসের এক ফিচার প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে এমন কয়েকটি পরিবর্তনের কথা তুলে ধরা হয়েছে।
বদলে যেতে পারে পায়ের আকার
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পায়ের আকারের পরিবর্তনগুলোকে স্বাভাবিক বলে আখ্যা দিয়েছেন টেম্পল ইউনিভার্সিটি স্কুল অব পডিয়াট্রিক মেডিসিনের সহকারী ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক ড. সাবরিনা মিনহাস।
ড. মিনহাস জানান, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পায়ের আর্চ ধরে রাখা লিগামেন্ট, টেনডন ও পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। ফলে ধীরে ধীরে পায়ের আর্চ নিচের দিকে নেমে আসে। এতে করে আমাদের পা লম্বা ও চওড়া হয়ে যেতে পারে। আর এ কারণেই বড় সাইজের জুতা প্রয়োজন হতে পারে।
পরবর্তী জীবনে ওজন বেড়ে যাওয়া বা গর্ভধারণের কারণেও পায়ের আর্চ নিচে নেমে যেতে পারে বলে জানান ড. মিনহাস।
ড. মিনহাসের ভাষায়, ১৫ বছর আগের পছন্দের জুতার প্রতি অতিরিক্ত আবেগ না রাখাই ভালো।
সমতল জায়গায় হাঁটতে গিয়ে পায়ে ব্যথার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোড়ালি ও পায়ের সামনের অংশের নিচে থাকা চর্বির স্তর কমে যেতে থাকে এবং হাড়কে আঘাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে এগুলো আর আগের মতো কার্যকর থাকে না। আমার কাছে চিকিৎসা নিতে আসা বয়স্ক রোগীদের পায়ে চর্বির পরিমাণ খুবই কম থাকে। শক্ত মেঝেতে খালি পায়ে হাঁটলে তাদের মনে হয় যেন সরাসরি হাড়ে আঘাত লাগছে, মনে হচ্ছে পাথরের ওপর হাঁটছেন।’
এ কারণে বাড়িতে ভালো সাপোর্টযুক্ত স্লিপার বা স্যান্ডেল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
তবে জুতার সাইজ বদলে যাওয়া বা পায়ে ব্যথা হওয়া সবসময় বয়স বাড়ার স্বাভাবিক ফল নয়। দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
ত্বকে বাড়তে পারে শুষ্কতা ও চুলকানি
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ত্বক শুষ্ক ও পাতলা হয়ে যায়। ছোট ছোট ফাটলও তৈরি হতে পারে ত্বকে। এর ফলে প্রদাহ ও চুলকানি দেখা দিতে পারে বলে জানিয়েছেন মায়ো ক্লিনিকের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ এবং রিজেনারেটিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. সারানইয়া ওয়াইলস।
আমেরিকান একাডেমি অব অ্যালার্জি, অ্যাজমা অ্যান্ড ইমিউনোলজির মতে, বয়স্ক ব্যক্তিদের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার অন্যতম সাধারণ কারণ হলো ত্বকে চুলকানি।
টাকসনের ইউনিভার্সিটি অব অ্যারিজোনার কলেজ অব মেডিসিনের ইনফ্ল্যামেটরি অ্যান্ড এজিং স্কিন রিসার্চ প্রোগ্রামের পরিচালক ড্যানিয়েল বাটলার বলেন, ‘আমার কিছু রোগীর এতটাই অস্বস্তিবোধ হয় যে, তারা রাতে ঘুমাতে পারেন না।’
ত্বকের শুষ্কতা কমাতে গরম পানির বদলে কুসুম গরম পানিতে গোসল করার পরামর্শ দিয়েছেন ডা. ওয়াইলস। তার মতে, অতিরিক্ত গরম পানি ত্বকের প্রাকৃতিক তেল কমিয়ে দিতে পারে।
গোসলের পরপরই ময়েশ্চারাইজার ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। সিরামাইড ও কলোয়েডাল ওটমিলের মতো ত্বক প্রশমিতকারী উপাদানযুক্ত পণ্য ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ও প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি নিয়ে করা গবেষণায় বাটলার দেখেছেন, এর কারণগুলো ত্বকের ক্ষতিগ্রস্ত সুরক্ষা স্তর, রোগপ্রতিরোধী ব্যবস্থা ও ত্বকের নিচের স্নায়ুতন্ত্রের জটিল পারস্পরিক ক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত।
বয়স বাড়ার সঙ্গে এসব উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত হয় বলে গবেষণায় খুঁজে পান তিনি।
বাটলার বলেন, ‘দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি, অর্থাৎ ছয় সপ্তাহ বা তার বেশি সময় ধরে চুলকানি থাকলে চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ সহায়তা করতে পারেন।’
ডা. ওয়াইলস বলেন, ‘কোনো ধরনের ফুসকুড়ি ছাড়াই চুলকানি হলে সেটা দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ বা লিভারের রোগের মতো কিছু শারীরিক সমস্যার লক্ষণও হতে পারে।’
ব্যায়ামে সর্বোচ্চ হৃৎস্পন্দন কমতে পারে
বিশ্রামের সময় হৃৎস্পন্দনের হার বয়স বাড়ার সঙ্গে সাধারণত খুব বেশি বদলায় না। তবে শারীরিক পরিশ্রমের সময় সর্বোচ্চ হৃৎস্পন্দনের হার কমে যেতে পারে।
মাস জেনারেল ব্রিগহাম হার্ট অ্যান্ড ভাসকুলার ইনস্টিটিউটের কার্ডিওভাসকুলার পারফরম্যান্স প্রোগ্রামের পরিচালক ও হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. জেমস সাওয়াল্লা গুসেহ জানান, এর সুনির্দিষ্ট কারণ পুরোপুরি জানা যায়নি।
তার মতে, হৃদযন্ত্রের প্রাকৃতিক পেসমেকার সাইনাস নোড বয়সের সঙ্গে ধীর হয়ে যেতে পারে। একইসঙ্গে স্নায়ুতন্ত্র থেকে পাওয়া সংকেতের প্রতি হৃদযন্ত্রের সাড়া দেওয়ার ক্ষমতাও কমে যেতে পারে।
তবে ব্যায়ামের সময় হৃৎস্পন্দনে হঠাৎ বা অজানা পরিবর্তন, শ্বাসকষ্ট অথবা একই মাত্রার পরিশ্রমে হৃৎস্পন্দন অস্বাভাবিকভাবে বেশি মনে হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
কমে যেতে পারে স্বাদ
বয়সের সঙ্গে সঙ্গে খাবারের স্বাদবোধেও আসতে পারে পরিবর্তন। ইদানীং খেতে বসলে লবণের কৌটা খুঁজছেন কিংবা একই তরকারি আগের চেয়ে কম ঝাল লাগছে?
পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পেরেলম্যান স্কুল অব মেডিসিনের জেরিয়াট্রিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ও অধ্যাপক ডা. লিসা ওয়ালকে বলেন, ‘বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক সময় আমাদের স্বাদের অনুভূতি কমে যেতে পারে।’
২০২৫ সালের একটি গবেষণায় ১০ থেকে ৯৪ বছর বয়সী ১ হাজার ৩৯২ জন সুস্থ মানুষের স্বাদ গ্রহণের ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় বয়সের সঙ্গে স্বাদ বোঝার ক্ষমতায় পরিবর্তন দেখা যায়, বিশেষ করে ৬০ বছরের পর তা আরও স্পষ্ট হয়।
তবে খাবারের স্বাদ কমে গেলে অতিরিক্ত লবণ যোগ করাই সমাধান নয় বলে সতর্ক করেছেন ডা. ওয়ালকে। বিশেষ করে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে অতিরিক্ত লবণ ক্ষতিকর হতে পারে।
স্বাদ বাড়াতে হার্ব ও মসলা, লেবু কিংবা লবণের বিকল্প ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
বদলে যেতে পারে কণ্ঠস্বর
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোকাল কর্ড বা স্বরযন্ত্রের তারগুলো প্রায়ই পাতলা ও কম নমনীয় হয়ে যায় এবং আগের মতো শক্তভাবে বন্ধ নাও হতে পারে বলে জানিয়েছেন ইউটি সাউথওয়েস্টার্ন মেডিকেল সেন্টারের ভয়েস সেন্টারের পরিচালক ডা. টেড মাও। যার ফলে কণ্ঠস্বর দুর্বল বা কর্কশ হয়ে যেতে পারে।
ডা. মাও বলেন, ‘বয়স বৃদ্ধি পুরুষ ও নারীর কণ্ঠস্বরকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিছু পুরুষের কণ্ঠস্বরের পিচ বা স্বরের উচ্চতা বেড়ে যেতে পারে। গম্ভীর ও দরাজ গলার পুরুষদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কণ্ঠ আর তেমনটা নাও শোনাতে পারে। অন্যদিকে, বয়স্ক নারীদের হরমোনগত পরিবর্তনের কারণে কণ্ঠস্বর আরও নিচু হয়ে যেতে পারে।’
হঠাৎ কণ্ঠস্বরের এই পরিবর্তন যদি কারো সুস্থতা বা স্বাচ্ছন্দ্যের ওপর প্রভাব ফেলে, তবে নাক, কান ও গলা বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
কমে যেতে পারে নারীদের মাইগ্রেন
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মাইগ্রেনে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা দুই থেকে তিন গুণ বেশি। এমনকি নারীদের মাইগ্রেনের সমস্যা বেশি ঘন ঘন ও দীর্ঘস্থায়ী হয়।
তবে, মেনোপজ শেষে নারীদের মাইগ্রেনের সমস্যা কমে যেতে পারে বলে জানান পেন মেডিসিনের নিউরোলজিস্ট সেনিহা নুর ওজুদোগরু।
তিনি বলেন, ‘বেশিরভাগ নারী জানান, তাদের মাইগ্রেনের সমস্যা ভালো হয়ে যায় কিংবা এর তীব্রতা কমে যায়। এমনকি তাদের আর মাইগ্রেনের সমস্যা নাও হতে পারে।’
বয়সের সঙ্গে মাইগ্রেনের ধরনও বদলাতে পারে। মাথাব্যথা বা বমিভাবের মতো তীব্র উপসর্গ ছাড়াও মাইগ্রেন দেখা দিতে পারে। এমনকি ব্যথার তীব্রতা আগের তুলনায় কম হতে পারে বলে জানান ডা. ওজুদোগরু।
সব পরিবর্তনই বয়সের কারণে নয়
শরীরে পরিবর্তন আসা বয়স বৃদ্ধির স্বাভাবিক অংশ। তবে কোনো একটি উপসর্গ দেখা দিলেই সেটিকে বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী চুলকানি, অস্বাভাবিক হৃৎস্পন্দন, শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ কণ্ঠস্বর বদলে যাওয়া বা পায়ে স্থায়ী ব্যথার মতো উপসর্গ থাকলে এর পেছনে অন্য কোনো শারীরিক কারণও থাকতে পারে।
তাই শরীরের পরিবর্তনগুলোকে বয়সের স্বাভাবিক ছাপ হিসেবে দেখার পাশাপাশি কোন পরিবর্তন স্বাভাবিক আর কোনটির ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।


