‘ভ্যাম্পায়ার’ বাদল, সারগাম ও ব্যান্ড সংগীতের ঝড়
বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসে কিছু নাম আছে, যারা সামনে দাঁড়িয়ে আলো কুড়ান না, কিন্তু তাদের ছায়া ছাড়া পুরো দৃশ্যটাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ‘সারগাম’-এর বাদল তেমনই এক নাম। ২ মে তার মৃত্যুর খবরটা নিঃশব্দে এসে ছুঁয়ে গেল সংগীতপ্রেমীদের এক প্রজন্মকে—বিশেষ করে যারা আশি-নব্বই দশকের ব্যান্ড সংগীতের উত্থান নিজের চোখে দেখেছেন কিংবা অন্তত সেই গানগুলো শুনে বড় হয়েছেন।
পেছনে ফিরে তাকালে বোঝা যায়—বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীতের যে ঝড় আমরা দেখেছি, তার পেছনে কেবল শিল্পীদের প্রতিভাই ছিল না, ছিল কিছু দূরদর্শী মানুষের ঝুঁকি নেওয়ার সাহসও। বাদল ছিলেন তাদেরই একজন।
শুরুটা যখন অনিশ্চিত
আশির দশকের বাংলাদেশে ব্যান্ড সংগীত ছিল অনেকটাই ‘অচেনা’ এক জগৎ। শ্রোতারা তখনো মূলত চলচ্চিত্রের গান বা আধুনিক একক শিল্পীদের গানেই অভ্যস্ত। ব্যান্ড মানেই ছিল কিছুটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা, কিছুটা সন্দেহ, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তা।
এই সময়েই ফারুক কবির বাদল তার প্রতিষ্ঠান ‘সারগাম’ নিয়ে এগিয়ে আসেন। তার আগে শাফাত আলীর ‘ইপসা রেকর্ডিং’ কিংবা জিগাতলার ‘ডিসকো রেকর্ডিং’ বেশ কিছু কাজ করেছিল। কিন্তু ‘সারগাম’ এসে যেন পুরো ব্যাপারটাকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যায়। সাউন্ড কোয়ালিটি, প্রডাকশনের যত্ন আর শিল্পীদের প্রতি আস্থা—সব মিলিয়ে সারগাম হয়ে ওঠে এক নতুন মানদণ্ড।
যে ঝুঁকি ইতিহাস হয়ে গেল
আজ আমরা যেসব ব্যান্ডের নাম সহজে উচ্চারণ করি—সোলস, ফিডব্যাক, রেনেসাঁ, চাইম, অবসকিওর, ওয়ারফেজ, এলআরবি, ফিলিংস—তাদের প্রায় সবার অ্যালবামই কোনো না কোনো সময়ে সারগাম থেকে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু তখন এই নামগুলো এত বড় ছিল না। তারা ছিলেন স্বপ্ন দেখা কিছু তরুণ, যাদের হাতে গিটার, মাথায় সুর আর বুকভরা অনিশ্চয়তা।
বাদল সেই অনিশ্চয়তাকেই বিশ্বাস করেছিলেন। যখন বাজার নিশ্চিত ছিল না, যখন ব্যান্ড অ্যালবাম বিক্রি হবে কি না কেউ জানত না—তখন তিনি এগিয়ে এসে বলেছিলেন, ‘চল, করি’। এই ‘করি’ শব্দটাই হয়তো বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের সংগীতের গতিপথ।
শুধু ব্যান্ড নয়, তপন চৌধুরী, কুমার বিশ্বজিৎ, লাকী আখন্দ, শুভ্র দেব, শাকিলা জাফর, নিলয় দাশ—এমন অনেক শিল্পীর অ্যালবামও ‘সারগাম’ থেকে বেরিয়েছে। অর্থাৎ, একদিকে তিনি ব্যান্ড সংগীতকে জায়গা করে দিয়েছেন, অন্যদিকে মূলধারার শিল্পীদেরও দিয়েছেন একটি নির্ভরযোগ্য প্ল্যাটফর্ম।
‘ভ্যাম্পায়ার বাদল’: রাতের মানুষ
বাদলকে নিয়ে শিল্পীদের মধ্যে একটি মজার গল্প প্রায়ই শোনা যায়। তার জীবনযাত্রা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো—ভোরে ঘুমাতেন, সন্ধ্যায় উঠতেন। এই অদ্ভুত অভ্যাসের কারণেই সংগীতশিল্পী আশিকউজ্জামান টুলু মজা করে তাকে ডাকতেন ‘ভ্যাম্পায়ার বাদল’ বলে।
এই ডাকের ভেতরে ছিল এক ধরনের স্নেহ, আবার বাস্তবতারও ছাপ। কারণ, সেই সময়ের অনেক রেকর্ডিংই হতো গভীর রাতে। নীরবতা, মনোযোগ, আর সময়ের স্বাধীনতা—সব মিলিয়ে রাতই ছিল কাজের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। নিলয় দাশের মতো শিল্পীরাও রাতে গান রেকর্ড করতেন। আর সেই রাতজাগা সেশনে প্রায়ই উপস্থিত থাকতেন বাদল নিজেও।
ভাবলে অবাক লাগে—যখন শহর ঘুমিয়ে থাকত, তখনই কোথাও কোনো স্টুডিওতে তৈরি হচ্ছিল এমন গান, যা পরদিন হাজারো মানুষের মুখে মুখে ফিরবে।
