‘ডেলুলু’ বলতে জেন-জি আসলে কী বোঝায়?
চাকরির জন্য সিভি পাঠানোর আধা ঘণ্টা পরই মনে মনে অফিসে প্রথম দিনের পোশাক ঠিক করে ফেলেছেন? কোনো অচেনা মানুষ আপনার স্টোরিতে দু-তিনবার রিঅ্যাক্ট করার পর মনে হয়েছে, তিনি হয়তো শুধু স্টোরি দেখছেন না, আপনার প্রতিও একটু আগ্রহী? কিংবা জিমে এক সপ্তাহ যাওয়ার পরই নিজেকে কল্পনা করেছেন ছয় মাস পরের সংস্করণে?
তাহলে অভিনন্দন। জেন-জির ভাষায়, আপনি একটু ‘ডেলুলু’।
গত এক-দুই বছরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবচেয়ে বেশি শোনা নতুন শব্দগুলোর একটি সম্ভবত এটি। ‘ডেলুলু’ শব্দটি এসেছে ‘ডেলিউশনাল’ থেকে। তবে জেন-জির ব্যবহারে এর অর্থ অনেক হালকা। সাধারণভাবে বলতে গেলে, বাস্তবে কিছু ঘটার আগেই মাথার ভেতর তার পরের কয়েকটি অধ্যায় লিখে ফেলা কিংবা সামান্য একটি সম্ভাবনা থেকে অনেক বড় গল্প কল্পনা করে ফেলা—এটাই ডেলুলু।
বন্ধুদের আড্ডায় এমন কথোপকথন প্রায়ই শোনা যায়।
‘ভাই, আমার মনে হয় এবার আমি বিদেশ চলে যাচ্ছি।’
‘ভিসা পেয়েছিস?’
‘না, ইউটিউবে ভিডিও দেখা শুরু করেছি।’
শুনতে হাস্যকর লাগলেও বিষয়টি খুব একটা অচেনা নয়। কারণ ডেলুলু হওয়ার জন্য বড় কোনো ঘটনার দরকার হয় না। অনেক সময় ছোট একটি সম্ভাবনাই যথেষ্ট, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে।
কেউ আপনার স্টোরিতে কয়েকবার রিঅ্যাক্ট করেছে, কেউ একটি পোস্টে লাইক দিয়েছে, কেউ হয়তো রিপ্লাই দিয়েছে একটি মেসেজে। বাস্তবে ঘটনাগুলো খুব সাধারণ। কিন্তু মানুষের মাথা সাধারণ ঘটনা নিয়ে খুব বেশি দিন সন্তুষ্ট থাকে না। সেটি দ্রুত গল্প বানাতে শুরু করে। হয়তো সে কারণেই ডেলুলু শব্দটি এত জনপ্রিয় হয়েছে। এটি এমন একটি অভিজ্ঞতার নাম, যার সঙ্গে অনেকেই পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করার পর কেউ ইউটিউবে সেই ক্যাম্পাসের ভিডিও দেখতে শুরু করেন। বিদেশে পড়তে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এমন কেউ আবেদন করার আগেই শহরটির আবহাওয়া, বাসাভাড়া আর কফিশপ সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করেন। নতুন ব্যবসার একটি আইডিয়া মাথায় আসার পর কেউ মনে মনে তার ভবিষ্যৎ অফিসের ছবিও এঁকে ফেলেন।
এসবের অনেক কিছুই হয়তো বাস্তবে ঘটবে না। কিন্তু মানুষ কল্পনা করা থামায় না। আসলে মানুষের এই স্বভাব নতুন নয়। আগের প্রজন্মের মানুষও প্রেম নিয়ে কল্পনা করেছে, চাকরি নিয়ে স্বপ্ন দেখেছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে অবাস্তব আশা করেছে। পার্থক্য হলো, জেন-জি সেই অভিজ্ঞতার একটি নাম দিয়েছে।
আর সেই নামটি নিয়ে তারা বেশ স্বচ্ছন্দ। আগের প্রজন্ম হয়তো নিজের অবাস্তব আশাগুলো লুকিয়ে রাখত। জেন-জি সেটি নিয়ে মিম বানায়। নিজেরাই স্বীকার করে যে তারা হয়তো একটু বেশি দূর ভেবে ফেলছে। তাই এখন প্রায়ই দেখা যায়, কেউ নিজের কোনো কল্পনার কথা বলছে, আর নিচে মন্তব্য আসছে—‘ডেলুলু ইজ দ্য সলুলু।’
অবশ্য এর মানে এই নয় যে জেন-জি বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেয় না। বরং তারা জানে যে তারা বাড়াবাড়ি করছে। পুরো মজাটাই সেখানেই। নিজের অতিরিক্ত আশাবাদ নিয়ে নিজেই হাসতে পারার মধ্যে।
সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন কল্পনা আর বাস্তবতার মাঝের পার্থক্যটা মানুষ ভুলে যায়। কেউ স্পষ্টভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছে না, তবু নিজের মতো করে সংকেত পড়া হচ্ছে। কোনো সুযোগ এখনো তৈরি হয়নি, কিন্তু সেটিকে নিশ্চিত ধরে নেওয়া হচ্ছে। তখন ডেলুলু আর মজার থাকে না।
তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডেলুলু হওয়া মানে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। বরং এটি মানুষের খুব পরিচিত একটি স্বভাবের নতুন নাম। হয়তো ডেলুলু শব্দটির জনপ্রিয়তার কারণও সেখানেই। এটি একইসঙ্গে আশা, কল্পনা আর আত্মবিদ্রূপ—তিনটিকেই ধারণ করে। মানুষ জানে বাস্তবতা সব সময় তার মনের গল্পের মতো হবে না। তবু মাঝে মাঝে সেই গল্পটা কল্পনা করতে ক্ষতি কী?



