হাঁটার অভ্যাস যেভাবে জীবনকে বদলে দেয়

শবনম জাবীন চৌধুরী

খুব ছোট ও সহজ কাজগুলো অনেক সময় আমাদের জীবনে বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। কিন্তু আমরা অনেকেই বিষয়টা নিয়ে তেমনভাবে ভাবি না। এই যেমন ধরুন হাঁটার অভ্যাসের কথাই যদি বলি। আমাদের ব্যস্ততম জীবনে প্রতিদিন নিয়ম করে একটু হাঁটা খুব কঠিন কিছু নয়। কিন্তু নিয়মিত এই অভ্যাসই আপনার জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিতে পারে।

আজকে নতুন নয়, আমাদের শরীর ও মনের ওপর হাঁটার যে ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে, সেই যুগ যুগ ধরেই তা প্রমাণিত হয়ে এসেছে। শরীরে হাড় গঠনে সহায়তা থেকে শুরু করে মনের প্রশান্তি ও একাগ্রতা ধরে রাখতে হাঁটার গুরুত্ব অপরিসীম।

হাঁটার অভ্যাস কীভাবে জীবন বদলে দেয়—এ বিষয়ে আমাদের বিস্তারিত জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফার্মাকোলজি অ্যান্ড থেরাপিউটিক্স বিভাগের চিকিৎসক ডা. মো. সীফাত জাহান শশী।

তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন হাঁটার অনেক উপকারিতা আছে। এটি শরীর ও মনের জন্য খুবই ভালো একটি অভ্যাস। সাধারণভাবে প্রতিদিন ২০–৩০ মিনিট হাঁটা খুব উপকারী বলে ধরা হয়। সকালে বা বিকেলে খোলা পরিবেশে হাঁটলে আরও ভালো অনুভূতি পাওয়া যায়।’

এই চিকিৎসকের মতে হাঁটার গুরুত্বপূর্ণ উপকারিতাগুলোর কিছু নিচে উল্লেখ করা হলো:

স্বাস্থ্য
ছবি: সংগৃহীত

হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়

হৃদরোগকে বিশ্বের এক নম্বর ঘাতক রোগ বলা হয়। বর্ণ, গোত্র, বয়স ও লিঙ্গ নির্বিশেষে প্রতি বছর বহু মানুষ এই রোগে মারা যায়। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার জন্য মূলত আমাদের অস্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রাই দায়ী, যার অন্যতম প্রধান কারণ হলো অপর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রম।

হৃৎপিণ্ড এক ধরনের পেশী, যা আমাদের শরীরে রক্ত সঞ্চালনকে সুষম রাখে। হাঁটার ফলে হৃদযন্ত্রের সক্ষমতা বৃদ্ধি পায় এবং শরীরে রক্ত সরবরাহের কাজ আরও কার্যকরভাবে সম্পন্ন করতে এটি সক্ষম হয়ে ওঠে।

প্রতিদিন যদি আপনি ৩০ মিনিট করে হাঁটেন, তাহলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। শুধু তাই নয়, উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরল ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমাতেও এটি সাহায্য করে। সপ্তাহে প্রতিদিন না হলেও অন্তত পাঁচ দিন হাঁটা উচিত।

স্বাস্থ্য
ছবি: সংগৃহীত

পেশী ও হাড়ের গঠনকে মজবুত করে

হাঁটলে দেহের পেশী মজবুত হয়। আর পেশী মজবুত হলে তা হৃৎপিণ্ডে আরও ভালোভাবে রক্ত সঞ্চালনে সহায়তা করে এবং আমাদের স্ট্যামিনাও বৃদ্ধি পায়।

নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করলে আমাদের দেহের প্রতিটি জয়েন্টের ব্যায়াম হয় এবং অস্টিওপোরোসিসের মতো হাড়ের নানা সমস্যার ঝুঁকি কমে যায়।

স্বাস্থ্য
ছবি: সংগৃহীত

শরীর ও মনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে

আপনি ১০ মিনিট করে ভাগ করে বা টানা ৩০ মিনিট—যেভাবেই হাঁটুন না কেন, দৈনিক মোট ৩০ মিনিট হাঁটা আপনার শরীর ও মনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে।

হাঁটলে শরীরের ক্যালোরি খরচ হয়, আমাদের মন প্রফুল্ল থাকে এবং এনার্জি লেভেল বৃদ্ধি পায়।

স্বাস্থ্য
ছবি: সংগৃহীত

ওজন কমায় ও হজমে সহায়তা করে

আমাদের প্রতিটি কাজ, যেমন চলাফেরা বা দৈনন্দিন কাজকর্ম সম্পন্ন করতে ক্যালোরি প্রয়োজন। তবে ওজন কমাতে হলে শরীরে জমে থাকা অতিরিক্ত ক্যালোরি বার্ন করা জরুরি। দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার অভ্যাসের কারণে অনেকের শরীরে ধীরে ধীরে মেদ জমে এবং স্থূলতার সমস্যা দেখা দেয়।

নিয়মিত হাঁটার ফলে শরীরের প্রচুর ক্যালোরি খরচ হয় এবং বিশেষ করে পেটের চর্বি কমাতে সহায়তা করে।

এছাড়া প্রতিদিন হাঁটার ফলে আমরা যে খাবার খাই, তা শরীরে ফ্যাট হিসেবে জমা না হয়ে শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এর ফলে ক্যালোরি খরচ বাড়ে এবং হজমশক্তিও উন্নত হয়।

স্বাস্থ্য
ছবি: সংগৃহীত

ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করে ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমায়

ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি। রক্তে অনিয়ন্ত্রিত শর্করা শরীরে নানা জটিল স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে এবং স্নায়ু, হৃৎপিণ্ড, চোখসহ ছোট-বড় রক্তনালীর ক্ষতির কারণ হতে পারে।

খাবারের পর অন্তত ১০ মিনিট হাঁটাহাঁটি করলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি খাওয়ার পর যে ক্লান্তি বা অবসাদ অনুভূত হয়, তা কমাতেও এটি কার্যকর।

নিয়মিত হাঁটাহাঁটি করলে শরীরে ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বৃদ্ধি পায়। এর ফলে পেশীগুলো বেশি পরিমাণে গ্লুকোজ ব্যবহার করে শক্তিতে রূপান্তর করতে পারে। এতে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রিত থাকে এবং ডায়াবেটিসের ঝুঁকি কমে।

যারা নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম করেন, তাদের বিশেষ করে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কম থাকে। আর কায়িক পরিশ্রমের সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ উপায় হলো প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে হাঁটাহাঁটি করা।

স্বাস্থ্য
ছবি: সংগৃহীত

মানসিক চাপ কমায়

হাঁটাহাঁটি করলে আমাদের শরীরে এন্ডরফিন ও সেরোটোনিন নামক হরমোনের নিঃসরণ বৃদ্ধি পায়, যা মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও হতাশা কমাতে সাহায্য করে। এর ফলে আমাদের আবেগের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়ে, আমরা আরও মনোযোগ দিয়ে কাজ করতে পারি এবং সৃজনশীলতাও বৃদ্ধি পায়।

এছাড়া বাইরে হাঁটতে গেলে চারপাশের প্রকৃতি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনের বৈচিত্র্য আমাদের মনে এক ধরনের প্রশান্তি ও ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করে।

স্বাস্থ্য
ছবি: সংগৃহীত

ভালো ঘুমে সহায়তা করে

নিয়মিত হাঁটার ফলে শরীরে পর্যাপ্ত কায়িক পরিশ্রম হয়, যার কারণে রাতে দ্রুত ঘুম আসে এবং ঘুম গভীর হয়। এর ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠে শরীর ও মনে সতেজতা অনুভূত হয়।

এছাড়াও নিয়মিত হাঁটা ডিমেনশিয়ার মতো রোগের ঝুঁকি কমাতেও সহায়তা করে।

স্বাস্থ্য
ছবি: সংগৃহীত

হাঁটার শুরুতে ও শেষে করণীয়

হাঁটা শুরুর আগে ধীর গতিতে হাঁটা শুরু করা উচিত, যাতে শরীরের পেশীগুলো ধীরে ধীরে এই কায়িক পরিশ্রমের জন্য নিজেকে ‘ওয়ার্ম আপ’ করে নিতে পারে। এরপর ধীরে ধীরে হাঁটার গতি বাড়ানো উচিত।

হাঁটার শেষের পাঁচ থেকে ১০ মিনিট গতি কমিয়ে আবার ধীর গতিতে হাঁটা ভালো। হাঁটা শেষ করার পর হাত-পা হালকা করে স্ট্রেচ করলে পেশীগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।

হাঁটার সময় হালকা ও আরামদায়ক পোশাক পরা উচিত, যা অতিরিক্ত গরম ও শরীরের অস্বস্তি থেকে অনেকটাই স্বস্তি দেয়।

একটি সুন্দর ও সুস্থ জীবনের জন্য হাঁটা একটি সহজ ও কার্যকর অভ্যাস। তাই আজই সুস্থ জীবনের লক্ষ্যে প্রথম পদক্ষেপটি নিয়ে নিন।