রোজার মাসে ফিট থাকবেন যেভাবে
পবিত্র মাহে রমজান আমাদের আত্মউপলব্ধি ও আত্মশুদ্ধির মাস। এই সময়ে আমরা নিজেদের আচার-আচরণ ও চিন্তাশক্তিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার চেষ্টা করি। শুধু তাই নয়, দৈনন্দিন ঘুম ও খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও আমরা নিয়ম মেনে সুশৃঙ্খলভাবে চলার চেষ্টা করি।
ফিটনেস কোচ এবং আইএফবিবি প্রো কার্ড বিজয়ী তামীর আনোয়ার রোজার সময় স্বাস্থ্যগত দিক নিয়ে বলেন, রোজার সময়ে সাধারণত যে সমস্যাগুলো হয় তা মূলত আমাদের দৈনন্দিন অভ্যাসের কারণে নয়, বরং সুস্থ থাকার বিষয়গুলো সম্পর্কে খুব একটা সচেতন না থাকার ফলেই হয়ে থাকে।
ফিটনেস ধরে রাখার চেয়ে সুস্থতা বজায় রাখা জরুরি
বিশেষ করে রমজানে ফিটনেস বজায় রাখতে নতুন কোনো অনুশীলন শুরু করা উচিত নয়। তামীর বলেন, ‘আমি পরামর্শ দিই, সারাবছর যেভাবে আপনি খাবার খান, রমজান মাসেও খাদ্যাভ্যাসটি একইরকম রাখার চেষ্টা করুন। আর শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য—সারা বছর যেভাবে ব্যায়াম বা কায়িক পরিশ্রম করেন, রমজান মাসেও তা অব্যাহত রাখুন।’
তিনি আরও বলেন, হঠাৎ করে খাবারের পরিমাণ কমানো বা অতিরিক্ত কায়িক পরিশ্রম করে শরীরে দ্রুত পরিবর্তন আনার চেয়ে বরং পরিমিত আহার, হালকা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি পান এবং যথাযথ বিশ্রাম নেওয়াই জরুরি।
তিনি উল্লেখ করেন, হুট করে শরীরে পরিবর্তন আনার চেষ্টা না করে বরং সময়মতো নিয়ম মেনে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখা এবং সুন্দর অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। শুধু রোজার মাসে নয়, বরং সারাবছর এর অনুশীলন করা উচিত।
সচেতনতামূলক পদক্ষেপ ও নিয়মিত অভ্যাস
তামীর বলেন, ‘আপনি কেন কোনো কাজ করতে চাইছেন, এই উদ্দেশ্যটি পরিষ্কারভাবে বোঝা সাফল্য অর্জনের প্রথম ধাপ। যখন আপনি কোনো খাবার খাচ্ছেন, তখন নিজেকে বোঝান কেন আপনি সেটি খাচ্ছেন। একইভাবে, যখন ব্যায়াম করছেন, তখন নিজেকে মনে করিয়ে দিন কেন আপনি এই শারীরিক পরিশ্রম করছেন।
তার মতে, এই ছোট ছোট মানসিক সচেতনতা আপনার প্রচেষ্টাকে সফলতার দিকে এগিয়ে দেয় এবং বাস্তবে এর প্রভাব অনেক সময়ই অবাক করার মতো কার্যকর হয়।
তিনি আরও বলেন, বাহারি খাবার বা নতুন নতুন ব্যায়াম পদ্ধতির চেয়ে নির্দিষ্ট কিছু খাবার ও ব্যায়াম নিয়মিত এবং ধারাবাহিকভাবে অনুসরণ করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি বড় কোনো লক্ষ্য নির্ধারণ না করে ছোট ছোট লক্ষ্য ঠিক করে ধাপে ধাপে সেগুলো অর্জনের পরামর্শ দেন তিনি।
তার ভাষায়, ‘ব্যাপারটা এমন—যখন যা ইচ্ছা করছে তা না করে, বরং নিজের জন্য যেটা প্রয়োজন এবং করণীয়, সেটাই নিয়মিতভাবে করে যাওয়া।’
ইফতার ও সেহরির খাবারে চাই সচেতনতা
রমজান মাসে খাবারের ক্ষেত্রে ইফতার ও সেহরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ইফতারের টেবিলে পেঁয়াজু, বেগুনি, হালিম আর সেহরিতে ভাত—এ যেন এক চিরচেনা দৃশ্য। এসব খাবার খুবই সুস্বাদু হওয়ায় অনেক সময় আমরা অজান্তেই বেশি খেয়ে ফেলি, যা পরে শারীরিক অস্বস্তি বা নানা সমস্যার কারণ হতে পারে।
তামীর এসব খাবার খেতে একেবারে নিষেধ করেননি। তবে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, ইফতারের জনপ্রিয় আইটেম যেমন পেঁয়াজু বা বেগুনি ডুবো তেলে না ভেজে এয়ার ফ্রাই করে খাওয়া ভালো। আর যদি ডুবো তেলে ভাজতেই হয়, তাহলে অলিভ অয়েল ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন।
সেহরির খাবারে তামীর কমপ্লেক্স কার্বোহাইড্রেটের সঙ্গে পরিমিত পরিমাণে প্রোটিন ও শাকসবজি রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ইফতার ও সেহরির মধ্যবর্তী সময় কম হওয়ায় এমন খাবার বেছে নেওয়া ভালো যা ধীরে ধীরে হজম হয়। তাই সেদ্ধ আলু, ওটস বা অল্প পরিমাণে ভাত খাওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি শরীরের চাহিদা পূরণে সেদ্ধ ডিম, মুরগি বা মাছের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারও পর্যাপ্ত পরিমাণে রাখা প্রয়োজন।’
ব্যায়াম, পর্যাপ্ত পানি ও ঘুম
পবিত্র রমজান মাসে ব্যায়াম করার সময় নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান; রোজা থাকা অবস্থায় ইফতারের আগে ব্যায়াম করবেন, নাকি ইফতারের পরে করবেন।
তামীরের মতে, ইফতারের আগে ব্যায়াম করলে ফ্যাট বার্ন বেশি হয়। তবে বাংলাদেশের গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে এ সময় ব্যায়াম করলে শরীরে মারাত্মক পানিশূন্যতা তৈরি হতে পারে এবং পেশিতে টান ধরার সম্ভাবনাও থাকে।
তিনি পরামর্শ দেন, ইফতারের পরে ব্যায়াম করা বেশি নিরাপদ। ইফতারে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার এবং দ্রুত হজম হয় এমন কার্বোহাইড্রেট, যেমন খেজুর বা কলা খাওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরে ব্যায়াম করা ভালো।
রোজার সময় শরীর যাতে পর্যাপ্ত পানি পায় এবং ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় থাকে, সে বিষয়ে খেয়াল রাখতে বলেছেন তিনি। তিনি বলেন, ‘পানিশূন্যতার ফলে শরীর ক্লান্ত লাগে এবং কর্মক্ষমতা কমে যায়।’
তাই ইফতারের পর থেকেই বারবার পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি পান করতে হবে। পানিতে সামান্য পরিমাণ লবণ যোগ করা যেতে পারে। এছাড়া ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয় বা পানির পরিমাণ বেশি আছে এমন রসালো ফলও খেতে হবে।
এরপর তিনি ঘুমের গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন এবং এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমরা কীভাবে অবহেলা করি, সে বিষয়েও উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের শরীরের প্রতিটি কাজের ওপর ঘুমের প্রভাব রয়েছে। আমাদের শরীরের অনেক কিছুরই নির্ধারক হলো এই ঘুম। যেমন ধরুন, আমাদের শরীরে ফ্যাট বার্ন হবে নাকি জমা থাকবে; সেটাও নির্ভর করে আপনার পর্যাপ্ত ও ভালো ঘুম হচ্ছে কি না সেটার ওপর।’
রোজার সময় পেশির দুর্বলতা রোধ করা
যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, বিশেষ করে ভারোত্তোলন করেন, রোজার মাস এলে তারা কিছুটা চিন্তায় পড়ে যান। এতদিন পরিশ্রম করে তারা যেভাবে পেশিকে মজবুত করে গড়ে তুলেছেন, অনেকেই ভাবতে থাকেন রোজার মাসে হয়তো তা আর ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
কারণ এই সময়ে পেশি কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, শরীরের শক্তি কিছুটা কমে যায় এবং আয়নার সামনে দাঁড়ালে সেই পরিবর্তনটাও অনেক সময় চোখে পড়ে।
এই বিষয়ে তামীর বলেন, ‘প্রতি রোজায় আমারও কমপক্ষে ২ কেজি ওজন কমে যায়। কিন্তু এটা নিয়ে আমি খুব একটা চিন্তিত নই। কারণ এই সময়টাতে কমবেশি সবার ক্ষেত্রেই এমনটা ঘটে থাকে। তাই ভারী ওজন তোলার বদলে এ সময়ে তুলনামূলক কম ওজনের ভার উত্তোলন করা উচিত।’
এ সময় পেশি কিছুটা দুর্বল হবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে রমজান শেষ হওয়ার পর আবার ধীরে ধীরে সেটি ঠিক করে নেওয়া সম্ভব।
প্রবীণদের জন্য পরামর্শ
ডায়াবেটিস রোগী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে রোজা শুরুর আগেই চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে নেওয়া উচিত। নিয়মিত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা পরীক্ষা করতে হবে এবং অতিরিক্ত ব্যায়াম পরিহার করতে হবে।
রোজার মাসে ডায়াবেটিস রোগীদের সতর্কতার সঙ্গে ব্যায়াম করা প্রয়োজন। তামীর বলেন, ‘ডায়াবেটিস রোগীদের ইনসুলিন নিয়ন্ত্রণে রাখতে শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকতে হবে।’
এ ছাড়া প্রবীণদের জন্য তিনি প্রতিদিন খুব দ্রুত নয়, বরং মৃদু গতিতে প্রায় ৬০ মিনিট হাঁটার পরামর্শ দিয়েছেন।
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী


