জেন-জি কেন এত ‘ননশ্যালান্ট’ হতে চায়?

স্টার অনলাইন ডেস্ক

বন্ধু নতুন চাকরি পেয়েছে। আপনি ভেতরে ভেতরে সত্যিই খুশি। কিন্তু মুখে শুধু বললেন, ‘ভালো তো।’ কারণ এখন খুব বেশি উচ্ছ্বাস দেখানোটা অনেকের কাছেই একটু অস্বস্তিকর।

এখন অনেক তরুণকে দেখলে মনে হয় তারা যেন কোনো কিছুতেই খুব বেশি অবাক হন না, খুব বেশি উচ্ছ্বসিতও হন না। কেউ প্রশংসা করলেও শান্ত, মন খারাপ হলেও শান্ত, সম্পর্ক ভাঙলেও শান্ত। কথা বলার ধরন, মুখের অভিব্যক্তি, এমনকি টেক্সটের উত্তর দেওয়ার ভঙ্গিতেও এক ধরনের ইচ্ছে করে উদাসীন থাকার চেষ্টা দেখা যায়।

এটিকেই ‘ননশ্যালান্ট’ হওয়া বলে। সহজভাবে বললে, ননশ্যালান্ট এমন এক ধরনের ব্যক্তিত্ব যেখানে মানুষকে সবসময় শান্ত, অপ্রভাবিত আর ‘খুব বেশি কিছু যায় আসে না’ ধরনের দেখাতে হয়।

আগ্রহ দেখানো অস্বস্তিকর, ‘বেশি কেয়ার করি না’ জনপ্রিয়

এখন অনলাইনে একটা অদ্ভুত নিয়ম তৈরি হয়েছে। খুব দ্রুত উত্তর দেওয়া যাবে না, কাউকে নিয়ে খুব বেশি উচ্ছ্বসিতও হওয়া যাবে না, কোনো কিছু নিয়ে অতিরিক্ত খুশি দেখানো যাবে না। কারণ অনেকের ধারণা, যত কম আবেগ দেখানো যাবে, মানুষকে তত বেশি আকর্ষণীয় দেখাবে। ফলে কেউ কারও টেক্সট দেখেও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেন না। কেউ ইচ্ছা করেই এমনভাবে কথা বলেন যেন খুব বেশি আগ্রহ নেই। আবার কেউ সবসময় এমন মুখ করে ছবি তোলেন, যেন জীবনে কোনো কিছুই তাকে খুব সহজে প্রভাবিত করতে পারে না। যেন বেশি আবেগ দেখালে নিজের গুরুত্ব কমে যাবে।

অনেক ভিডিও বা আলোচনায় এখন এমন মানুষদের বেশি আকর্ষণীয় হিসেবে দেখানো হয়, যারা খুব শান্ত, কম কথা বলেন বা সবসময় একটু দূরত্ব রেখে চলেন। তারা খুব সহজে কাউকে গুরুত্ব দেন না, খুব বেশি ব্যাখ্যা করেন না, আবার কোনো কিছুতেই খুব বেশি প্রতিক্রিয়াও দেখান না। ফলে অনেক তরুণও সেই ধরনের ব্যক্তিত্ব অনুসরণ করার চেষ্টা করছেন। তারা ভাবছেন, খুব বেশি আবেগ দেখালে হয়তো মানুষ তাকে ‘বেশি সিরিয়াস’ বা ‘বেশি সহজ’ ভাববে।

সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এখন এই প্রবণতা দেখা যায়। কে আগে টেক্সট দেবে, কে কম আগ্রহ দেখাবে, কে বেশি ‘অপ্রভাবিত’ থাকতে পারবে—এসবও যেন এক ধরনের খেলা হয়ে গেছে। অনেকেই ইচ্ছা করে উত্তর দিতে দেরি করেন, যেন তাকে খুব ব্যস্ত বা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়।

অনেক সময় এটি অনলাইনে ‘বেশি বেশি’ দেখানোর ভয় থেকেও আসে। এখন অনলাইনে মানুষ খুব দ্রুত অন্যদের বিচার করে ফেলে। কেউ খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হলে তাকে ‘অতিরিক্ত’ বলা হয়, কেউ খুব বেশি আগ্রহ দেখালে তাকে ‘ডেসপারেট’ বলা হয়, আবার কেউ খুব বেশি আবেগ দেখালেও সেটি নিয়ে মজা করা হয়। ফলে অনেক তরুণ ধীরে ধীরে নিজের প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে শিখে গেছেন। তারা খুব খুশি হলেও সেটি কম দেখান, কাউকে খুব পছন্দ করলেও সেটি লুকিয়ে রাখেন।

কিন্তু বাস্তবে মানুষ কি সত্যিই এত উদাসীন?

সম্ভবত না। কারণ বাস্তবে মানুষ স্বাভাবিকভাবেই আবেগপ্রবণ। মানুষ খুশি হয়, উচ্ছ্বসিত হয়, নার্ভাস হয়, মন খারাপ করে। কিন্তু এখন অনেকেই সেই অনুভূতিগুলো প্রকাশ করতে অস্বস্তি বোধ করেন। ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক দিকটা লুকাতে শুরু করেন। অথচ বাস্তব জীবনে সবচেয়ে স্বস্তিদায়ক মানুষ সাধারণত তারাই, যারা অভিনয় না করে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেন, হাসেন বা নিজের অনুভূতি প্রকাশ করেন।

সবসময় এমনভাবে বেঁচে থাকা, যেন কোনো কিছুতেই কিছু যায় আসে না—এটি এক ধরনের ক্লান্তিও তৈরি করতে পারে। কারণ মানুষ সবসময় এত নিয়ন্ত্রিত থাকে না। কখনো খুব হাসতে ইচ্ছা করে, কখনো খুব রাগ হয়, কখনো কাউকে খুব পছন্দও হয়। কিন্তু ‘ননশ্যালান্ট’ হতে গিয়ে, এই অনুভূতিগুলো লুকাতে লুকাতে ধীরে ধীরে আসল মানুষটিই মুখোশের আড়ালে চাপা পড়ে যেতে পারে।