শিশুরা কেন সবজি খেতে চায় না? গবেষণায় জানা গেল যেসব কারণ

স্টার অনলাইন ডেস্ক

রাতের খাবারের টেবিলে পাঁচ বছরের আয়ানকে নিয়ে বসেছেন তার মা। প্লেটে ভাত, ডাল, মুরগির ঝোল আর মিক্স সবজি। মা ভাতের সঙ্গে একটু সবজি মিশিয়ে মুখের কাছে এগিয়ে দিতেই আয়ান মুখ ফিরিয়ে নিল।

বলল, ‘সবজি খাব না। শুধু চিকেন খাব।’

মা এবার মুরগির টুকরো দিলেন। আয়ান সঙ্গে সঙ্গে খেয়ে নিল। কিন্তু গাজর, বরবটি আর মটরশুঁটি আঙুল দিয়ে আলাদা করে প্লেটের এক পাশে সরিয়ে রাখল।

প্রায় প্রতিদিনই একই ঘটনা। আয়ানের মা দুশ্চিন্তায় পড়ে যান—বাচ্চাটা যদি শাক-সবজি না খায়, তবে তার পুষ্টি হবে কীভাবে?

বাংলাদেশের অনেক পরিবারে খাবারের টেবিলে মা ও শিশুর এমন দৃশ্যটি এখন স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে। মা-বাবা চান সন্তান মাছ, ডাল, ভাতের পাশাপাশি পর্যাপ্ত সবজি খাওয়াতে। কিন্তু শিশুর পছন্দের তালিকায় থাকে—ডিম, ফ্রাইড চিকেন, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই কিংবা চিপস, বিস্কুট।

সমস্যাটা শুধু শিশুর ‘জেদ’ নয়, কোন বয়সে কীভাবে সবজির সঙ্গে শিশুর পরিচয় করানো হচ্ছে, খাবার কীভাবে পরিবেশন করা হচ্ছে, বাবা-মা নিজেরা কী খাচ্ছেন—এসবের প্রভাব রয়েছে শিশুর খাদ্যাভ্যাসে।

২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে ৬ হাজার ৬৬৮ শিশুর ওপর গবেষণা করে দেখা হয়, ৬ মাস থেকে ২ বছর বয়সী কত শিশু ২৪ ঘণ্টায় কোনো ফল বা সবজি খায়নি এবং এর সঙ্গে কোন কোন বিষয় সম্পর্কিত।

গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ শিশুর মধ্যে অন্তত চারজনের আগের দিনের খাবারে কোনো ফল বা সবজি ছিল না।

আগের ২৪ ঘণ্টায় কোনো ফল বা সবজি না খাওয়াকে—‘জিরো ভেজিটেবল অ্যান্ড ফ্রুট’ বা জেডভিএফ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

গবেষণায় দেখা যায়, গত দুই সপ্তাহে অসুস্থ হওয়া শিশুদের জেডভিএফের সম্ভাবনা ২৩ শতাংশ বেশি ছিল। শুধু তাই নয়, শহরের শিশুদের জেডভিএফের সম্ভাবনা গ্রামীণ শিশুদের তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি।

ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

বাংলাদেশে কেন এমন হচ্ছে?

গবেষকেরা সম্ভাব্য কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে—ফল ও সবজিতে ফরমালিনের মতো ক্ষতিকর উপাদান থাকার শঙ্কা, তাজা ফল-সবজির তুলনামূলক বেশি দাম, প্রক্রিয়াজাত বা ফাস্টফুড ধরনের খাবারের সংস্পর্শে বেশি থাকা এবং বাবা-মায়ের খাদ্যাভ্যাস।

গবেষকদের মতে, মা-বাবার ছোট ছোট কিছু কৌশল ও অভ্যাসের পরিবর্তনই পারে শাক-সবজিকে শিশুর প্রিয় খাবারে পরিণত করতে।

সম্প্রতি বিবিসির প্রতিবেদনে বিভিন্ন গবেষণা থেকে পাওয়া কয়েকটি সহজ কৌশল তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, মায়ের বুকের দুধে প্রাকৃতিক চিনি থাকার কারণে শিশুরা খুব অল্প বয়সেই মিষ্টি খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। ফলে শিশু যখন শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করে, তখন যেকোনো শাক খাওয়ানো কঠিন হয়ে উঠে।

ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

সবজি খাওয়ানোর অভ্যাস করা

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব লিডসের বায়োসাইকোলজির অধ্যাপক মারিয়ন হেথারিংটনের মতে, শিশুকে ছোটবেলা থেকে যত বেশি ধরনের সবজির সঙ্গে পরিচয় ও নিয়মিত খাওয়ানোর অভ্যাস করা যায়, ততই ভালো।

শিশুর সবজির প্রতি আগ্রহ তৈরির সবচেয়ে কার্যকর সময় হলো—প্রাক-বিদ্যালয় বয়স।

হেথারিংটন বলেন, ‘পাঁচ বছর বয়সের মধ্যে শিশুর সবজির সঙ্গে পরিচিতি বাড়ানো শুরু না করলে পরে বিষয়টি কঠিন হয়ে যায়।’

গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো খাবার গ্রহণ করার আগে শিশুদের অনেক সময় সেটির সঙ্গে বারবার পরিচিত হওয়ার প্রয়োজন হয়। একটি খাবার পছন্দ করতে শিশুর ৫ থেকে ১৫ বার পর্যন্ত চেষ্টার প্রয়োজন হতে পারে।

এমনকি গর্ভাবস্থায় মা কী খাচ্ছেন, তাও শিশুর ভবিষ্যতের খাবারের পছন্দ তৈরিতে ভূমিকা রাখে।

ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

শুরুতেই সবজি পরিবেশন

খাবারের শুরুতেই সবজি দিন, যখন শিশু সবচেয়ে বেশি ক্ষুধার্ত থাকে। অন্য আকর্ষণীয় বা ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতিযোগিতা না থাকলে তারা সহজেই সবজি খেয়ে নেয়।

হেথারিংটন বলেন, ‘শিশুরা সাধারণত তাদের সবচেয়ে পছন্দের খাবারটি আগে খায়। ফলে প্লেটে সবজি আসার আগেই তারা পেট ভরে ফেলতে পারে। শুরুতেই সবজি দিলে এই প্রতিযোগিতা কমে যায়।’

২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে এ নিয়ে এক গবেষণায় দেখা যায়, শিশুদের নাশতায় সবজি দেওয়া হলে ৬০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে তা খেয়েছে।

কোনো খাবার ‘স্বাস্থ্যকর’—শিশুকে এমনটা বলে বোঝানোর চেষ্টা করলে উল্টো ফল দিতে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুদের ‘স্বাস্থ্যকর’ খাবারের চেয়ে ‘মজার’ বা ‘সুস্বাদু’ হিসেবে বর্ণনা করলে সেটা কাজে দেয়।

শুধু দুপুর বা রাতের খাবারেই নয়, সকালের নাশতাতেও সবজি দেওয়া উচিত বলে মনে করেন গবেষকরা। যেমন, ডিমের অমলেটের সঙ্গে মাশরুম বা পালং শাক কিংবা নাস্তায় মিক্স সবজি রাখা।

পেনসিলভানিয়া স্টেট ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিজ্ঞানের অধ্যাপক বারবারা রোলসের মতে, খাবারের শুরুতে সবজি দেওয়ার আরেকটি সুবিধা হলো, এতে শিশুর অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমে যায় এবং স্থূলতা তৈরি হয় না।

ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

স্বাস্থ্যকর খাবারের পরিমাণ বাড়ান

প্লেটে মূল খাবারের অনুপাত ঠিক রেখে সবজির পরিমাণ বাড়িয়ে দিন। মাংস বা অন্য খাবারের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে প্লেটে পুষ্টিকর সবজি বাড়িয়ে দিলে শিশু না জেনেই বেশি সবজি খেয়ে ফেলে। এছাড়া একইসঙ্গে কয়েকটি ভিন্ন সবজির পছন্দ বা অপশন রাখলেও বেশি সবজি খায় শিশু।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্লেটে ফল ও সবজির পরিমাণ ৫০ শতাংশ বাড়িয়ে দিলেও শিশুরা তা খেয়ে ফেলেছে।

আরেক গবেষণা বলছে, প্রি-স্কুলের শিশুদের একাধিক ধরনের সবজি থেকে পছন্দ করার সুযোগ দিলে তারা বেশি সবজি খায়।

আকর্ষণীয় পরিবেশন

খাবার কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা শিশু মনে গভীর প্রভাব ফেলে। খাবারকে ফুল, প্রজাপতি, টেডি বিয়ারসহ নানা আকৃতিতে কেটে পরিবেশন করলে শিশুরা কৌতূহলী হয়।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এক প্লেটে বিভিন্ন ধরনের সবজি নির্দিষ্ট পরিমাণে সাজিয়ে দিলে শিশুরা প্রায় ৩৬ শতাংশ পর্যন্ত বেশি সবজি খেয়ে থাকে। অর্থাৎ, স্বাস্থ্যকর খাবারকে মজার ও আকর্ষণীয় করে তুললে শিশুর কাছে তার আবেদন বাড়ে।

খাবারকে শিশুর নাগালের মধ্যে রাখাও গুরুত্বপূর্ণ। নাশতা হিসেবে সবজি সহজে দেখা ও পাওয়া যায়—এভাবে রাখলে শিশুরা বেশি খেতে পারে।

ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

একসঙ্গে বসে খাওয়া

মা-বাবার খাবারের অভ্যাস সরাসরি অনুসরণ করে সন্তান। বাবা-মা অস্বাস্থ্যকর খাবার খেলে সন্তানদেরও সেগুলো খাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যেসব বাবা-মা নিয়মিত ফাস্টফুড খান বা সকালের নাশতা বাদ দেন, তাদের সন্তানদের মধ্যেও একই ধরনের অভ্যাস দেখা যেতে পারে।

নিউজিল্যান্ডের স্কুলশিশুদের নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুর বাবা-মায়ের খাদ্যাভ্যাস তুলনামূলক স্বাস্থ্যকর, তারা কম কেক, চকলেট ও অন্যান্য ঝাল খাবার খায়।

আর সপ্তাহে অন্তত তিন দিন পরিবারের সবাইর একসঙ্গে বসে খাওয়ার অভ্যাস শিশুদের সুস্বাস্থ্যের অধিকারী করে।

দীর্ঘমেয়াদি এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত পরিবারের সঙ্গে খাবার খেত, তাদের শারীরিক সক্ষমতা বেশি ছিল এবং কোমল পানীয় পান করার প্রবণতা কম ছিল।

খাবার নিয়ে মজার খেলা তৈরি করুন

শিশু কী খাবে, তা শুধু খাবারের স্বাদ বা পুষ্টিগুণের ওপর নির্ভর করে না। খাবারের সঙ্গে তার সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, শিশুকে জোর করে খাওয়ানোর চেষ্টা উল্টো ফল দিতে পারে। সেই খাবারের প্রতি আগ্রহ ও আনন্দ কমে যেতে পারে। একইভাবে শিশুকে পুরস্কার হিসেবে বেশি চর্বি বা চিনি থাকা খাবার দিলে সেসব খাবারের প্রতি তার পছন্দ আরও বাড়তে পারে।

তার বদলে খাবার স্পর্শ করা, ঘ্রাণ নেওয়া বা নাস্তার বিভিন্ন আইটেম নিয়ে খেলার সুযোগ দিন।

গবেষকদের মতে, মূল বিষয় হলো—শিশুর খাবারের অভিজ্ঞতাটাই বদলে দেওয়া। কোনো চাপ না থাকলে শিশুরা খাবার নিয়ে খেলতে, স্বাদ নিতে এবং নতুন কিছু পরীক্ষা করতে বেশি আগ্রহী হয়।

শিশুদের রান্না-বান্নায় অংশ নিতে উৎসাহিত করলে নতুন খাবারের প্রতি তাদের ভয় দূর হয় এবং খাওয়ার প্রতি আগ্রহ জন্মায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ছোট ছোট পরিবর্তনই আপনার শিশুকে সবুজ সবজি, রঙিন ফল ও বৈচিত্র্যময় খাবারের দিকে নিয়ে যাবে।

ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

সমস্যাটা কি শুধুই শিশুর ‘জেদ’?

শিশু যে সবজি খেতে চায় না এবং অস্বাস্থ্যকর খাবারের দিকে ঝোঁক বেশি হওয়ার জন্য তার পছন্দ বা জেদকে দায়ী করা যাবে না। বাড়ি, স্কুল, বন্ধু, বাজার, খাবারের দাম, ফাস্ট ফুডের সহজলভ্যতা, মায়ের সময় সংকট এবং বাজারে ভেজাল বা ফরমালিন মেশানো ফল-সবজি নিয়ে আতঙ্ক—সব মিলিয়ে শিশুর খাবারের অভ্যাস তৈরি হয়।

২০১৯ সালে ঢাকার ১৪টি স্কুলে ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী শিশুদের নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্কুলপড়ুয়া শিশুরা ফল ও সবজির তুলনায় ফাস্ট ফুড, ভাজাপোড়া, মাংস, মিষ্টি ও কোমল পানীয়ের দিকে বেশি ঝুঁকছে। স্কুলও এই পছন্দ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে শিশুর খাবারে সবজি ও ফলের ঘাটতি শুরু হয় খুব ছোট বয়সেই। আর স্কুলে পড়ার বয়সে এসে সমস্যাটি আরও জটিল হচ্ছে—শিশুর নিজের পছন্দের পাশাপাশি বন্ধু, স্কুলের ক্যান্টিন, ফাস্ট ফুড ও পারিবারিক বাস্তবতা খাবারের পছন্দকে আরও প্রভাবিত করে।

ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি

গবেষকদের মতে, শিশুদের ফল ও সবজি খাওয়ার অভ্যাস বাড়াতে শুধু শিশুকে খাবার দেওয়াই যথেষ্ট নয়। মায়ের পুষ্টিবিষয়ক শিক্ষা, আর্থসামাজিক পরিস্থিতি এবং সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তাই শিশুদের খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনার জন্য বিভিন্ন কৌশলের পাশাপাশি সরকারি পর্যায়ে পুষ্টি-সংক্রান্ত উদ্যোগ, ভর্তুকি এবং গণমাধ্যমভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম নেওয়ার সুপারিশ করেছেন গবেষকরা।