বেশি ইতিবাচক হতে গিয়ে যন্ত্রণা বাড়াচ্ছেন না তো

তিনাথ জায়েবা

জীবন নিয়ে আমাদের কত পরিকল্পনাই না থাকে। কিন্তু জীবন তার নিজস্ব গতিতে হয়তো কিছুটা ভিন্নই ভেবে রাখে। আমাদের জীবনে যখন কোনো প্রতিকূলতা এসে পড়ে, তখন সেই দুঃসময় কাটিয়ে উঠতে বাবা–মা, পরিবার ও প্রিয়জনদের পাশে পাওয়াটাই সবচেয়ে বেশি দরকার। অজান্তেই আমরা তাদেরই আশ্রয় খুঁজি।

জীবনের কঠিন সময়গুলোতে 'পজিটিভ থাকো' এই কথাটি বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে বহুবার শুনে থাকবেন। কখনো আন্তরিকতা থেকে, আবার কখনো জীবনের টানাপোড়েনে ডুবে যাওয়া একজনকে টেনে তুলতে বেশ জোর দিয়ে এই কথাটি বলা হয়ে থাকে। হতে পারে, আপনি বর্তমানে জীবনের খুব কঠিন একটা সময় পার করছেন, হয়তো প্রিয় মানুষটির সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেছে, কিংবা আটপৌরে, ক্লান্তিকর জীবনে বিরক্ত হয়ে পড়েছেন। ঠিক এমন সময়েই কেউ একজন এসে বলে বসে—'অন্তত তোমার তো...আছে'।

কিছুটা স্বস্তি পাওয়ার বদলে আপনি এক ধরনের মানসিক চাপ অনুভব করতে থাকেন। আপনার পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা না করে তারা যেন ভদ্রতার আড়ালে বিদ্রূপ করে যায়। বিষয়টা অনেকটা এরকম যে, আপনার কথা শোনা বা অনুভূতি বোঝার মতো সময় বা আগ্রহ তাদের নেই। তাদের কথাগুলো বাইরে থেকে আন্তরিক শোনালেও বাস্তবিক অর্থে সেখানে নিজের মনের কথা খুলে বলার মতো কোনো জায়গাই থাকে না।

যারা এ ধরনের কথা বলে, তাদের উদ্দেশ্য বেশিরভাগ সময়েই আপনাকে আঘাত দেওয়া নয়। বরং, যারা আপনাকে নিয়ে সত্যিই ভাবে এবং চায় আপনি আবার আগের মতো হাসিখুশি জীবনে ফিরে যান—তারাই সাধারণত এমন কথা বলে থাকে। কঠিন সময়ে আপনার পাশে থাকা মানুষগুলোকে হয়তো বলতে শুনেছেন, 'চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে', 'পজিটিভলি ভাবো', বা 'সবকিছুই কোনো না কোনো কারণে ঘটে'। তারা সত্যিকার অর্থে আপনার মনোবল জোগাতে চায়।

কিছু পরিস্থিতিতে আমাদের শুধু এমন কাউকে প্রয়োজন হয়, যে পাশে থাকবে, মন দিয়ে আমাদের কথা শুনবে এবং সত্যিটা স্বীকার করে বলবে যে, পরিস্থিতি আসলেই ঠিক কতটা কঠিন।

আত্মনির্ভরতার চর্চা এই ধরনের মনোভাবকে ক্রমেই সর্বজনীন করে তুলছে। বইয়ের দোকান থেকে শুরু করে টিকটক ভিডিও পর্যন্ত, সবকিছুই আপনাকে নতুনভাবে চিন্তা করতে শেখায়, সফলতা অর্জনের স্বপ্ন দেখায় এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অভ্যাস গড়ে তোলে। আশাবাদী হওয়াটা দোষের কিছু নয়, কারণ এটি আমাদের মনে শক্তি জোগায় ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন করে তোলে। কিন্তু সমস্যাটা তখনই বাধে যখন ইতিবাচকতাকে সব সমস্যার সমাধান হিসেবে দেখা হয়। যদি আপনি কোনো কারণে বিষণ্ণ থাকেন, তখন ধরে নেওয়া হয় যে আপনি জীবন সম্পর্কে খুব ইতিবাচক নন। এমতাবস্থায় শুধু কষ্ট পাওয়াই নয়, বরং সেই পরিস্থিতির জন্য আপনি নিজেকে দোষী ভাবতে থাকেন। আত্মনির্ভরতা তখন আত্ম-বিদ্রূপে পরিণত হয়।

আমাদের বর্তমান প্রজন্ম দুটি ভিন্ন ধারার মধ্যে আটকে আছে। একদিকে রয়েছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম চলে আসা ধৈর্য, সংযম ও সহনশীলতার মূল্যবোধ; অন্যদিকে আমরা এমন এক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে বসবাস করি, যেখানে ইতিবাচকতাকে বারবার মোড়কজাত পণ্যের মতো উপস্থাপন করা হয়। সোশ্যাল মিডিয়া খুললেই চোখে পড়ে মোটিভেশনাল কথা, দক্ষতা বাড়ানোর নানা কৌশল, আর সুখী জীবনের রঙিন রিলসে ভরপুর এক অবিরাম প্রবাহ। 
এই সবকিছুর মাঝখানে যখন কেউ হতাশায় ভোগে, তখন তার মনে হতে থাকে—আমি ভালো নেই, এর জন্য নিশ্চয়ই আমিই দায়ী। আমার মধ্যেই নিশ্চয়ই কোনো ভুল আছে, সেটাই ঠিক করতে হবে।

এতে এক অদ্ভুত ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। মন খারাপ থাকে, কিন্তু সেজন্যই আবার এক ধরনের অপরাধবোধ কাজ করে। আপনি মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, পুরোপুরি ভেঙে পড়েছেন কিন্তু তবু নিজেকে বোঝান যে অন্য কারো পরিস্থিতি নিশ্চয়ই আরও কঠিন। আপনি আপনার সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চান, তখন আপনি ভাবেন যে, এমনটা করলে হয়তো এটাকে অনেকেই বাড়াবাড়ি মনে করবে। তাই আপনি নীরব থাকেন। যখন কেউ আপনাকে বলে যে, 'এর ভালো দিকটা দেখো', তখন আপনি কেবল মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানান, যদিও আপনি তখন কেবলই চান যে কেউ আপনার কথা শুনুক, একটু সহানুভূতি জানাক।

প্রতিনিয়ত সবকিছুতেই ইতিবাচক দিক খুঁজে বের করার যে প্রবণতা, তার একটা বড় সমস্যা হলো—এতে করে মানব মনের সুখ-দুঃখের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলোর জন্য কোনো স্থান থাকে না। জীবনে যাই-ই ঘটুক না কেন, উপদেশগুলো শেষ পর্যন্ত এরকম দাঁড়ায়-কৃতজ্ঞ থাকো, মনোবল শক্ত রাখো, হাসিখুশি থাকো। কিন্তু জীবন তো এমন নয় যে সবসময় নিয়ম মেনে চলবে। দুঃসময় কখনোই আগাম বার্তা দিয়ে আসে না। শুধু ইতিবাচক চিন্তা দিয়ে জীবনের দুশ্চিন্তাগুলো দূর করা যায় না। আর সব ঠিক আছে এমন দেখানোর মানে এই নয় যে ভেতরে ভেতরে সত্যিই সব ঠিক হয়ে গেছে।

জীবনে কঠিন সময়ের মুখোমুখি হওয়া আমাদের জীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। দুঃখ আমাদের স্থবির করে দেয়, নতুন করে ভাবতে শেখায়। রাগ কখনো কখনো আমাদের অন্যায় কিছু করার দিকে প্রভাবিত করে। একাকীত্ব মানুষের সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য আমাদের ব্যাকুল করে তোলে। কিন্তু, ইতিবাচকতার নামে যখন আমরা এই অনুভূতিগুলোকে অবহেলা করি, সেগুলো মুছে যায় না—বরং মনের গভীরে চাপা পড়ে যায়। এই চাপা পড়া অনুভূতিগুলো কখনো হারিয়ে যায় না, বরং নীরবে আমাদের চিন্তা ভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরা ভাবতে শুরু করি যে জীবনের কঠিন পরিস্থিতিতে লড়াই করাটা বোধহয় লজ্জার কিছু।

আরেকটি অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, কিছু খুবই সাধারণ কথা, যা বলা হয় সান্ত্বনার জন্য, কিন্তু বাস্তবে এগুলো প্রায়শই বিপরীত প্রভাব ফেলে। যেমন: 'সবকিছুই কোনো না কোনো কারণে ঘটে' এটা হয়তো সত্য, কিন্তু শোকাহত কাউকে এই কথা বলা একদমই ঠিক নয়, কারণ যিনি প্রিয়জন হারিয়েছেন, তার কাছে কোনো কারণই সেই ক্ষতি মেনে নেওয়ার মতো মনে হবে না। অন্যের পরিস্থিতির সঙ্গে তারটা মূল্যায়ন করলে তাকে ছোট করা হয়, হতে পারে অন্যদের তুলনায় তার আঘাতটা কম, কিন্তু তার জন্য সেটা অত্যন্ত কঠিন। যদি একটু ভেবে দেখেন, তাহলে আপনি লক্ষ্য করবেন যে, এই ধরনের কথা স্বাভাবিকভাবেই আমাদের মনে আসে, কারণ এগুলোই সাধারণত সান্ত্বনার ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

আমরা চাইলে 'ইতিবাচকতা'র সংজ্ঞাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারি। সবসময় জোর করে নিজেকে সুখী দেখানোর চেষ্টা না করে নিজের অনুভূতিগুলো খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করতে পারি। কারো কাছে ক্ষমা চাওয়ার দরকার নেই, বরং নিজেদের অনুভূতিগুলো গভীরভাবে অনুভব করতে শিখি। কেউ যদি মন খুলে কথা বলতে চায়, আগ্রহভরে তার কথা শুনি, বা কেউ যদি চায় যে তার পাশে থাকি, তাহলে কিছু সময় চুপচাপ তার পাশে থাকি।

কঠিন সময়ে কারো পাশে থাকা মানে সবসময় অনুপ্রেরণামূলক কথা বলা নয়। কখনো কখনো সত্যটা বলতে হয়, যদিও তা কঠিন শোনায়। জীবনে সুখ-দুঃখ—দুটোরই সম্মুখীন হতে হয়। এটাই জীবনের পরম সত্য। আশাবাদী হওয়াটা ভুল কিছু নয়; আশা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। কৃতজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। ঠিক একইভাবে সত্য এবং জীবনের জটিলতার মুখোমুখি হওয়াও জরুরি। জীবনে কঠিন সময় আসবে, কিন্তু এতে ভেঙে পড়লে চলবে না। এটাই জীবন; আর এর মধ্য দিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হবে।

অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী