আড্ডা, চা আর ছাত্রজীবনের ফেলে আসা সেই দিনগুলো
আমাদের ক্যাম্পাসের বিকেলগুলোর একটি আলাদা রঙ ছিল। ক্লাস শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে যখন হাজার-আটাশির সামনে করিডোরটা ফাঁকা হয়ে আসত, তখন শুরু হতো আমাদের ছাত্রজীবনের আরেকটি অধ্যায়—আড্ডা, চা আর অগণিত গল্প। আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হয়তো এই একটা রীতি, এখানকার পরিবেশ। এখানে শিক্ষার্থীদের জীবন আধুনিক ইট-কাঠের মধ্যে থাকে না, অন্তত আমাদের সময় তো ছিল না! কারো টিউশনি, কারো হলে উঠবার পায়তারা, পকেটের দুটো টাকা জমিয়ে নীলক্ষেত থেকে বই কেনা—আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন চলেছে এভাবে।
প্রায়ই মনে করি, পড়াশোনার বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে অর্থবহ করে তোলে আসলে এই বিকেলগুলোই। কেননা এই জীবনভিত্তিক বিকেলগুলোই আমাদের বাস্তব শিখিয়েছে। শিখিয়েছে পড়াশোনার বাইরেও রাজনীতি, টিউশনি, কিংবা মার্ক্সের অর্থনীতি, দর্শনের জীবনটা কেমন। রাজনীতি থেকে সিনেমা কিংবা গবেষণা থেকে ব্যক্তিগত স্বপ্ন—কোনো বিষয়েই কথা থামত না।
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়-জীবন শুধু বইয়ের পাতাতেই আঁটকে থাকেনি। আমরা যেমন টিএসসির মঞ্চে সাংস্কৃতিক আয়োজনের জন্যও গ্রীষ্মের অনেক দুপুর রিহার্সেল করে কাটিয়েছি, তেমনি ক্লাস শেষে ছুটেছি খণ্ডকালীন চাকরিতে।
আমরা পড়েছি এমন এক পরিবেশে—হয়তো ক্লাস করছি, সেই ক্লাসে গ্রামশি, উত্তর-আধুনিকতাবাদের মতোন গুরুতর বিষয়ে শিক্ষক তুখোড় লেকচার দিয়ে চাচ্ছেন, আর ঠিক ক্লাসের জানালা দিয়েই দেখতে পাচ্ছি—শিক্ষার্থীদের মিছিল হেঁটে চলছে সমসাময়িক কোনো বিষয়ের প্রতিবাদে। বিদ্যুৎ চলে গেলে আমরা করিডোরেই দাঁড়িয়ে থেকেছি, আবার যখন বিদ্যুৎ এসেছে শিক্ষক ক্লাস শুরু করেছেন। এতটা আধুনিকতায় আমরা পাঁচটে বছর পার করিনি। তাই এখন পেছন ফিরে দেখলে মনে হয়—বাস্তবতা শেখানোর জন্য ছাত্রজীবনে এসবের প্রয়োজন কম নয়!
আবার বছরের একটা সময় এলেই এই চেনা দৃশ্য বদলে যেত, রমজানের ছুটি। ছুটি শুরু হওয়ার আগের দিনগুলোতে ক্যাম্পাসে একটা আলাদা ব্যস্ততা থাকত। সেই ব্যস্ততা শুরু হতো পরীক্ষা দিয়ে। পুরো ‘সেমিস্টার’জুড়েই একের পর এক পরীক্ষা, টার্মপেপার। ফলে আমাদের সময় থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই পুরোনো ঢিলেঢালা বার্ষিক পরীক্ষার পদ্ধতির পরিবর্তন শুরু হচ্ছিল।
পরীক্ষা শেষ হতেই সবার মধ্যে শুরু হতো ব্যস্ততা—ঈদে বাড়ি যাওয়া। সবাই ব্যাগ গোছাচ্ছে, বাস বা ট্রেনের টিকিটের কথা বলছে, কে কখন বাড়ি যাবে তার পরিকল্পনা করছে। আর ছুটি শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেন পুরো পরিবেশ পাল্টে যেত। আমি এখনো মনে করতে পারি, একবার রমজানের ছুটির সময় আমি কয়েকদিন ক্যাম্পাসেই ছিলাম। সাধারণত যে হলগুলো সারা বছর ক্যাম্পাসের হাসি-ঠাট্টা, গণরুম, নানা সংগ্রামের কেন্দ্রবিন্দু থাকে, সেগুলো তখন হয়ে যেত একেবারে ফাঁকা। করিডরে সেই পরিচিত ব্যস্ততা নেই, না আড্ডা, না হলের সামনে বারান্দায় রাখা সাইকেলের টুংটাং। ঈদের বন্ধে কয়েকবার বিকেলের দিকে যখন হাঁটতে গিয়েছি, মনে হতো ক্যাম্পাস যেন থেমে আছে!
শ্যাডো কিংবা কার্জনের পুকুরপারের চায়ের দোকানগুলোও হয়ে থাকতো একেবারে নিশ্চুপ। মাঝেমধ্যে তাও দু-একজনকে দেখা যেত, যারা হয়তো কোনো কারণে বাড়ি যায়নি। আমরা ঢাকার শিক্ষার্থী যারা, কয়েকজন মিলে সেই ফাঁকা ক্যাম্পাসেই নিজেদের গল্প শুরু করতাম। তখন আমাদের আড্ডা হয়ে উঠতো ঢাকার জীবনকেন্দ্রিক। তখন বুঝতাম, মানুষই আসলে একটি জায়গাকে জীবন্ত করে তোলে।
আবার যখন ছুটি শেষে সবাই আবার ফিরে আসত, হলগুলো আবার ভরে উঠত হাসি আর কোলাহলে, তখন মনে হতো ক্যাম্পাসে আবার তার স্বাভাবিক প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এই বন্ধুরা ফিরছে, আবার ক্লাসরুমের ব্যস্ততা শুরু হচ্ছে, চলে আসছে পরীক্ষা। এভাবেই আমাদের বছরগুলো কাটতো। আমাদের এই সিলেবাস যেমন সময়ের পরিক্রমায় এগিয়ে চলত, কলাভবনের বাইরের গাছগুলোর দৈনিক রুটিন, নতুন কুড়ির আগমন, পাতাদের ঝরে পড়া—একইসঙ্গে চলতো। দেখতে দেখতে বসন্তের বইমেলা, বৈশাখ, এই বর্ষা, টিএসসির বাইরে শীতের ছোলা-মুড়ি মাখা বিকেল, এভাবেই বছর পার হতো।
আমরা বুঝতে পারিনি কখন পাঁচটি বছর কেটে গেছে। একদিন দেখলাম, আরে সময় তো নেই! অনেকেই তখন ক্যারিয়ার, বিসিএস, বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তখন বোঝা গেল—নাহ! এবার সময় আসলেই শেষের পথে।
আজও যখন ক্যাম্পাসের কথা ভাবি, আমার প্রথমেই মনে পরে সেই বিকেলগুলো, বন্ধুদের আড্ডা, ধোঁয়া ওঠা চা, আর ছাত্রজীবনের সরল অথচ গভীর আনন্দ। আজকের এই আমি হয়ে ওঠার পেছনে এই বিকেল, পাঠ্যবইয়ের বাইরে এতশত আড্ডা, গল্পের ভূমিকা রয়েছে নিশ্চয়ই।


