চাঁদ রাত: ঢাকার পুরোনো দিন থেকে পরবাসের আমেজ

নাদিয়া রহমান
নাদিয়া রহমান

পুরো রমজান মাসের আনন্দটা থাকে ঈদ, আর চাঁদ রাতকে ঘিরে। আমরা যারা ৯০ দশকের, তাদের কাছে চাঁদ রাতের আমেজটা রয়ে গেছে সেলুলয়েডের পুরান দিনে, বিশেষ করে ধানমন্ডি লেক, নিউ মার্কেটের চারপাশ, আর পুরান ঢাকার অলি-গলিতে।

রাস্তায় তখনও সোডিয়াম বাতি, সেই বাতির নিচেই ধানমন্ডির ফুটপাতে বসতো দুয়েকটি ফুচকার দোকান, ফুলের দোকান, আর ছিল আর্চিস, হলমার্ক গিফটশপের দোকানগুলো। শহরের এই চেনা রূপ বদলে গেলেও ঈদের আমেজটা আসলে বরাবরই একই থেকেছে।

এর বড় কারণ, পরিবার, বন্ধুমহল, আর চেনা এই শহর। যেমন, ফুটপাতে এখন এতশত স্ট্রিট ফুডের ভিড়েও সেই আগেকার মতোই ফুচকার ঝাল, হাতে মেহেদি পরার, নানা নকশা দেখার আমেজটা যায়নি। গলিতে বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো, রাতটা নিজেই উদযাপনের অংশ।

তবে প্রবাসে চাঁদ রাত একেবারেই ভিন্ন। সেখানে ঈদের দিনেও শ্রেণিকক্ষে যেতে হয়েছে, নোট টুকে নিতে হয়েছে, কিংবা কোনো দিন অফিসে বসে কাজে মন দিতে হয়েছে। তবে চাঁদ রাতে তো আর কোনো ক্লাস কিংবা দাপ্তরিক কাজ নেই। তাই নানা শিডিউল থাকা সত্ত্বেও আমরা যারা ডর্মে থাকতাম, চেষ্টা করতাম নিজেদের মতো আয়োজন ভাগাভাগি করে নিতে।

আমার পড়াশোনার জন্য কেন্টাকির লেক্সিংটন শহরে থাকা হয়েছে প্রায় দুই বছর। থেকেছি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ডর্মে। আমরা মুসলিম শিক্ষার্থীরা, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে যারা এই ডর্মে থাকতো, তারা চেষ্টা করতাম নিজেদের মতো ঈদ আর এই চাঁদ রাতটা উদযাপন করতে।

সেখানে আয়োজন তো আর নিউমার্কেট, পরিবারের থেকে সালামি নেওয়া, কিংবা বাবার সঙ্গে গিয়ে ঈদের বাজার করার মতো নয়। আমরা যে যার ল্যাব, একঘেয়ে ক্লাস শেষে কমিউনিটি রুমে জড়ো হতাম। কেউ কিনে আনত মেহেদি, কেউ চা-কফি, সঙ্গে কিছু নাশতা তৈরি করে আনত। আমার মতো যারা রসুইঘরের চারপাশে যেত কম, তারা হয়তো সাউন্ডবক্স নিয়ে হাজির হতাম।

চা-কফির গরম কাপ হাতে, নাশতার ছোট ছোট টুকরো নিয়ে ভাগাভাগি, কথোপকথনের মাঝে হঠাৎ কেউ বলে, ‘বাসার কথা মনে পড়ছে’! এ ছাড়া আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশন নামে সংগঠন ছিল, যেখানে বিভিন্ন মুসলিম শিক্ষার্থীরা ইফতার, তারপর ডিনারের আয়োজন করতো। আমরা এই দিনটির জন্যও অপেক্ষা করতাম।

যে কটা পোশাকই আমরা সীমিত ওজনের লাগেজে নিতে পেরেছিলাম, সেগুলোই নতুন করে গুছিয়ে পরতাম। কখনো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্যাটন স্টুডেন্ট সেন্টারে বেশ বড় আয়োজন করা হতো, যেখানে মুসলিম এবং অন্যান্য ধর্মের শিক্ষার্থীদের জন্যও আয়োজন করা হতো।

এসব আয়োজন আমাদের মতো যারা পরিবার-পরিজন ছেড়ে প্রবাসে থাকতাম, তাদের কাছে অনেক আন্তরিক মনে হতো। এখন মনে করি, এসব আয়োজন ছিল বলেই পরবাসে একাকী সেই যাত্রাপথটা সহজ ছিল। তাই তো ফিরে আসার সময় সেখানকার জন্যও খারাপ লেগেছে।

অতঃপর দুই বছরের প্রবাস জীবনের পর আবারও দেশে সেই চাঁদ রাতের আমেজ, ধানমন্ডির দুই পাশের দোকানগুলোর পসরা, পকেট বাঁচিয়ে খরচ করার সেই নিউ মার্কেট, মেহেদি, এসব ফিরে পাওয়াটাও ছোটবেলার ঈদ আনন্দের মতোই। তবে, কিছু মানুষ হারিয়ে গেছে, কিছু চেনা অলিগলিও হারিয়ে গেছে।

পুরনো সেই ধানমন্ডি বেশি কোলাহলযুক্ত, কিছুটা অস্বাস্থ্যকরও ঠেকে। সেদিক থেকে চিন্তা করলে লেক্সিংটন শহরের ইফতার, চাঁদ রাতে মাঝ রাত পর্যন্ত ঘোরাঘুরি, সেগুলোও মনে হয় কোনো ফেলে আসা অতীত!

তাই এখন মনে করি, নিজের বেড়ে ওঠার এই শহর হোক, অথবা ফেলে আসা কেন্টাকি, সুন্দর স্মৃতিগুলো থাকুক সব সময়েই যত্নে। আর আগামীর চাঁদ রাতগুলো হোক এমনটাই, হয়তো নতুন আরেক শহরে। কিন্তু এই আমেজ, পরিবারের মানুষগুলো থাকুক এমনটাই।