সবসময় ‘ভালো থাকো’ বলা কি ঠিক?

মো. ইমরান
মো. ইমরান

আবেগ আমাদের জীবনেরই অংশ। কখনো আমরা আনন্দে আত্মহারা হই, আবার মন খারাপ হলে ডুবে যাই বিষাদে। অনেক সময় বলতে শোনা যায় ‘ইতিবাচক থাকতে হবে’। অনেকে এমনও বলে থাকেন, ‘সবসময় হাসি মুখে কথা বলতে হবে’।

কিন্তু জোর করে ভালো বা ইতিবাচক থাকা কি আসলেই ভালো? কারণ বিশ্বে যেমন প্রতিনিয়ত অনেক কিছুই ঘটছে, মানুষের জীবনেও ঠিক তাই।

কিন্তু এরপরেও জোর করে ভালো থাকার চেষ্টা এবং নেতিবাচক অনুভূতিগুলোকে দাবিয়ে রাখাকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘টক্সিক পজিটিভিটি’।

শুনতে অদ্ভুত মনে হলেও অতিরিক্ত ইতিবাচকতা অনেক সময় মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য বিষের মতো কাজ করে।

টক্সিক পজিটিভিটি কী

সহজ কথায়, পরিস্থিতি যত ভয়াবহ বা যন্ত্রণাদায়কই হোক না কেন, জোর করে হাসিখুশি ভাব বজায় রাখাই হলো টক্সিক পজিটিভিটি। এটি আমাদের শেখায় যে দুঃখ, ভয় বা রাগ প্রকাশ করা মানেই দুর্বলতা, এগুলো নেতিবাচক বৈশিষ্ট্যের লক্ষণ।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। ধরুন, একজন ব্যক্তি তার চাকরি হারিয়েছেন এবং আর্থিকভাবে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছেন। এই অবস্থায় তাকে যদি কেউ বলে, ‘আরে মন খারাপ করো না, যা হয় ভালোর জন্যই হয়; পজিটিভ থাকো!’ তবে এটিও টক্সিক পজিটিভিটির মধ্যে পড়ে। কেননা এখানে চাকরি হারানো ব্যক্তির সমস্যা এবং মানসিক অবস্থাকে অস্বীকার করা হয়েছে।

কেন এটি বিপজ্জনক

অনেকে মনে করেন পজিটিভ কথা বললে মানুষের মনোবল বাড়ে। মানসিক চাপ এবং আবেগ দমনের নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে দীর্ঘ সময় গবেষণা করেছেন হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক সুসান ডেভিড।

তার গবেষণায় দেখা গেছে, যখন আমরা কোনো কষ্ট বা দুঃখকে ‘নেতিবাচক’ মনে করে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি, তখন সেই আবেগগুলো বিদায় নেয় না; বরং সেগুলো আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। একে বলা হয় ‘আইরনিক প্রসেস থিওরি’। কেননা আমরা যখন নিজের কষ্ট শেয়ার করাকে ‘নেতিবাচক’ তকমা দিয়ে চেপে রাখি, তখন সেই আবেগগুলো মনের ভেতরে জট পাকিয়ে যায়। এটি পরে দীর্ঘমেয়াদি বিষণ্ণতা বা এনজাইটির জন্ম দেয়।

দ্বিতীয়ত, নিজের মাঝে অপরাধবোধও জাগতে পারে। যখন কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েও ইতিবাচক থাকতে পারে না, তখন সে নিজের ওপরই রাগ করে। সে ভাবতে পারে, ‘সবাই পারছে, আমি কেন পারছি না? আমি বোধহয় মানুষ হিসেবে খারাপ’। নিজের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন জাগে।

তৃতীয়ত, সম্পর্কের দূরত্বও তৈরি হতে পারে। একজন ব্যক্তি তার কষ্টের কথা বললে অন্যজন যদি কেবল ইতিবাচক কথাই বলে, শোনার থেকে বেশি যদি উপদেশ দিতে থাকে, ভুল ধরতে থাকে, তখন সেই সম্পর্কে আস্থার দেয়াল ভেঙে যায়। কষ্ট পাওয়া মানুষটি নিজেকে ধীরে ধীরে গুটিয়ে নেয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত ‘পারফেক্ট লাইফ’

টক্সিক পজিটিভিটি ছড়ানোর পেছনে বড় কারিগর হলো সোশ্যাল মিডিয়া। ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকে আমরা যখন কেবল মানুষের ঘুরতে যাওয়া, সাফল্য আর হাসিমুখের ছবি দেখি, তখন আমাদের মনে হয় সবার জীবন হয়তো নিখুঁত, শুধু নিজেরটাই কষ্টের। ‘গুড ভাইবস অনলি’র মতো হ্যাশট্যাগগুলো আমাদের অবচেতন মনে বার্তা দেয় যে, দুঃখের বহিঃপ্রকাশ অনুচিত। ফলে আমরা বাস্তবতাকে আড়াল করে একটি কৃত্রিম সুখী জীবন প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ি।

টক্সিক পজিটিভিটির বিকল্প

বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ভিক্টর ফ্র্যাঙ্কল একটি চমৎকার ধারণা দিয়েছিলেন, ‘ট্র্যাজিক অপটিমিজম’। এটি টক্সিক পজিটিভিটির বিপরীত। এর অর্থ হলো আপনার কষ্ট, ব্যথা বা ক্ষতিকে পূর্ণভাবে স্বীকার করে নেওয়া এবং সেই কষ্টের ভেতরেই জীবনের কোনো একটি অর্থ খুঁজে বের করা।

যেমন: টক্সিক পজিটিভিটি বলে, ‘কষ্ট পেয়ো না, হাসিখুশি থাকো’। এখানে ট্র্যাজিক অপটিমিজমের কথা, ‘আমি হয়তো তোমার অবস্থায় নেই। তবে বুঝতে পারছি যে তোমার কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্ট পাওয়াটা স্বাভাবিক।’

যেভাবে এটি পরিবর্তন করবেন

নিজের এবং অন্যের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের মাধ্যমেই এই চক্র থেকে বের হওয়া সম্ভব।

আপনি যদি আজ মন খারাপ বোধ করেন, তবে নিজেকে বলুন ‘আজ আমার ভালো লাগছে না এবং সেটা ঠিক আছে’।

সীমানা নির্ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ যখন আপনাকে অপ্রয়োজনীয় ইতিবাচক উপদেশ দিবে, তখন তাকে বিনয়ের সঙ্গে বলুন, ‘আমি জানি আপনি আমাকে সাহায্য করতে চাচ্ছেন। কিন্তু এই মুহূর্তে আমার শুধু কারো সঙ্গ দরকার, উপদেশ নয়।’

ভালো না থাকাটাও অনেক সময় ভালো থাকার প্রথম ধাপ। আলিয়া-শাহরুখ অভিনীত ‘ডিয়ার জিন্দেগি’ সিনেমার একটি দৃশ্যে টক্সিক পজিটিভিটির বিষয়টি চমৎকারভাবে তুলে ধরা হয়েছে। ড. জাহাঙ্গীর খান ও কায়রার একটি দৃশ্যে কায়রা আবেগ লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে এবং এক পর্যায়ে তার ভেতরের সব কষ্ট আগ্নেয়গিরির মতো বেরিয়ে আসে। তখন ড. জাহাঙ্গীর খান তাকে বলেন, ‘আমরা কেন সবসময় নিজেদের ওপর এই চাপটা দিই যে আমাদের সবসময় সুখীই থাকতে হবে? যখন আমাদের শরীর খারাপ হয়, তখন কি আমরা জোর করে দৌড়াতে যাই? না। তবে কেন মন খারাপ হলে আমরা জোর করে হাসার চেষ্টা করি?’

তিনি কায়রাকে বোঝান, জীবনে বড় বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ছোট ছোট অনুভূতিগুলোকে জায়গা দেওয়াও জরুরি। আমরা যখন নিজেদের দুঃখ বা কান্নাকে ‘ভুল’ মনে করে এড়িয়ে যাই, তখন আমরা আসলে নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করি। সব সময় আমরা ‘ভালো’ থাকবো না এটাও স্বাভাবিক।