একটি আস্থার নাম
একসময় ‘সারগাম’ শুধু একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল একটি ব্র্যান্ড—একটি আস্থার জায়গা। নতুন কোনো অ্যালবামে যদি লেখা থাকত ‘সারগাম’, তাহলে শ্রোতারা জানতেন—এখানে কিছু ভালো পাওয়া যাবে।
এই আস্থা তৈরি করা সহজ ছিল না। এর পেছনে ছিল বছরের পর বছর পরিশ্রম, এক্সপেরিমেন্ট, আর সবচেয়ে বড় কথা—শিল্পীদের প্রতি বিশ্বাস।
এই পথ ধরেই পরে বাংলাদেশে আরও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে—ডন মিউজিক, সাউন্ডটেক, সংগীতা। সাউন্ডটেকের বাবুল কিংবা সংগীতার সেলিম পরবর্তীতে অনেক জনপ্রিয় অ্যালবাম প্রযোজনা করেছেন। কিন্তু তারা যে মাটিতে দাঁড়িয়ে কাজ করেছেন, সেই মাটির ভিতটা গড়ে দিয়েছিলেন বাদল ও তার ‘সারগাম’।
সময়ের পালাবদল
নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে সংগীতের বাজারে পরিবর্তন আসতে শুরু করে। সাউন্ডটেকের উত্থান ঘটে, নতুন নতুন প্রযুক্তি আসে, প্রতিযোগিতা বাড়ে। এই সময়টাতে বাদল ধীরে ধীরে নিজেকে প্রযোজনার মূল স্রোত থেকে সরিয়ে নেন।
পারিবারিক ব্যবসা, ব্যক্তিগত ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে তার অগ্রাধিকার বদলে যায়। এরপর একসময় তিনি প্রবাসে চলে যান। জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত আমেরিকাতেই ছিলেন তিনি।
এটা এক ধরনের নীরব বিদায়—যেমন নীরবে তিনি কাজ করতেন, তেমনি নীরবেই সরে গেছেন আলো থেকে।
ডিজিটাল যুগে ফিরে আসা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংগীতের মাধ্যম বদলেছে। ক্যাসেট থেকে সিডি, সেখান থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম—সবকিছুই বদলে গেছে। এই পরিবর্তনের স্রোতে ‘সারগাম’-ও নিজেদের নতুনভাবে হাজির করেছে।
তাদের ইউটিউব চ্যানেলে একের পর এক পুরোনো অ্যালবাম আপলোড করা হয়েছে। নতুন প্রজন্ম, যারা হয়তো কখনো ক্যাসেট প্লেয়ার ছুঁয়েও দেখেনি, তারাও এখন সেই গানগুলো শুনতে পারছে—ক্লিকের মাধ্যমে।
একভাবে দেখলে, এটা সময়কে ছাপিয়ে যাওয়ার এক প্রচেষ্টা। আর এই প্রচেষ্টার ভেতরেও লুকিয়ে আছে বাদলের সেই পুরোনো স্বপ্ন—ভালো গান মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
একজন পথিকৃৎকে মনে রাখা
বাদল ছিলেন লাইমলাইটের বাইরের মানুষ। তিনি গান গাইতেন না, গিটার বাজাতেন না। তবুও তিনি সংগীতের ইতিহাসে থেকে যাবেন—কারণ তিনি পথ তৈরি করেছিলেন।
যে সময়ে সবাই নিশ্চিত পথ খুঁজছিল, তিনি বেছে নিয়েছিলেন অনিশ্চিত পথ। যে সময়ে ব্যান্ড সংগীত ছিল ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ, তিনি সেটাকেই করেছেন নিজের ভরসা। আর সেই ভরসার ফলেই তৈরি হয়েছে একের পর এক অ্যালবাম, যা আজও আমাদের স্মৃতিতে বাজে।
তার মৃত্যু তাই শুধু একজন মানুষের মৃত্যু নয়, এটি এক যুগের নীরব সমাপ্তির মতো।
তবুও, সত্যি বলতে—এই সমাপ্তি পুরোপুরি শেষ নয়। কারণ, যখনই কোনো পুরোনো গান বাজবে, যখনই কেউ বলবে ‘এই গানটা নব্বইয়ের’—তখনই কোথাও না কোথাও ফিরে আসবেন ‘ভ্যাম্পায়ার বাদল’। রাতের সেই স্টুডিও, অন্ধকারের ভেতর আলো জ্বালানো কিছু মানুষ আর তাদের বিশ্বাস—সবকিছু মিলিয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন।
বাংলাদেশের ব্যান্ড সংগীতের যে ঝড় আশি-নব্বই দশককে উত্তাল করেছিল, তার পেছনে যে মানুষগুলো নীরবে দাঁড়িয়ে ছিলেন—তাদের একজন বাদল। আর তার তৈরি ‘সারগাম’ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, এটি ছিল এক সময়ের স্পন্দন।
আর সেই স্পন্দন কখনো পুরোপুরি থেমে যায় না, শুধু মানুষেরা চলে যায়...