ইফতারে স্বাস্থ্যকর সালাদ বানাবেন যেভাবে
শহরজুড়ে যখন মাগরিবের আজান ধ্বনিত হয়, তখন ইফতারি সাজানো টেবিল ঘিরে মুসল্লিরা সারাদিনের রোজা শেষে ইফতার শুরু করেন। তেলে ভাজা পেঁয়াজু, বেগুনি ও নানা পদের মুখরোচক খাবারে ইফতারের টেবিল হয়ে ওঠে এক বিশাল আয়োজন; যেন যুগ যুগ ধরে চলে আসা এক ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি।
তবে সারাদিন রোজা রাখার পর শরীর চায় পুষ্টিকর ও সুষম খাবার, যা দিনশেষে তাকে পুনরায় সতেজ ও কর্মক্ষম করে তুলবে। এমন কোনো ভারী বা অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার নয়, যা খাওয়ার পর রাতের নামাজের আগেই ক্লান্তি এনে দেয়। তাই সময় এসেছে ইফতারির চিরাচরিত মেন্যু নিয়ে নতুন করে ভাবার। তেলে ভাজা খাবারের বদলে তুলনামূলক হালকা, পানিসমৃদ্ধ ও পুষ্টিগুণে ভরপুর খাবার বেছে নেওয়াই হতে পারে সুস্থতার জন্য অধিক উপযোগী সিদ্ধান্ত।
দিনশেষে শরীর সহজে হজম হয় ও পুষ্টিগুণে ভরপুর খাবারই সহজে গ্রহণ করতে পারে। আর সেক্ষেত্রে সালাদ হতে পারে অন্যতম সেরা পছন্দ। রক্তে সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে রোগপ্রতিরোধে সহায়তা করা অবধি সালাদ প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান সরবরাহ করে এবং সারাদিনের ক্লান্তি দূর করতে সহায়তা করে। ইফতারের টেবিলে সালাদকে অনেক সময় খুবই বোরিং বা অপছন্দের খাবার হিসেবে দেখা হলেও, সঠিক উপাদান যোগ করে এই অপছন্দের সালাদকেই রঙিন ও সুস্বাদু করে তোলা যেতে পারে।

এই যেমন ধরুন, পাকা টমেটো, অ্যাভোকাডো, সেদ্ধ ছোলা বা পাকা কলা, খেজুর ও ড্রাগন ফল একসঙ্গে মিশিয়ে তার সঙ্গে অলিভ অয়েল, লেবুর রস বা দই দিয়ে তৈরি করা যেতে পারে একটি সালাদ।
সালাদ মানেই যে পানসে কোনো খাবার, এ ধারণা ঠিক নয়। এতে কিছু বাদাম বা সেদ্ধ চিকেনের ছোট ছোট টুকরো টুকরো যোগ করলে স্বাদ যেমন বাড়বে, তেমনি খাবারটি হয়ে উঠবে আরও সুস্বাদু ও লোভনীয়।
পুষ্টিকর ইফতারের একটি প্লেট সাজানো অনেকটা সবুজ ক্যানভাসে নানা উপকরণ দিয়ে ছবি আঁকার মতো। প্লেট সাজানোর শুরু করা যেতে পারে শসার টুকরো, গাজর কুঁচি এবং সেদ্ধ কচি পালংশাকের পাতা দিয়ে। এর সঙ্গে যোগ করা যেতে পারে চিজ বা বিভিন্ন ধরনের মশলা। এসব উপাদানে প্রচুর পানি, ফাইবার ও প্রয়োজনীয় ভিটামিন থাকে, যা সারাদিনের শরীরের পানির চাহিদা পূরণ করে এবং দ্রুত ক্লান্তি দূর করে।
সালাদ মানেই যে শুধু সবুজ পাতা জাতীয় সবজি খেতে হবে, তা নয়। এতে কিছু প্রোটিন যোগ করলে দিনশেষে ইফতারের সময় এটি শরীরের এনার্জি লেভেল ধরে রাখতে সাহায্য করে। সেদ্ধ ছোলা, হালকা ভাজা বা সেদ্ধ চিকেনের টুকরো বা সেদ্ধ ডিমের টুকরো সালাদে যোগ করলে এটি হয়ে উঠতে পারে একটি দারুণ, এনার্জিতে ভরপুর খাবার।
ইফতারের প্লেট ফল ছাড়া যেন অসম্পূর্ণ। ফলগুলো আলাদা আলাদাভাবে টুকরো করে পরিবেশন না করে বরং আপেল, নাশপাতি, খেজুর বা ড্রাগন ফল সুন্দর করে কেটে একসঙ্গে ফলের সালাদ হিসেবে পরিবেশন করা যেতে পারে। এতে খানিকটা চাট মশলা, মধু বা এক স্কুপ আইসক্রিম যোগ করলে সালাদটি হবে আরও সুস্বাদু ও মজাদার। এসব ফলে প্রাকৃতিকভাবেই যথেষ্ট পরিমাণে চিনি থাকে, তাই সারাদিনের দীর্ঘ রোজা শেষে এগুলো শরীরকে দ্রুত সতেজ করে তোলে।
এছাড়া সালাদে বিভিন্ন ধরনের বাদাম যোগ করা যেতে পারে। বাটারের মতো মোলায়েম স্বাদ আনার জন্য কাজুবাদাম, ক্রিস্পি ভাবের জন্য কাঠবাদাম এবং ক্রাঞ্চি স্বাদের জন্য চিনাবাদাম যোগ করা যেতে পারে। এসব বাদামে আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী ফ্যাট থাকে এবং এগুলো যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালরির জোগানও দেয়।
সালাদকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে বাদামগুলো হালকা ভেজে নেওয়া যেতে পারে। আর চিয়া সিড যোগ করলে তা শরীরে ফাইবার ও বিভিন্ন পুষ্টিগুণের চাহিদা পূরণে একটি দারুণ বুস্টার হিসেবে কাজ করে। শহুরে জীবনে সাম্প্রতিক সময়ে কাজুবাদাম দিয়ে তৈরি নানা ধরনের সালাদও বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তাই ইফতারে সালাদে বাদাম যোগ করা নিঃসন্দেহে একটি স্বাস্থ্যসচেতন সিদ্ধান্ত।
একটি সালাদকে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও সুস্বাদু করে তোলার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ড্রেসিং। আধা চামচ এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল এবং সামান্য মিহি করে কুঁচি করা রসুন যোগ করলে ঘরে বানানো সাধারণ সালাদও হয়ে উঠতে পারে একেবারে রেস্টুরেন্টের মতো সুস্বাদু। আর সিজার স্টাইলের ড্রেসিং তৈরি করতে ডিমের কুসুম, টক দই এবং সামান্য গ্রেট করা চিজ যোগ করা যেতে পারে।

ইফতারের টেবিলে সালাদ যোগ করা মানে চিরাচরিত ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করা নয়। বরং আলুর চপ, জিলাপি বা হালিমের মতো খাবার কিছুটা কমিয়ে তার জায়গায় ফ্রেশ সালাদ যোগ করলে ইফতার যেমন শরীরের জন্য সহজপাচ্য হয়, তেমনি তা হয়ে ওঠে আরও পুষ্টিকর ও আকর্ষণীয়।
সালাদ শরীরে পর্যাপ্ত পানির জোগান দেয়, হৃদপিণ্ডকে ভালো রাখতে সাহায্য করে এবং শরীরকে প্রয়োজনীয় এনার্জি সরবরাহ করে সতেজ রাখে। ইফতার সালাদ দিয়ে শুরু করে পরে অন্য আইটেমগুলো খেলে দেখবেন শরীরও বেশ ভালো লাগছে, আর ইফতারির পরের ক্লান্তিভাবও অনেকটাই দূর হয়ে যাবে।
ইফতারে পুষ্টিকর খাবার খাওয়া মানে সারাদিনের রোজা শেষে শরীরকে এমন খাবার দেওয়া, যেখান থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পেয়ে সে ক্লান্তি কাটিয়ে আবার সতেজ হয়ে উঠতে পারে। অনেকটা যেন শরীরের চাহিদার কথাই শোনা। নানা রঙ, ধরন ও বৈচিত্র্যে ভরপুর সালাদ যেন শরীরের এক পরম বন্ধু। তাই এই রমজান মাসে সিয়াম সাধনার দীর্ঘ সময়ে আসুন আমরা পুষ্টিকর ইফতারের একটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তুলি।
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী

